ad
ad

Breaking News

বঞ্চনার শিকল ভাঙবে কবে? ন্যায্য অধিকারের খোঁজে মানুষ

ভারতের সংবিধান মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা বলেছে— সমতা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার অধিকার।

breaking-the-chains-of-human-rights-deprivation

চিত্রঃ সংগৃহীত

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন। কিন্তু ইতিহাস বলে— এই স্বাধীনতার স্বাদ তাকে সবসময় দেয়নি সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা ক্ষমতা। সভ্যতার অগ্রগতি যতই হোক, আজও অসংখ্য মানুষ নিজেদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। কখনও জাতি, কখনও ধর্ম, কখনও অর্থনৈতিক বৈষম্য, কখনও প্রশাসনিক উদাসীনতা— বঞ্চনার শিকল নানাভাবে বেঁধে রেখেছে মানুষকে। অথচ মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া মানেই তার অস্তিত্বে আঘাত করা। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন— কবে এই শিকল ছিঁড়ে মানুষ ফিরে পাবে তার ন্যায্য অধিকার?

ভারতের সংবিধান মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা বলেছে— সমতা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার অধিকার। কিন্তু সংবিধান শুধু পৃষ্ঠায় থাকলে চলবে না, সেটি বাস্তবে রূপ দিতে হবে। আমাদের দেশে আজও কৃষক তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পান না। শ্রমিক ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত। পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী ন্যায্য সুযোগ পায় না। সংখ্যালঘুরা কখনও অঘোষিত বৈষম্যের শিকার হন। বঞ্চনার এই বহুরূপী চিত্র দেখলেই বোঝা যায়, অধিকার শুধু আইনি দলিল নয়— এটি এক সামাজিক ও নৈতিক বাস্তবতা।
বহু মানুষ আজও সরকারি সুবিধার আওতায় নাম থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত। আবাস যোজনার ঘর, কেউ পাচ্ছেন না জমির পাট্টা। কেউ পাচ্ছেন না কাজের নথিভুক্ত সুযোগ। কেউ আবার তফসিলি বা ওবিসি সার্টিফিকেটের জটিলতায় হারাচ্ছেন বছরের পর বছর। অথচ এদের অনেকেই রাষ্ট্রের স্বীকৃত নাগরিক। কর দেন, শ্রম দেন, ভোট দেন— কিন্তু বিনিময়ে পান না সামাজিক স্বীকৃতি বা সম্মানজনক জীবনযাপন। এই বঞ্চনার মধ্যেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, ক্রোধ, আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে অস্থিরতা।

বঞ্চনার কারণ কেবল অর্থনৈতিক নয়। তার গভীরে আছে সামাজিক গঠন, মানসিকতা ও ক্ষমতার রাজনীতি। শ্রেণি ও জাতিগত কাঠামো যেখানে এখনও প্রভাবশালী, সেখানে সমান সুযোগের ধারণা বারবার ব্যাহত হয়। নারী সেখানে প্রান্তিক, শ্রমজীবী মানুষ সেখানে মূল্যহীন, সংখ্যালঘু সেখানে সংখ্যার রাজনীতির বলি। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, বঞ্চনা তখনই স্থায়ী হয়, যখন তা স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়। এই নীরব স্বীকৃতিই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ তা এক সময় অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করে।
দেশে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে আমরা এই অন্যায়ের ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাই। যেমন বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব প্রমাণে হয়রানি। শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রেও দেখা যায়—অসংগঠিত খাতে কর্মরত প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিকের কোনও স্থায়ী বেতন বা সামাজিক নিরাপত্তা নেই। সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি এক বিশাল মানবিক বঞ্চনার ‘প্রকৃত ও বাস্তব’ দলিল।
এই অবস্থায় সমাজের নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। কারণ, রাষ্ট্র যেমন দায় অস্বীকার করতে পারে না, তেমনই নীরব সমাজও কম অপরাধী নয়। আমরা যদি চোখ ফিরিয়ে নিই, তবে বঞ্চনা আরও গভীর হয়। আর যখন বঞ্চিত মানুষ কথা বলতে শুরু করে, প্রতিবাদ জানায়, তখনই শুরু হয় পরিবর্তনের ইতিহাস। শ্রমিক আন্দোলন, নারী অধিকার আন্দোলন, দলিত আন্দোলন— সবগুলোই এসেছে এই নীরব বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে— কোনও বঞ্চনা চিরস্থায়ী নয়, যদি মানুষ জেগে ওঠে।
তবু শুধু প্রতিবাদ নয়, দরকার ইতিবাচক উদ্যোগ। প্রথমত, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, যাতে সরকারি সুবিধা প্রকৃত উপভোক্তার কাছে পৌঁছায়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে—মানুষ যেন নিজের অধিকার চিনতে শেখে। তৃতীয়ত, আইনি কাঠামোকে আরও মানবিক ও সহজলভ্য করতে হবে, যাতে বিচার প্রাপ্তি হয় সুলভ ও দ্রুত। চতুর্থত, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে জনঅংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, কারণ গণতন্ত্র তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন মানুষের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়।
এর পাশাপাশি সমাজের মননেও পরিবর্তন জরুরি। যতদিন আমরা বঞ্চিতকে ‘অন্য’ হিসেবে দেখব, ততদিন প্রকৃত সমতা আসবে না। প্রত্যেকে যেন বুঝতে শেখে— অন্যের অধিকার মানে নিজের মানবিকতার স্বীকৃতি। সমাজের শক্তি নিহিত তার অন্তর্ভুক্তিতে, তার করুণা ও ন্যায়বোধে। আজ তাই আমাদের প্রয়োজন এমন এক সামাজিক চেতনা, যেখানে উন্নয়নের মানদণ্ড হবে না কেবল জিডিপি বা পরিসংখ্যান, বরং প্রতিটি মানুষের মর্যাদা ও অধিকার-প্রাপ্তির নিশ্চয়তা।
রাষ্ট্র, প্রশাসন ও নাগরিক—এই তিনের মিলিত দায়িত্বেই সম্ভব বঞ্চনার অবসান। অধিকার কেবল দেওয়ার বিষয় নয়, সেটি অর্জনেরও সাহস চায়। মানুষকে সেই সাহস জোগাতে হবে শিক্ষা, আন্দোলন, ও সংহতির মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, বঞ্চনার শিকল যত মজবুতই হোক, মানুষের জেগে ওঠা তার চেয়েও শক্তিশালী। ইতিহাস তাই বারবার দেখিয়েছে—যে সমাজ তার বঞ্চিত মানুষকে সম্মান দিতে শেখে, সেই সমাজই টিকে থাকে, বিকশিত হয়।
আজ আমরা যে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেখানে বঞ্চনা আর কেবল আর্থিক পরিসংখ্যান নয়; এটি এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাব তখনই, যখন প্রত্যেক মানুষ তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার ফিরে পাবে— শিক্ষায়, কর্মে, স্বাস্থ্যসেবায়, এবং নাগরিক মর্যাদায়। সেই দিনই সত্যিকারের গণতন্ত্র পূর্ণতা পাবে।
তাই আজ আমাদের সম্মিলিত শপথ হোক—বঞ্চনার শিকল ভেঙে মানুষ ফিরে পাক তার ন্যায্য অধিকার। কেবল নীতি নয়, কাজের মধ্য দিয়েই ফুটে উঠুক ন্যায়ের আলো, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এক ন্যায়সঙ্গত, মর্যাদাবোধে ভরপুর সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।