চিত্রঃ সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: ভারত মাতার বীর সন্তান হিসাবে আমরা সাধারণ মানুষ যতটা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গুরুত্ব দিই ততটা গুরুত্ব উর্দিধারী বীর সেনানায়কদের দিয়ে থাকি না। কারণ, তাঁরাও চাকরির শর্ত মেনে মন্ত্রগুপ্তির শপথ নেন আর নিজেদের বীরগাথার কথা সকলের অগোচরেই রেখে দেন। আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরব বীর বাঙালি সেনানী ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম ভারতীয় কমান্ডার সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের বীরগাথার কথা।
প্রথম ভারতীয় হিসাবে বায়ুসেনার স্কোয়াড্রনকে নেতৃত্ব দেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ভারত স্বাধীন হলে তিনি বায়ুসেনার প্রধান পদেও আসীন হন। অসাধারণ নেতৃত্বদান ও সামরিক রণকৌশলের জন্য বিখ্যাত ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়।
১৯১১ সালের ৫ মার্চ কলকাতার এক বনেদি শিক্ষিত পরিবারে জন্ম সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের। ঠাকুর্দা নিবারণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন সমাজসেবক ও ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য। বাবা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইসিএস। মা চারুলতাও বেশ অনেক বছর বিলেতে ছিলেন। দাদু ডক্টর পি কে রায় ছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ। দিদিমা ছিলেন সরলা রায়। শিক্ষাবিদ সরলা রায় গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। সুব্রত মুখোপাধ্যায় ছিলেন ৪ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো। দিদি রেণুকা রায় ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী যিনি পরে রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৩৯ সালে মরাঠি শিক্ষাবিদ ও ২ বারের লোকসভা সাংসদ শারদা পণ্ডিতের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ভারত ও বিলেতের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন মেধাবী সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তিনি ছোটোবেলা থেকে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে চাইতেন।
১৯২৮ সাল থেকে সামরিক বাহিনীতে ভারতীয়দের যোগদানের জন্য দরজা খুলে দেয় ব্রিটিশ সরকার। ১৯৩২ সালে স্থাপিত হয় ভারতীয় বায়ুসেনা যেখানে একমাত্র ভারতীয়রাই আধিকারিক হিসাবে কমিশনড হতে পারতেন। ইংল্যান্ডের লিনকনশায়ারের ক্র্যানওয়েলে রয়্যাল এয়ার ফোর্স কলেজ থেকে সফল ভাবে প্রশিক্ষিত হন সুব্রত মুখোপাধ্যায়-সহ ৬ ভারতীয়। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৩৩ সালের এপ্রিলে প্রথম ভারতীয় বায়ুসেনার স্কোয়াড্রনে পাইলট হিসাবে যোগ দেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ১৯৩৬-৩৭ সালে ব্রিটিশ সেনার নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে (এখনকার পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ) পুশতু বিপ্লবীদের সফল ভাবে ঠেকান সুব্রত মুখোপাধ্যায়। কাজে খুশি হয়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯৩৯ সালে বায়ুসেনার প্রথম ভারতীয় স্কোয়াড্রন লিডার হিসাবে নিযুক্ত করে। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ই প্রথম ভারতীয় হিসাবে রয়্যাল এয়ারফোর্স স্টেশনের নেতৃত্ব দেন। এখনকার পাকিস্তানের কোহটে ব্রিটিশ সরকারের হয়ে বায়ুসেনার ঘাঁটি তৈরি করেন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি অফিসার অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার সম্মানে সম্মানিত হন। ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ এয়ার মার্শাল স্যর থমাস এলমহার্স্ট সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে এয়ার ভাইস মার্শাল ও ডেপুটি চিফ অফ এয়ার স্টাফ পদে নিয়োগ করেন। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল ডিফেন্স কলেজ থেকে সফল প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫৪ সালের এপ্রিলে ভারতীয় বায়ুসেনার কমান্ডার ইন চিফ হন। ১৯৫৫ সাল থেকে ভারতীয় বায়ুসেনার সর্বোচ্চ পদকে বলা চিফ অফ এয়ার স্টাফ। ১৯৪৭ সালের ভারত পাক যুদ্ধর সময় এয়ার ভাইস মার্শাল হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ১৯৬০ সালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে ভারত ও জাপানের বাণিজ্যিক উড়ান চালুর জন্য গিয়েছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। এক রেস্তোরাঁয় নৈশভোজ সারার সময় রহস্যজনক ভাবে শ্বাসনালীতে মাংসর হাড় আটকে মৃত্যু হয় সুব্রত মুখোপাধ্যায়। চিকিৎসকরা তাঁকে বাঁচাতে পারেননি।