চিত্রঃ নিজস্ব গ্রাফিক্স
যুধাজিৎ মুখোপাধ্যায়: প্রোটিয়ারা ২ উইকেটে ১৬৮, রান রেট ৬- খেলছে বললে ভুল হবে, বেধড়ক পেটাচ্ছে ডি’কক এবং ব্রিতজকেরা। মনে হচ্ছিল ৫০ ওভারে ৩৫০ রানের লক্ষ্যমাত্রা অবধারিত। তার মধ্যে প্রথম ২ ওভারে ২৭ রান দেওয়ার পরেও আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে ‘গতিহীন দিশাহীন’ প্রসিদ্ধকে। কিন্তু ওখানেই পাশা পাল্টাল! একই ওভারে পরপর দুটি উইকেট (যার মধ্যে একটি আগের ম্যাচ জেতানো মার্করামের) এবং কিছু পরেই দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পরে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে থাকা ডি’কককে তুলে নিয়ে ভারতকে ম্যাচে ফেরাল ‘অগতির গতি’ সেই কৃষ্ণ! এতদিন ধরে সবাই অনেক সমালোচনা করেছে ওর- এর পরেও হয়তো বলা হবে যে এত সুযোগ পেলে এরকম একটু-আধটু পারফরম্যান্স তো হবেই। কিন্তু অনস্বীকার্যভাবে ওইসময় একা হাতে ভারতকে ম্যাচে ফেরাল প্রসিদ্ধই। এবং ওর তৈরি করা ছিদ্র দিয়ে ঢুকে প্রোটিয়াদের দুর্ধর্ষ মিডল অর্ডার তছনচ করে দিল ‘জাদুকর’ কুলদীপ যে এনিয়ে ১১ বার একদিনের খেলায় ৪ উইকেট নিল যা ভারতের পক্ষে সর্বোচ্চ।
একসময় মনে হওয়া ৩৫০ রানের লক্ষ্যমাত্রা নেমে দাঁড়ালো ২৭০-এ মূলত ভারতের এই দুই বোলার- একদিকে কোচের ‘আস্থা-ভাজন’ প্রসিদ্ধ এবং অন্যদিকে কোচের ‘অনাস্থা-ভাজন’ কুলদীপ-এর জন্যেই। সত্যি বলতে কি, এই ম্যাচে অপেক্ষাকৃত সহজ রান তাড়া করে জেতা কোনও ব্যাটার-এর চেয়ে এই দুজনের কেউ ম্যান অফ দি ম্যাচ হলে যোগ্য সিদ্ধান্ত হত হয়তো। যাই হোক, পাটা পিচে এই রান তুলতে ভারতের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবুও প্রোটিয়ারা লড়াই করেছে- তাদের জোরে বোলাররা ভারতের ওপেনার জুটিকে বিশেষ করে যশস্বীকে বেশ বিব্রত করেছে। রোহিত এসময় পুরো অভিভাবকের মত গাইড করে গেছে তাকে, যেটা সে এই ধরণের জুনিয়রদের জন্যে করে আসছে – যেমন একসময় তেন্ডুলকর-দ্রাবিড়রা করেছে।
সহজ হয়ে আসা পিচে হিটম্যান আর যশস্বী গড়ে তুলল ১৫৫ রানের বিশাল জুটি। রোহিত ৭৫ রানের আরেকটি ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেললেও অবধারিত সেঞ্চুরি হাত ছাড়া করল। যদিও এরকম ব্যক্তিগত মাইলফলক নিয়ে তার কোনওকালেই মাথাব্যথা নেই। তবুও সে মোট ২০ হাজার আন্তর্জাতিক রান করে শচীন-কোহলি-রাহুলদের সঙ্গে দুর্লভ কীর্তির অংশীদার হল। সিরিজ নির্ণায়ক ম্যাচে বিশ্বের সর্বোচ্চ রান (১২৬১)-এর রেকর্ডও করল রোহিত। যশস্বীও ফর্মে ফিরল অপরাজিত শতরান করে এবং তার উল্টোদিকে অনায়াসে ৪৫ বলে ৬৫ করে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকল নতুন রূপে আবির্ভূত কোহলি। সিরিজে মোট ৩০২ রান করে (তিন ম্যাচের সিরিজ এ ওর প্রথম ৩০০, সেইসঙ্গে কোনও সিরিজে সর্বোচ্চ ছয় ১২টি) সিরিজ সেরাও সে। একরকম বলা যায় ভারতের শক্তি যে কতটা, কত গভীর যে তাদের ব্যাটিং এবং বোলিং – তা দেখা গেল সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে। ম্যাচের শেষে ভারতের মাঠের ধারে কোহলির কথাতেও যেন শাস্ত্রীর সাবধানবাণীর প্রতিধ্বনি – রোহিত-কোহলির সঙ্গে যারা ঝামেলা করবে তাদের মুখের ওপর এভাবেই জবাব দেবে তাদের ব্যাট। সবচেয়ে অদ্ভুত লাগল এটা দেখে যে, সব ফরম্যাটে বিশ্বজয়ের যে নীল নকশা তৈরি করা হয়েছিল রাহুল-রোহিত জমানায় তারই যেন প্রভাব পরিষ্কার দেখা গেল কালকের জয়ে।
একমাত্র মতিভ্রমজনিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাই (টেস্ট সিরিজের মত) এই দলের জয়রথ আটকাবে, নয়তো নবীন-প্রবীণদের সম্মিলিত এই প্রবল পরাক্রম আটকানোর ক্ষমতা যে কারও নেই তা দেখাই যাচ্ছে। ২০২৩-এর টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল, ২০২৩-এর বিশ্বকাপে অপরাজিত ভাবে ফাইনাল, ২০২৪ টি-২০ বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২৫-এ চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জয় – এগুলো ওই নীল নকশার সফল রূপায়ণ ছাড়া আর কিছু না। আশা রাখব, সে কথাটা বর্তমান কোচ-নির্বাচকরা মনে রেখে দলকে সঠিক ভাবে চালিত করবেন। একটা সেট হয়ে যাওয়া দল হাতে পেয়ে তাকে স্থির লক্ষ্যে অবিচল রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে তারা সব ফরম্যাটে বিশ্বজয়ী হতে পারে সেদিকে না এগিয়ে – অবিরাম দুর্বোধ্য দল নির্বাচন এবং দিকভ্রান্ত স্ট্র্যাটেজি দিয়ে দলে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে ভারতীয় ক্রিকেটকে কোন স্বর্গে নিয়ে যেতে চান অজিত- গৌতম জুটি, সেটা মনে হয় বোর্ডের এবার জানতে চাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। আর ভারতীয় ক্রিকেটে ‘রো-কো’-দের যে আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে তা স্পষ্ট হয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পরপর দুটি কঠিন সিরিজের পর। দুটি সিরিজেই সেরা খেলোয়াড় তো সেই ‘রো-কো’-ই। সিরিজ-এর আগে একটি লেখায় বলেছিলাম, ঝিমিয়ে যাওয়া দলের পালে হাওয়া আনতে পারে রো-কো! সেই হাওয়া যে ঝড় হয়ে প্রোটিয়াদের বিশাখাপত্তনমের পাশের বঙ্গোপসাগরে নিয়ে গিয়ে ফেলবে তা হয়তো স্বয়ং গুরু গম্ভীরও ভাবতে পারেননি।