চিত্র: সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: স্মার্টফোন এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রযুক্তির হাত ধরে কিছু ক্ষেত্রে জীবনযাপন অনেক সহজ হয়ে উঠেছে তেমনই প্রযুক্তির হাত ধরে বিপদও দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে দিনের অধিকাংশ সময় স্মার্টফোনে খুটুরখাটুর করেই কাটাচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়ারা। ক্লাসে একতৃতীয়াংশ সময় পড়ুয়ারা নিজেদের স্মার্টফোন ঘেঁটেই কাটাচ্ছে। নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভা টেলজার ও ক্যাটলিন বার্নেল নামের ২ গবেষক এই গবেষণা চালান। JAMA Network Open নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাপত্র।
গবেষণায় বলা হয়েছে, স্কুলে ক্লাসের মধ্যে বারবার স্মার্টফোন নেড়েচেড়ে দেখার ফলে পড়ুয়াদের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটেছে। কগনিটিভ কন্ট্রোল দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে নিজের লক্ষ্যর দিকে স্থির থাকার মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে গেছে। স্মার্টফোনের দিকে হাত বাড়ানোর ক্যুইক ইম্পাল্স দুর্বল হয়ে গেছে। ক্লাসরুমে বারবার স্মার্টফোন নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে পড়ুয়াদের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটছে। নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।
২ সপ্তাহ ধরে পড়ুয়াদের ওপর গবেষণা চালান গবেষক ইভা টেলজার ও ক্যাটলিন বার্নেল। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় প্রতিটি পড়ুয়া দেখা গেছে স্কুল চলাকালীন গড়ে ২ ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোন ঘাঁটাঘাঁটি করে কাটিয়েছে। গড়ে ৬৪ বার স্মার্টফোন নাড়াচাড়া করে দেখেছে। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়ারা ঘণ্টায় গড়ে ২৩ মিনিট স্মার্টফোন ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। নীচু ক্লাসের পড়ুয়ারা সেখানে একই সময় গড়ে ১২ মিনিট ধরে স্মার্টফোন ঘাঁটাঘাঁটি করেছে।
সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, পড়াশোনা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে নয়। স্কুল পড়ুয়ারা ক্লাসের মধ্যে বিনোদন ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে স্মার্টফোন ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। স্মার্টফোনে থাকা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাপ ও বিনোদন সংক্রান্ত অ্যাপ ব্যবহার করতেই পড়ুয়ারা ৭০% স্মার্টফোন ব্যবহার করেছে। পৃথক আরেকটা গবেষণায় দেখা গেছে, কমবয়সি তরুণী ও যুবতীরা সামাজিক ভাবে নানান রকম মানসিক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ভুগছেন। ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলে সোশ্যাল অ্যাংজাইটি। এর কারণ হল অতিরিক্ত স্মার্টফোনের ব্যবহার। ৪০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর গবেষণা চালানো হয়। এরমধ্যে ২৯৩ জন মহিলা, ১০৪ জন পুরুষ এবং ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছেন। অন্যদিকে, পৃথক আরেকটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটারের ব্যবহারের ফলে ঘুমের সমস্যা হচ্ছে ৷ অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইমের ব্যবহার কমবয়সি নাবালিকাদের মধ্যে মানসিক উদ্বেগ ও অবসাদের সমস্যা ডেকে আনছে।
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা এই গবেষণা চালান। গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় পিএলওএস গ্লোবাল পাবলিক হেলথ নামক জার্নালে। এর আগেও বহু গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিক্ষণ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে ঘুমের সমস্যা হয় যা প্রকারান্তরে মানসিক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করে। কিন্তু সুইডেনের গবেষকরা দেখেন ঘুমের সমস্যা ও মানসিক অবসাদ হাত ধরাধরি করে চলে। বিশেষ করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ নিয়ে বেশি পরিমাণে ঘাঁটাঘাঁটি করলে ঘুমের সমস্যা হচ্ছে। মানসিক সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজির গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের হোয়াইট ও গ্রে ম্যাটারে পরিবর্তন আনে। প্রযুক্তির জগতে ডিজিটাল ডিমেনশিয়া এক সমস্যা হয়ে উঠেছে। মস্তিষ্কের হোয়াইট ও গ্রে ম্যাটারের পরিবর্তন মানসিক সমস্যা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে তুলছে। স্মৃতিশক্তি কমছে। শেখার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যা পরে ডিমেনশিয়ার সমস্যা ডেকে আনছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সময় ধরে একটানা স্মার্টফোন ব্যবহার নিউরোটক্সিটি বাড়িয়ে তুলছে। যা পরে স্মৃতিভ্রংশ, অ্যালঝাইমার্স রোগ ডেকে আনছে।
অতিরিক্ত সময় ধরে স্মার্টফোন ব্যবহার, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম মানুষকে অলস করে তুলছে। কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ, স্থুলতার সমস্যা ডেকে আনছে, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমিয়ে ডেকে আনছে গুরুতর অসুখ। শারীরিক কসরত করলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়। মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ে। রাতে বেশি পরিমাণে স্মার্টফোন ঘাঁটাঘাঁটি করলে শরীরের সিরকাডিয়ান রিদম বা শরীরের অভ্যন্তরীন ব্যবস্থা ঘেঁটে যায়। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। মোবাইলে ঘাঁটাঘাঁটি করলে মেন্টালি স্টিমিউলেটিং অ্যাক্টিভিটি কমে যায়। সামাজিক মেলামেশা কমে যায়। একাকীত্ব, মানসিক অবসাদ, উৎকণ্ঠা বাড়ে।