চিত্রঃ সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু, আমাদের সকলের প্রিয় নেতাজী শুধু বাঙালি নয়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে থাকা গোটা ভারতীয় সমাজ ও জাতিকেও পথ দেখিয়েছিলেন। আর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে পথ দেখিয়েছেন তাঁর শিক্ষক বেণীমাধব দাস। আচমকা নেতাজী ‘সুভাষচন্দ্র’ হয়ে ওঠেননি। দেশ ও দেশবাসীকে ভালোবাসার শিক্ষা বাবা জানকীনাথ বসু ও মা প্রভাবতী দেবীর কাছ থেকে পান নেতাজী। জীবনের সূচনায় পাওয়া সেই শিক্ষা পূর্ণতা পায় ছাত্রজীবনে শিক্ষক বেণীমাধব দাসের ছত্রছায়ায়। ছাত্র সুভাষের জীবনে শিক্ষক বেণীমাধব দাসের প্রভাব সুদূর প্রসারিত। কটকের ইংরেজ মিশনারি স্কুলে প্রথাগত স্কুলজীবন শুরু হয় নেতাজীর। কিন্তু স্কুলে ছিল সাহেবিয়ানার পরিবেশ যা একেবারে পছন্দ হয়নি তাঁর। বছর সাতেক ওই স্কুলে কাটান তিনি। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকলেও বাংলা ভাষা জানতেন না। কটকের র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রথমে বেজায় অসুবিধায় পড়েন। সহপাঠী ও শিক্ষকদের তাঁর বাংলা শুনে হাসাহাসি শোনার পর নীরবে অপমানিত হন। কিন্তু হাল ছাড়েননি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। কঠোর পরিশ্রমে বাংলা ভাষা শেখেন।
পরীক্ষায় বাংলায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পান নেতাজী। ‘ভারত পথিক’ বইয়ে নেতাজী নিজে জানান স্কুলের পরিবেশে তাঁর দিন খুব আনন্দে কাটছিল। মেধাবী সুভাষকে স্নেহ করতেন স্কুলের শিক্ষকরাও। কিন্তু ছাত্র সুভাষের জীবনে অমোঘ প্রভাব ছিল প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাসের। বেণীমাধব দাস সামান্য ক্লাস নেন সুভাষচন্দ্রর। কিন্তু তাঁর প্রবল ঋজু ব্যক্তিত্ব ছাত্রর মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। তিনি প্রিয় ছাত্রর মনে নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলেন। সুভাষচন্দ্র বসুর নিজের কথায় রয়েছে, ‘শিক্ষকদের মধ্যে একজনই মাত্র আমার মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। তিনি আমাদের প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাস। প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে মনে ভাবতাম, মানুষের মতো মানুষ হতে হলে ওঁর আদর্শেই নিজেকে গড়তে হবে।’
১৮৬৬ সালে চট্টগ্রামে জন্ম বেণীমাধব দাসের। কেশবচন্দ্র সেনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ব্রাহ্ম সমাজে যোগ দেন। বেণীমাধব দাস এমএ পাশ করার পর চট্টগ্রাম কলেজে যোগ দেন। তিনি দর্শনশাস্ত্র, অর্থনীতি, ন্যায়শাস্ত্র ও ইতিহাস পড়াতেন। র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলের কর্তৃপক্ষ স্কুলটিকে আদর্শ স্কুল হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছিল। তাদের কথামতো চট্টগ্রামে অধ্যাপকের চাকরি ছেড়ে কটকের স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন বেণীমাধব দাস।
যেদিন বেণীমাধব দাস র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুল ছেড়ে চলে যান সেদিনের কথা কখনো ভুলতে পারেননি প্রিয় ছাত্র সুভাষ। তবে আদর্শ শিক্ষকের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল সুভাষচন্দ্রর। বেণীমাধব দাস ছিলেন প্রকৃত মানুষ গড়ার কারিগর। পড়ুয়াদের বুঝতেন তিনি। তিনিই চিঠির মাধ্যমে সুভাষচন্দ্রকে শেখান কীভাবে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে। প্রকৃতি প্রেমের মাধ্যমে নেতাজীর মনে একাগ্রতা, নিজেকে আবিষ্কার করার প্রেরণা জেগে ওঠে। জহুরি যেমন জহর চেনে তেমনই অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সুভাষচন্দ্রকে চিনেছিলেন বেণীমাধব দাস। প্রিয় ছাত্র সুভাষকে নিয়ে তিনি গর্ব করতেন। সুভাষচন্দ্রকে দেশপ্রেমের বীজমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন তিনি। বেণীমাধব দাসের মতো শিক্ষককে পেয়েছিলেন বলেই নেতাজী নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছিলেন।