চিত্র- এআই নির্মিত
Bangla Jago Desk: সাফল্যের চকমকে গল্পগুলো সব সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দামি কোচিং সেন্টার বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় ঠাসা ঘর থেকে শুরু হয় না। কিছু কিছু রূপকথা জন্ম নেয় ধুলোবালি মাখা গ্রামের রাস্তায়, চরম অভাবের সংসারে আর এক মায়ের নিঃশব্দ চোখের জল ও হাড়ভাঙা খাটুনির মধ্যে দিয়ে। মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার এক অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান কোলাপে প্রবীণ উত্তমরাওয়ের (Kolape Pravin Uttamrao) জীবন ঠিক তেমনই এক রূপকথার জীবন্ত দলিল। পরপর ৪ বার ইউপিএসসি প্রিলিমসে (UPSC Prelims) চরম ব্যর্থতা, ব্যাঙ্কিং-এসএসসি মিলিয়ে ৩০টিরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় হতাশা, করোনার সময় বাবাকে হারানো এবং চরম আর্থিক অনটন, সব বাধা ভেঙে চুরমার করে অবশেষে UPSC সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় স্তরে ৫৮৪ র্যাঙ্ক করে তাক লাগিয়ে দিলেন এই লড়াকু যুবক।
মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার খরাপ্রবণ ছোট্ট গ্রাম মিটকির বাসিন্দা প্রবীণ। কৃষির ওপর নির্ভরশীল পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা। স্কুলের গণ্ডি পার করার সময় প্রবীণ কোনো ‘টপার’ ছিলেন না, দ্বাদশ শ্রেণিতে তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ছিল মাত্র ৬০ শতাংশ। আর্থিক অভাবের কারণে ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যালের মতো দামি কোর্সে পড়ার সুযোগ হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের একটি সাধারণ কলেজে বাসে যাতায়াত করে BSc পাশ করেন তিনি। প্রবীণের জীবনের মোড় ঘুরেছিল ২০১৯ সালের ৫ জুন। সেদিন ক্রিকেট বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে রোহিত শর্মার এক ধৈর্যশীল শতরান দেখে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন তিনি। সেখান থেকেই দেশের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা UPSC-র স্বপ্ন দেখা শুরু।
কিন্তু স্বপ্ন দেখার পথটা ছিল কাঁটায় ভরা। শুরুতেই পরপর চারবার UPSC প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ব্যর্থ হন প্রবীণ। প্রতি বছর ফল প্রকাশের পর তালিকায় নিজের রোল নম্বর না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়তেন। ব্যাক-আপ হিসেবে ব্যাঙ্কিং, রেল, এসএসসি এবং রাজ্য স্তরের বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা মিলিয়ে ৩০টিরও বেশি ইন্টারভিউ ও পরীক্ষায় বসেছিলেন তিনি, কিন্তু সব জায়গা থেকেই জুটেছিল কেবল ‘রিজেকশন’।
এই চরম হতাশার মাঝেই প্রবীণের জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। করোনা মহামারীর সময় চিকিৎসার অভাবে কিডনির অসুখে মারা যান তাঁর বাবা। পরিবারের সম্বল বলতে তখন আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দুই ছেলের পড়াশোনা ও স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে ঢাল হয়ে দাঁড়ান তাঁদের মা। তিনি দিনমজুর হিসেবে মাইলের পর মাইল দূরের এলাকায় গিয়ে ‘আখ কাটার’ হাড়ভাঙা কাজ শুরু করেন। বছরের প্রায় ৬ মাস অন্য জেলায় গিয়ে আখ কাটা আর বাকি সময় গ্রামের জমিতে গম কাটার কাজ করে প্রবীণের বই ও খাতার খরচ জোগাতেন মা।
পুনে বা দিল্লির নামী কোচিং ইনস্টিটিউটে পড়ার বা দামি টেস্ট সিরিজ কেনার সামর্থ্য প্রবীণের ছিল না। তাই কারাডের একটি ছোট্ট লাইব্রেরিতে বসেই পুরনো সাধারণ কাগজে নিজের ভুল নিজে সংশোধন করে উত্তর লেখার অভ্যাস করতেন তিনি। অবশেষে ষষ্ঠ প্রচেষ্টায় এল সেই বহু কাঙ্ক্ষিত ম্যাজিক মুহূর্ত। UPSC-র মেধা তালিকায় ৫৮৪ নম্বর র্যাঙ্কে জ্বলজ্বল করে উঠল কোলাপে প্রবীণ উত্তমরাওয়ের নাম।
সাফল্যের খবর যখন আসে, প্রবীণের মা তখনও জানতেন না তাঁর ছেলে দেশের অন্যতম শীর্ষ অফিসার হয়ে গেছেন; তিনি তখন রোদে পুড়ে অন্যের মাঠে গম কাটার কাজ করছিলেন। মাঠের মাঝখানে মায়ের কাছে গিয়ে যখন প্রবীণ জড়িয়ে ধরে বলেন, “মা, আমি পাশ করেছি,” তখন মায়ের চোখ থেকে ঝরে পড়া আনন্দাশ্রু যেন বিগত সাত বছরের সমস্ত অপমান আর পরিশ্রমকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। প্রবীণের এই লড়াই প্রমাণ করে দিল, জেদ আর সততা থাকলে অভাব কোনওদিন স্বপ্নের পরিধিকে ছোট করতে পারে না।