চিত্রঃ সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: সুপ্রিম কোর্টে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। এই মামলার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা পৃথক মামলাটিরও সোমবার শুনানি হয় প্রধান বিচারপতির এজলাসে।
শুনানিতে রাজ্যের পক্ষে আইনজীবী জানান, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে ৮,৫০০ জন কর্মী দিয়েছে। শনিবার ই-মেলের মাধ্যমে এই তথ্য কমিশনকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। তবে প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, কর্মীদের নামের তালিকা কোথায় এবং তাঁরা আদৌ বাংলা জানা কি না। আদালত স্পষ্ট করে জানায়, শুধু কর্মী দেওয়া নয়, তাঁদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও জমা দেওয়া প্রয়োজন।
রাজ্যের আইনজীবী জানান, জেলাভিত্তিক বিবরণ আগেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিশনের আইনজীবী সেই দাবি নাকচ করে বলেন, এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য তাঁদের হাতে পৌঁছয়নি। এই বিতর্ক এড়াতে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, বিষয়টি পরিষ্কার করতে প্রয়োজনে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে ডেকে পাঠানো হবে।
আদালতে রাজ্যের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দেওয়া সব কর্মীই গ্রুপ ‘বি’ অফিসার। তবে প্রধান বিচারপতি জানতে চান, সেই তালিকা কমিশনের হাতে আদৌ পৌঁছেছে কি না। রাজ্যের আইনজীবী জানান, নাম-সহ বিস্তারিত তথ্য দিতে কিছুটা সময় লাগবে। এতে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, তার অর্থ কর্মীদের পূর্ণ তালিকা এখনও প্রস্তুত নয়, ফলে তাঁরা কীভাবে ডিইও-র কাছে রিপোর্ট করবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
প্রধান বিচারপতি আরও জানতে চান, এই ৮,৫০০ অফিসার আদৌ পরের দিনের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইআরও-দের কাছে রিপোর্ট করতে পারবেন কি না এবং এইআরও-রা রাজ্য সরকারের আধিকারিক কি না। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এইআরও-রা রাজ্য সরকারেরই আধিকারিক এবং তাঁদের পদমর্যাদা মাইক্রো অবজার্ভারের থেকেও নীচে। পরে বিচারপতি বাগচি প্রশ্ন তোলেন, এইআরও-রা কোন গ্রুপের অফিসার। এর উত্তরে জানানো হয়, ২৯৪ জন ইআরও স্তরের অফিসার গ্রুপ ‘এ’ শ্রেণির।
কমিশনের আইনজীবী আদালতে জানান, প্রয়োজনীয় অফিসারদের ধরন উল্লেখ করে মোট পাঁচটি চিঠি রাজ্যকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অনুযায়ী কর্মী দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়। কমিশনের দাবি, তাদের ৩০০ জন গ্রুপ ‘বি’ অফিসার প্রয়োজন ছিল, অথচ বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র ৮০ জন; বাকিরা গ্রুপ ‘সি’ ও অন্যান্য শ্রেণির।
প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা করেন, মাইক্রো অবজার্ভারদের কাজ ইআরও ও এইআরও-দের সহায়তা করা। রাজ্যের অফিসাররা যুক্ত হলে তাঁরাও মতামত দিতে পারবেন, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ইআরও-রাই।
শুনানিতে বিচারপতি বাগচি সফটওয়্যার ব্যবহারের কঠোরতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, নামের সামান্য বানানভেদ বা বয়সের ব্যবধানের ভিত্তিতে ব্যাপক হারে নোটিস পাঠানো হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বাংলায় ‘কুমার’ অনেক সময় মধ্যনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তা বাদ পড়লেও নোটিস পাঠানো হচ্ছে। একইভাবে বয়সের ব্যবধানকে ভুলভাবে পারিবারিক সম্পর্ক ধরে নেওয়া হচ্ছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মাইক্রো অবজার্ভারদের জন্য অন্তত ১০ দিনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এবং সেই প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। এখনও প্রায় ১৪ লক্ষ শুনানি বাকি রয়েছে বলেও জানানো হয়। রাজ্যের দেওয়া কর্মীদের প্রশিক্ষণ ছাড়া কাজে নেওয়া কঠিন বলে দাবি করে কমিশন।
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী অভিযোগ করেন, নামের বানান ভুলের কারণে ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে প্রধান বিচারপতি জানান, এই মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনও নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। রাজ্যের তরফে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, ১৪ ফেব্রুয়ারির পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হলে আর আপিলের সুযোগ থাকবে না।
মাইক্রো অবজার্ভারদের ভূমিকা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। অভিযোগ করা হয়, তাঁদের দিয়ে ইআরও ও এইআরও-র সিদ্ধান্তে সম্মতি বা অসম্মতি চিহ্নিত করানো হচ্ছে, যা কার্যত বেআইনি ক্ষমতা দেওয়ার শামিল। কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, রাজ্য তাদের নির্দেশ মানছে না এবং অসহযোগিতা করছে।
মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই; এটি সংবিধানের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রকাশ। এই বিষয়কে রাজনীতিকরণ না করারও বার্তা দেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, রাজ্যকে ৮,৫০৫ জন গ্রুপ ‘বি’ অফিসার নিশ্চিত করতে হবে। মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে তাঁরা সংশ্লিষ্ট ডিইও বা ইআরও-র কাছে রিপোর্ট করে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কমিশন প্রয়োজনে ইআরও ও এইআরও-দের পরিবর্তন করতে পারবে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ইআরও-রাই।
আদালত আরও জানায়, ১৪ ফেব্রুয়ারির পর নথি যাচাই ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ইআরও-দের অতিরিক্ত এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে। পাশাপাশি রাজ্যে এনুমারেশন ফর্ম পোড়ানোর ঘটনায় এখনও এফআইআর না হওয়ায় রাজ্যের পুলিশ ডিজি-কে শোকজ করা হয়েছে এবং হলফনামা জমা দিয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।