চিত্র- সংগৃহীত
AK Bangla Desk: নিট প্রশ্নফাঁস-কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পথে নামা পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলা বাতিল করল সুপ্রিম কোর্ট। ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত এফআইআর রুজু হয়েছিল, সেগুলি খারিজ করতে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে শীর্ষ আদালত। তবে একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে, যে ২,৮৭৩ জন আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই অপরাধমূলক মামলা রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন করে এফআইআর দায়ের করতে পারবে দিল্লি পুলিশ। এই নির্দেশের পর ৫ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ঘোষিত প্রতিবাদ কর্মসূচি প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। সংগঠনটির দাবি ছিল, নিট-কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় কেন্দ্রীয় সরকার যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার অনেকটাই পূরণ করা হয়নি। এমনকি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতিও রাখা হয়নি। সেই অভিযোগেই ৫ সেপ্টেম্বর নতুন করে দিল্লিতে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছিল সিজেপি।
ঘটনাচক্রে, ওই কর্মসূচি ঘোষণার পর সোমবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি পুলিশ। নিট প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআরগুলি বাতিল করার আবেদন জানানো হয়। কেন্দ্র ও দিল্লি পুলিশের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি জানান, ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আর নতুন কোনও এফআইআর দায়ের করা হবে না। এরপর মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ জানায়, ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিল্লির বাইরে অন্য কোনও রাজ্যেও যদি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়ে থাকে, সেগুলিও বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে ২,৮৭৩ জন আন্দোলনকারীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকছে। দিল্লি পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধমূলক মামলা ছিল। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন করে এফআইআর দায়ের করা হবে। আদালত সেই প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়নি।
২৫ জুলাই কী হয়েছিল?
নিট প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সিজেপি নেতৃত্বের বৈঠক হয়েছিল। মঙ্গলবার সেই বৈঠকের বিষয়বস্তু আদালতকে বিস্তারিত জানান সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে কেন্দ্র ইতিবাচক পদক্ষেপ করছে। মেহতা আরও জানান, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, অসম এবং মহারাষ্ট্র সরকারও নিজেদের রাজ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর বাতিলের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে।
নিট-কেলেঙ্কারির পর যে পড়ুয়ারা আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্যের বিষয়টিও বিবেচনা করছে কেন্দ্র। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে তিন মাস সময় চেয়েছিল সরকার। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, আগামী তিন মাসের মধ্যেই মৃত পড়ুয়াদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি প্রত্যাহার
সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের অবস্থানের পর ৫ সেপ্টেম্বরের ঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানায় সিজেপি। সংগঠনের মুখপাত্র সৌরভ দাস প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চকে জানান, ভারত সরকারের তরফে ইতিবাচক আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে। সেই কারণেই আপাতত প্রতিবাদ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এরপর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, উভয় পক্ষ দায়িত্বশীল এবং ইতিবাচক আচরণ করলে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। নিট প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর সিজেপির নেতৃত্বে দিল্লিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতা, মুম্বই-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে। দিল্লি ও বিভিন্ন রাজ্যে প্রতিবাদী পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর দায়ের হয়েছিল।
যন্তর মন্তরে প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলন চলার পর ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তাঁর ইস্তফার পর কেন্দ্রের সঙ্গে ফের বৈঠকে বসে সিজেপি নেতৃত্ব। বৈঠকের শেষে সংগঠন জানিয়েছিল, কেন্দ্র তাদের সমস্ত দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। সেই বিশ্বাসেই আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পর এক মাস কেটে গেলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হয়নি বলে অভিযোগ তোলে সিজেপি। তার জেরেই ফের ৫ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। সেই প্রতিবাদ কর্মসূচি আটকানোর আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পৃথক মামলাও করেছিলেন দিল্লি পুলিশের এক অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁর আইনজীবী। তবে মিছিল বন্ধ করার জন্য কোনও জরুরি নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি আদালত। শীর্ষ আদালত জানায়, শুধুমাত্র কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে বলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে—এমনটা আগাম ধরে নেওয়া যায় না। আদালত আশা প্রকাশ করে, সব পক্ষই দায়িত্বশীল আচরণ করবে এবং আইন মেনে চলবে। এরপরই কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জানায়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ৫ সেপ্টেম্বরের নতুন আন্দোলনের চাপও কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের নেপথ্যে কাজ করেছে। তবে সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ায় সিজেপিও জানিয়েছে, আপাতত তাদের নতুন কর্মসূচির প্রয়োজন নেই।