চিত্রঃ সংগৃহীত
অর্পিতা বসু: শীতকালে ত্বকের নানা সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই শীতের শুরু থেকেই যত্ন নেওয়া উচিত ত্বকের। কেন শুষ্ক হয়ে যায় শীতকালে ত্বক? গরম জলে স্নান করা ত্বকের জন্য ভালো না ক্ষতিকর? তেল মালিশ ত্বকের জন্য কতটা উপকারী? নানান বিষয় জানালেন স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের চর্মরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর গৌরব রায়।

প্রশ্ন : শীতকালের ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় কেন?
উত্তর : শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যাওয়ায়, ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় এবং চামড়া উঠতে শুরু করে। ফলে ত্বক টানটান, খসখসে ও রুক্ষ হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন : বেশি গরম জলে স্নান করলে কী ত্বকের তৈলাক্ত ভাব চলে যেতে পারে?
উত্তর : শীতকালে অনেকেই গরম জলে স্নান করেন। গরম জলে স্নান করার ফলে ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যায়। বেশিবার গরম জলে স্নান করলে ত্বকের তৈলাক্ত ভাব পুরোপুরি চলে যায়, কারণ গরম জল ত্বকের প্রাকৃতিক তেল (sebum) ও আর্দ্রতা ধুয়ে ফেলে, যার ফলে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, খসখসে এবং সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন : শীতকালে কখন তেল মাখা ভাল স্নানের আগে না পরে?
উত্তর: শীতকালে স্নানের পর শরীর সামান্য ভেজা থাকা অবস্থাতেই তেল মাখা ভাল।এতে ত্বকের শুষ্কতা কমে এবং আর্দ্রতা বজায় থাকে। যা ত্বককে গরম জলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচায়। শীতকালে ত্বকের নানা ধরনের সমস্যা হয় স্নানের পরে তেল মাখলে সে সমস্যা থেকেও খানিক রেহাই পাওয়া যায়।
প্রশ্ন : নারকেল তেল, আর্গান অয়েল, অলিভ অয়েল বিভিন্ন ধরনের তেল রয়েছে তার মধ্যে কোনটা বেছে নেওয়া উচিত?
উত্তর : নারকেল তেল, আর্গান অয়েল, অলিভ অয়েল সবই ত্বকের জন্য ভালো। তবে, আর্গান অয়েলের উপকারিতা বেশি। কারণ এতে রয়েছে ভিটামিন ই, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফ্যাটি অ্যাসিড, যা ত্বককে গভীরভাবে ময়েশ্চারাইজ করে, প্রদাহ কমায়, বলিরেখা ও স্ট্রেচমার্কস হ্রাস করে। ব্রণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ত্বককে রাখে নরম ও উজ্জ্বল । এটি অ্যান্টি-এজিং সিরাম, টোনার, এবং ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে। নারকেল তেল তৈলাক্ত বা ব্রণ-প্রবণ ত্বকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে লোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তাই ত্বকের ধরন অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত। অলিভ অয়েল ত্বকের জন্য উপকারী, তবে সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করা উচিত।
প্রশ্ন: এখনও অনেকেই বাচ্চাদের সরষের তেল মাখিয়ে থাকেন ,সেটা কতটা ঠিক?
উত্তর : শিশুর ত্বক কোমল হয়। সরষের তেলে থাকা এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট নামক রাসায়নিক নবজাতকের সংবেদনশীল ত্বকের জন্য ক্ষতিকর, যা র্যাশ, লালচে ভাব ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, তাই এটি এড়িয়ে চলাই ভালো। নারকেল তেল বা মেডিকেটেড সার্টিফাইড কোনো অয়েল বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উপকারী।
প্রশ্ন: শীতকালে অনেকেরই খুশকির সমস্যা বেড়ে যায় তাদের জন্য কি বলবেন?
উত্তর: শীতের সময়ে এমনিতেও মাথার ত্বক শুকিয়ে গিয়ে চুলকানি, র্যাশ হয় অনেকের। চুলের ডগা ফাটার সমস্যাও দেখা দেয়। মাথার ত্বক থেকে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, ফলে মৃত কোষ ঝরে পড়ে এবং খুশকির সৃষ্টি করে। ম্যালাসেজিয়া হল এক ধরনের ইস্ট-এর মতো ছত্রাক যার পরিমাণ বেড়ে গেলে খুশকির প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। শীতকালে আবার অনেকেরই মাথায় জল দেওয়ার প্রবণতা কম থাকে, ফলে খুশকির সমস্যা বাড়ে। খুশকির সমস্যা বেশি বেড়ে গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শ্যাম্পু এবং ওষুধ ব্যবহার করা উচিত।
প্রশ্ন : শীতের ত্বকের জৌলুশ ধরে রাখতে কোন কোন ফল উপকারী?
উত্তর: ত্বকের জৌলুশ ধরে রাখতে অবশ্যই ডায়েটের উপর নজর দেওয়া উচিত। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত। কমলা, বেরি (স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি), কিউই, পেয়ারা, আভাকাডো, ডালিম, আম, কলা এবং আপেল অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এছাড়াও তরমুজ, পেঁপে ত্বকের জন্য উপকারী। কারণ এগুলো ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে, কোলাজেন বাড়াতে, ত্বকের দাগ ছোপ দূর করতে ও উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন ডিম, ডাল ,দই রাখা উচিত।
প্রশ্ন: শীতকালে ঠোঁট ফাটার সমস্যায় অনেকেই ভোগেন তাঁদের জন্য কী পরামর্শ?
উত্তর : শীতকালে ঠোঁট ফাটার কারণ বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়, ফলে ঠোঁটের পাতলা চামড়া দ্রুত জল হারায় ও শুষ্ক হয়ে যায়, যা ঠোঁট ফেটে যাওয়া, চামড়া ওঠা বা রক্তপাতের মতো সমস্যা তৈরি করে। অনেকেরই অভ্যাস থাকে ঠোঁট ভেজানোর জন্য জিভ ব্যবহার করা, এতে সমস্যা আরো বাড়ে। শরীরে পুষ্টির অভাব থাকলেও ঠোঁট ফাটতে পারে। ঠোঁটে সিবেসিয়াস গ্রন্থি (তেল গ্রন্থি) কম থাকাও ঠোঁট ফাটার একটি বড় কারণ। ঠোঁটকে আর্দ্র রাখতে নিয়মিত ঠোঁটে লিপ বাম (bee wax, lalolin) বা পেট্রোলিয়াম জেলি (ভেসলিন )ব্যবহার করুন। সান প্রটেকটিভ লিপবামও যথেষ্ট কার্যকরী।
প্রশ্ন : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন?
উত্তর : ত্বক ভালো রাখতে অন্ত্র বা গাটকে ভালো রাখা জরুরি, কারণ অন্ত্রের স্বাস্থ্য সরাসরি ত্বকের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। ত্বক ও অন্ত্র ভালো রাখতে
প্রোবায়োটিকস ও ফাইবার জাতীয় খাবার যেমন, টক দই, ফল, শাকসবজি খাদ্য তালিকায় রাখুন। শীতকালেও পর্যাপ্ত জল পান করুন এতে ত্বকের আর্দ্রতা ভেতর থেকে বজায় থাকবে। ত্বকের কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ ব্যবহার করবেন না। শীতের শুরু থেকেই ত্বকের যত্ন নেওয়া উচিত , তাহলে অনেক ছোটখাটো সমস্যা এড়ানো সম্ভব।