চিত্র: সংগৃহীত
অর্পিতা বসু: পুজো মানেই পেটপুরে ভূরিভোজ। দেদার অনিয়ম। উৎসব শেষে কিভাবে আবার ফিরবেন পুরনো ফর্মে, জানালেন নিউট্রিশনিস্ট, কনসালটেন্ট ডায়েটিশিয়ান , ডায়াবেটিস এডুকেটর ঈশানী গঙ্গোপাধ্যায় (Post-Puja Weight Loss Tips)।

প্রশ্ন : পুজোর পর বাড়তি মেদ ঝরাতে সকাল থেকে রাত ডায়েটে কি রাখা উচিত?
উত্তর : পুজোর পর ডায়েটের কথা বলতে গেলেই সবার প্রথমেই আসে ব্রেকফাস্টের কথা। সময়মতো ব্রেকফাস্ট খাওয়া উচিত। প্রাতরাশের তালিকায় রাখুন ওটস, ডালিয়া এমন খাবার যাতে শর্করার পরিমাণ কম এবং ফাইবারের মাত্রা বেশি থাকে। সাথে রাখতে পারেন যে কোনো সবজি, এবং অবশ্যই রাখুন দই ও যেকোনো মরসুমি ফল। পছন্দমত ছানা বা দুধও রাখতে পারেন। লাঞ্চে ভাত বা রুটি যেটাই খান তার পরিমাণটা সঠিক রাখুন। তার সাথে ডাল, সবজি এবং মাছ, ডিম বা মাংস যেকোনো প্রোটিন রাখুন।
একটা বিষয় মাথায় রাখবেন কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম করলেই হবে না, প্রোটিনের পরিমাণ যাতে সঠিক থাকে সেদিকে নজর দিতে হবে। বিকেলে কোনো স্যালাড, স্প্রাউট, টক দই বা লস্যি, খেতে পারেন। ডিনারে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার, সবজি,পর্যাপ্ত প্রোটিন, যেমন মাছ, মসুর ডাল, বা পনির রাখুন। খাদ্য তালিকা থেকে বাদ রাখুন চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার। বেশি রাতে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন (Post-Puja Weight Loss Tips)।
প্রশ্ন ; অনেকেরই ধারণা ভাত না খেয়ে রুটি খেলে সহজেই ওজন কমে। এটা কি মিথ ?
উত্তর : হ্যাঁ এটা একটি ভ্রান্ত ধারণা। ভাত বা রুটির মধ্যে খুব একটা ক্যালোরির তারতম্য হয় না। পরিমিত ভাত খেয়েও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনেকেই রোগা হওয়ার কারণে ডায়েটের থেকে প্রথমেই ভাতকে বাদ দিয়ে দেন, কারণ মনে করেন ভাত খেলে ওজন বাড়ে এবং রুটি খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। রুটিতে ফাইবারের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় পেট ভরা থাকে এবং রক্তে কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা স্থিতিশীল রাখে । তবে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভাত বা রুটির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। উভয় খাবারেই কার্বোহাইড্রেট থাকে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত শর্করা ফ্যাট হিসেবে শরীরে জমা হয়। তাই ভাত বা রুটি যেটাই খান, আপনার শরীরে কার্বোহাইড্রেটের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক পরিমাণের খান।
প্রশ্ন : এই যে হঠাৎ করে অল্প সময়ের মধ্যে ওজন কমানোর প্রবণতা , এর কি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে ?
উত্তর : হ্যাঁ, হতে পারে। আপনার ওজন কতটা কমানো প্রয়োজন, সেটা জেনে নিয়ে একটা ব্যালেন্স ডায়েট রাখা উচিত, যা অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী। নিজের মতো ডায়েট করে ওজন কমালে, শরীরে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। শরীরে ফ্যাটের পাশাপাশি মাসেল লস হতে পারে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলোর ঘাটতি দেখা দিলে, তা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। তাই অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন (Post-Puja Weight Loss Tips)।
প্রশ্ন : আজকাল অনেকেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া দেখে নিজেদের ডায়েট প্ল্যান করে থাকেন। ওজন কমাতে প্রত্যেকের জন্য কি একই রকম ডায়েট প্রযোজ্য ? নাকি এতে ক্ষতিও হতে পারে?
উত্তর: প্রত্যেকের শরীরে ক্যালোরির চাহিদা ভিন্ন। তাই, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার একজনের জন্য উপযুক্ত হলেও অন্যের জন্য তা উপযুক্ত নাও হতে পারে। সঠিক ডায়েট প্ল্যান নির্ভর করে আপনার শরীরের ব্যক্তিগত প্রয়োজন, কাজের ধরন এবং আপনার অভ্যাস অনুযায়ী। ডায়েট প্ল্যানের সময় আমাদের প্রবণতা থাকে প্রথমেই কার্বোহাইড্রেট নিয়ন্ত্রণ করা, কিন্তু কতটা কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করলে, তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আমাদের শরীরে হবে না, এটা আমাদের পক্ষে বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব হয় না। ভুল ডায়েটে শরীরে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিলে,বা দীর্ঘমেয়াদী হরমোনাল ভারসাম্যহীনতার কারণে স্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব পড়ে। তাই সোশাল মিডিয়ায় কোনো ভিডিও দেখে নিজের ডায়েট প্ল্যান করা উচিত নয়, অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
প্রশ্ন : নানা ধরনের সিড খাওয়া এখন ট্রেন্ডিং, এতে সত্যিই কতটা উপকার হয় এবং সবার জন্যই কি তা প্রয়োজন ? এর পরিমাপটাই বা কিভাবে নির্ধারণ করা যায় ?
উত্তর : সিড একটি পুষ্টিকর ‘সুপারফুড’ যার উপকারিতা রয়েছে। সিডে ফাইবার, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাসের মতো খনিজ থাকে। তবে মাথায় রাখতে হবে সিড খেলেই যে আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে এমনটা নয়, তা নির্ভর করে আপনার শরীরের অন্যান্য প্যারামিটারের ওপর। আবার অতিরিক্ত পরিমাণে সিড খেলে কিছু ক্ষেত্রে হজমের সমস্যা, যেমন পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটব্যথা হতে পারে।বিশেষ করে যাদের IBS-এর মতো পাচনতন্ত্রের সমস্যা আছে। মনে রাখবেন নানা ধরনের সিড খাওয়া এখন ট্রেন্ডিং হলেও আপনার শরীরে, এর কতটা প্রয়োজন রয়েছে, তা জেনে নেওয়া দরকার। এক থেকে দুই টেবিল স্পুন সিড খাওয়া যেতে পারে (Post-Puja Weight Loss Tips)।
প্রশ্ন : অনেকেই এখন ডিটক্স ডায়েটের উপর ঝুঁকছেন এতে কি সত্যিই ওজন কমে?
উত্তর : অনেকেই ওজন কমাতে ডিটক্স ডায়েট অনুসরণ করেন। তবে ডিটক্স ডায়েটে মোটেই মেদ ঝরে না। এর ফলে শরীর থেকে জল বেরিয়ে যায়, তাই ওজন কম হয়েছে বলে মনে হয়। স্বাভাবিক খাওয়া দাওয়া করতে আরম্ভ করলেই আবারো ওজন বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে ডিটক্স ডায়েট করলে, শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের মাত্রা কমে যেতে পারে, পুষ্টির ঘাটতি এবং হাইপোগ্লাইসিমিয়া হতে পারে। তাই ওজন কমানোর জন্য একটি স্বাস্থ্যকর, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরি, যা আমাদের স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন : দুর্গাপুজোয় মিষ্টি খাবার প্রবণতা বেড়ে যায়, যাঁরা সুগারের পেশেন্ট তাঁদের জন্য এই সময় কি পরামর্শ?
উত্তর : ব্লাড সুগার অবশ্যই পরীক্ষা করুন , ওষুধ এবং ইনসুলিন সঠিক সময় নিন। প্রতি দিন নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময় ধরে হাঁটুন, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যদি দেখেন সুগার বেড়ে গেছে , তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন (Post-Puja Weight Loss Tips)।
প্রশ্ন : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন?
উত্তর : ওজন কমানো কিন্তু কখনোই সৌন্দর্যের মাপকাঠি নয়। সুস্থ থাকার চাবিকাঠি হলো সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম। অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট খুব জরুরি।ওজন কমানোর প্রয়োজন হলে, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়েট প্ল্যান করুন।