চিত্রঃ সংগৃহীত
অর্পিতা বসু: নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ‘খেজুরের রসে’ না , গুড়ে’ নয়। কী এই নিপা ভাইরাস?
মানুষের মধ্যে কিভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস? কখন বুঝবেন আপনি আক্রান্ত? উপসর্গই বা কী? চিকিৎসকেরা বলছেন এর কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ, টিকা বা চিকিৎসা নেই, প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। কিভাবে হবেন সচেতন এবং কী কী সাবধানতা অবলম্বন করবেন? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডক্টর শুভ্রজ্যোতি ভৌমিক।

প্রশ্ন: নিপা ভাইরাস কি ? কিভাবে ছড়ায়?
উত্তর: ১৯৯৮-৯৯ সালে প্রথম বার নিপা ভাইরাসের খোঁজ মেলে।
নিপা একটি জুনোটিক ভাইরাস অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। নিপা ভাইরাসের উৎস হল বাদুড় কখনও কখনও শূকরও এই ভাইরাস বহন করতে পারে। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল থেকে বা সেই ফল ভালো ফলের সাথে মিশে থাকলে সেখান থেকে ছড়াতে পারে এই সংক্রমণ। সংক্রমণএছাড়াও এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলেও সেখান থেকে ছড়াতে পারে এই ভাইরাস। মানুষের দেহ রস (বমি, রক্ত), লালা রস, কাশি, হাঁচির মাধ্যমেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রশ্ন: বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি “জুনেটিক ভাইরাস” সেক্ষেত্রে উপসর্গ কি অন্যান্য ভাইরাসের মতোই?
উত্তর: প্রধান উপসর্গ ভাইরাল ফিভারের মতোই । যেমন, গায়ে ব্যথা, জ্বর, সর্দি ,গলা ব্যথা ইত্যাদি। এছাড়াও অন্যান্য উপসর্গ থাকে।
প্রশ্ন: তাহলে কী ধরনের উপসর্গ দেখলেই সতর্ক হওয়া উচিত?
উত্তর: জ্বর, সর্দি কাশি, গায়ে হাত-পায়ে ব্যথা, গলা ব্যথার সাথে যদি শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তিপূর্ণ কথাবার্তা বলা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখমণ্ডলের পেশি সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়া বা স্নায়ুর সমস্যা দেখা দিলে সচেতন হওয়া দরকার। যদি এনকেফেলাইটিস হয় সেক্ষেত্রে কোমা এবং খিঁচুনির মতন সমস্যা দেখা দিতে পারে। সংক্রমণের ৪ থেকে ১৪ দিনের মাথায় উপসর্গ দেখা দেয়।
প্রশ্ন: রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কি ধরনের টেস্ট করা প্রয়োজন ?
উত্তর: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী RTPCR টেস্ট, IGM এবং IGG টেস্ট করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: এর চিকিৎসা কি?
উত্তর : নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ, টিকা বা চিকিৎসা নেই। তাই প্রতিরোধের উপর জোর দিতে হবে। সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে ।
প্রশ্ন: যেহেতু এর কোনো প্রতিষেধক নেই সত্যি কতটা চিন্তার?
উত্তর: প্রথমেই যেটা বলতে চাইব যদি পরিবারের কারুর জ্বর হয় এবং তাঁর মধ্যে জ্বরের সাথে এই ধরনের কোনো উপসর্গ দেখা যায় তাহলে মাস্ক ব্যবহার করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রশ্ন: খেজুরের রস থেকে কি সংক্রমণ ছড়ানোর কোনো আশঙ্কা রয়েছে? এছাড়াও নিপা ভাইরাস কোন কোন খাবার থেকে ছড়াতে পারে?
উত্তর: খেজুর গাছের ডগায় খোলামুখ মাটির হাঁড়ি বেঁধে সারা দিন রাত সেইভাবেই খোলামুখ পাত্রে খেজুর রস সংগ্রহ করা হয় । যদি সেই রসে বাদুড়ের লালা রস কোনোভাবে মিশে যায়, সেই ‘খেজুরের রস’ বা ‘তালের রস’ থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। তাই খেজুরের কাঁচা রস সরাসরি খাবেন না। রস গরম করে ঠান্ডা হওয়ার পর পান করুন, রস ঢাকা দিয়ে রাখুন। তবে খেজুর গুড় বা পাটালিতে কোনও বাধা নেই। কারণ ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩০ মিনিট ফোটালে ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়, আর ১০০ ডিগ্রিতে ফোটালে তো সঙ্গে সঙ্গেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে তাই গুড় খেলে ভয়ের কিছু নেই।
প্রশ্ন: কি ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত?
উত্তর : কোভিডের ক্ষেত্রে যে ধরনের সাবধানতা আমরা অবলম্বন করেছিলাম যেমন মাস্কপড়া, পরিছন্নতা ও দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া এগুলি তো মেনে চলতেই হবে। গাছের আধ খাওয়া ফল খাবেন না। ফলে দাগ থাকলে খাবেন না, খোসা ছাড়িয়ে ফল খান। যেকোনো ফল, শাকসব্জি সব সময় ধুয়ে পরিষ্কার করে খাবেন। মাংস ভালো করে সিদ্ধ করে খাবেন। সবসময় হাত পরিষ্কার রাখবেন। কনট্যাক্ট ট্রেসিং প্রয়োজন।
প্রশ্ন: সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন?
উত্তর: সর্দি-কাশি বা জ্বরের সাথে যে উপর্গগুলির কথা আলোচনা করলাম, এই ধরনের কোনো সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সবশেষে এটাই বলব অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকুন।