ad
ad

Breaking News

Mobile Addiction

কিভাবে রাশ টানবেন মোবাইল ফোনের ব্যবহারে?

স্মার্টফোনে আসক্তি আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

mobile-addiction-symptoms

চিত্রঃ সংগৃহীত

অর্পিতা বসু: রোজ কত ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম হওয়া উচিত আপনার? কখন বুঝবেন আপনি মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন। জীবনের বহু ক্ষেত্রেই স্মার্টফোন এখন আমাদের সহায়।, কিন্তু তাকে আমরা কতটা ব্যবহার করব, আর কতটা তার দ্বারা ব্যবহৃত হব, সেই রাশটা অনেক সময়েই নিজের হাতে থাকে না। সে ক্ষেত্রে কি করনীয়? এমন নানান প্রশ্নের উত্তর দিলেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডক্টর শর্মিষ্ঠা বসু।

প্রশ্ন : মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি কী কী সমস্যা তৈরি করতে পারে?

উত্তর : আমাদের কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, বিনোদন সবটাই এখন ফোন কেন্দ্রিক। ফলে স্মার্টফোন ছাড়া এখন একটা দিন কাটানো অনেকের পক্ষেই অসম্ভব প্রায়। ফলে আমাদের স্ক্রিন টাইম অনেকটাই বেড়ে যায়।মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি থেকে শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। দিনের পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘসময় মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটির কারণে ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়।
মোবাইল ফোনের ব্লু লাইটের কারণে চোখের সমস্যা তৈরি হয়।চোখ জ্বালা, চোখ থেকে জল পড়া এমনকি সাময়িকভাবে দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে। ঘাড়ের ব্যথাও হতে পারে। অন্যদিকে বাস্তবে আমরা যে জগতে রয়েছি সেখানে আমাদের আশেপাশের মানুষদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।

প্রশ্ন: কখন একজন বুঝবেন তাঁর মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়েছে?

উত্তর : মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করার পর থেকে ধীরে ধীরে তার প্রতি আমাদের অভ্যাস তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই তৈরি হয় আসক্তি। আমাদের জানা দরকার কোথায় গিয়ে থামতে হবে। ফোন হাতে না পেলে বা নেটওয়ার্ক না থাকলে যদি আপনার মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়, বিরক্তি বা উদ্বেগ অনুভব করেন, ঘুম ও কাজে ব্যাঘাত ঘটে, প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও সম্পর্ককে অবহেলা করতে শুরু করেন, তখন বুঝবেন মোবাইল ব্যবহারের প্রতি আপনার আসক্তি তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন: এর থেকে ব্রেনের কতটা ক্ষতি হতে পারে?

উত্তর : দীর্ঘ সময় ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারের ফলে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে। এমনকী এক সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের সমস্যাও হতে পারে। স্মার্টফোনে আসক্তি আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে মস্তিষ্কের নিউরন কানেকশন দুর্বল হয়। বারবার ফোনের ব্যবহার আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন (dopamine) নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়,যা আমাদের মধ্যে আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। মোবাইলের প্রতিটি নতুন নোটিফিকেশন (লাইক, কমেন্ট, মেসেজ) যখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে, তখন বারবার আমরা ফোন চেক করি। সেখান থেকেই তৈরি হয় আসক্তি। যা ধীরে ধীরে আমাদের বায়োলজিক্যাল ক্লকের ব্যাঘাত ঘটায়, ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দৈনন্দিন কাজের ওপর প্রভাব ফেলে। আমাদের স্বাভাবিক ঘুমের প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে, আপনজনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে, সামাজিক নানা বিষয় থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের একটা আলাদা জগৎ গড়ে তুলছি। এবং এখান থেকেই ভবিষ্যতে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

প্রশ্ন: আমাদের স্ক্রিন টাইম কতটা হওয়া উচিত?

উত্তর : বর্তমান সময়ে কাজের জন্য আমাদের মোবাইলের ব্যবহার করতেই হয়। তবে তা যাতে আসক্তিতে পরিণত না হয়, তার জন্য মোবাইল এবং কম্পিউটারের স্ক্রিন টাইমের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা দরকার।একেবারে ছোট বাচ্চাদের হাতে কখনোই মোবাইল তুলে দেওয়া উচিত নয়। কারণ এই সময় তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে। ফোনের ব্যবহারের ফলে যা ক্ষতিগ্রস্ত হয় । ৩-৪ বছরের শিশুদের এক ঘন্টার বেশি ফোনের স্ক্রিন ঘাঁটা উচিত নয় ।৫ বছর থেকে একেবারে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তা দৈনিক দু’ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু যেমন বললাম, কাজের প্রয়োজনে অনেকটা বেশি সময় আমাদের ফোন ব্যবহার করতে হয়। তাই কিছু জিনিস মাথায় রাখা দরকার। কাজের প্রয়োজনে যদি ৭ থেকে ৮ ঘন্টা আপনার স্ক্রিম টাইম হয়ে যায় তাহলে প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিট অন্তর ৫ মিনিটে বিরতি নিন। প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়াও দৈনিক আমরা ইনস্টগ্রাম, ইউটিউব বা ফেসবুক নানা ধরনের সোশ্যাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করি এবং বিভিন্ন অ্যাপের পিছনেও অনেকটা সময় কাটাই। তাই কোথায় আমাদের দাড়িটা টানতে হবে কিভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সেটা মাথায় রাখা জরুরি।

প্রশ্ন: যাঁদের আসক্তি তৈরি হয়েছে, হঠাৎ করে স্ক্রিন টাইম কমালে কী কোনো withdrawal symptoms হতে পারে?

উত্তর : যাদের ফোনের প্রতি আসক্তি আছে, হঠাৎ করে স্ক্রিন টাইম কমালে তাঁদের মধ্যে বিরক্তি, অস্থিরতা, মনোযোগের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, এবং ফোন পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষার মতো withdrawal symptoms দেখা দিতে পারে। তাই হঠাৎ করে বন্ধ না করে ধীরে ধীরে স্ক্রিন টাইম কমানো উচিত এবং বিকল্প অভ্যাস যেমন, বই পড়ুন, গান শুনুন, বন্ধুদের সাথে সময় কাটান। বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও মোবাইল–অ্যাডিকশন একদিনে হয় না। তাই রাশটা যত গোড়ায় টানা যায়, ততই ভালো। দুম করে মোবাইলের ব্যবহার বন্ধ করতে বললে বাচ্চাদের মধ্যে জেদ চেপে যায়। তাই মোবাইল ব্যবহারের একটা রুটিন করে দিন। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় যে behavioural therapy করা হয় তা মাঝপথে বন্ধ করে দিলে withdrawal symptoms দেখা দিতে পারে। যেমন ধরুন পড়াশুনায় অবনতি, স্কুলে গিয়ে অমনোযোগী হয়ে পড়া, বন্ধুদের সাথে মারামারি করা, বাবা-মায়ের সাথে তর্ক করা যা হয়তো সে আগে করত না এই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই শুরু থেকেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

প্রশ্ন: মোবাইলে প্রতি আসক্তি Gen alpha এর জন্য কতটা চিন্তার?

উত্তর : Gen alpha এর জন্য মোবাইল আসক্তি অত্যন্ত চিন্তার বিষয়, কারণ তারা ছোট থেকেই প্রযুক্তির সাথে বড় হচ্ছে, ছোট বয়স থেকেই বাবা-মা হাতে ফোন দিয়ে দিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় তারা ভার্চুয়াল মাধ্যমের মধ্যে সময় কাটানোর ফলে বাস্তব জীবনের সাথে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের বাস্তব চিন্তাশক্তি কমছে, অধৈর্য হয়ে পড়ছে, হাইপার অ্যাক্টিভ হয়ে উঠছে। যা তাদের মানসিক, সামাজিক ও আচরণগত বিকাশে সমস্যা তৈরি করছে। বিশেষত কোভিড পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন মাধ্যমে পড়াশোনার ফলে স্ক্রিন টাইম বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে অনলাইন গেম, ভিডিও দেখার প্রতি আকর্ষণ বাড়ে যা অনেকেরই অভ্যাসে পরিণত হয়।
অতিরিক্ত স্মার্টফোন, ট্যাবের ব্যবহার খেলাধুলার অভ্যাস কমাচ্ছে। ধীরে ধীরে তাদের মানসিক, সামাজিক এবং আচরণগত বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যা উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা এবং বাস্তব জীবনের সাথে দূরত্ব তৈরি করছে, যা সত্যি উদ্বেগের বিষয়।

প্রশ্ন: কোথাও গিয়ে কী এই আসক্তি ভবিষ্যতে একাকিত্ব নিয়ে আসতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত আসক্তি ভবিষ্যতে একাকীত্ব নিয়ে আসতে পারে।
ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটানোর ফলে আমাদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সামাজিকভাবে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। যা ধীরে ধীরে আমাদের একা করে তোলে। আবার দৈনন্দিন কাজের চাপ,একঘেয়েমি বা একাকীত্ব থেকে বাঁচতেও আমরা ফোনকে সমাধান হিসেবে বেছে নিচ্ছি,যা আমাদের সাময়িক স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়ায়।

প্রশ্ন : এখান থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন?

উত্তর : আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে মোবাইল ফোন আমাদের ব্যবহার করতেই হবে কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে কোনভাবেই তা যেন আসক্তিতে পরিণত না হয়।
১) বারংবার ফোন চেক করা থেকে বিরত থাকুন। সারাদিনে অন স্ক্রিন থাকার সময়কে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার অভ্যাস করুন।
২) নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে, যা এক ধরনের আনন্দের অনুভূতি দেয় এবং আসক্তি তৈরি করে।
৩)অ্যাপ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন।
৪) খাবারের সময় ফোন থেকে দূরে থাকুন।
৫) খেয়াল রাখবেন ঘুম থেকে ওঠার পরই খুব জরুরি কাজ না থাকলে বিছানায় বসে ফোনের ব্যবহার করবেন না।
৬) একইভাবে রাত্রে ঘুমোতে যাবার নূন্যতম ৩০ মিনিট আগে থেকে ফোন দূরে রাখুন।
৭) বাবা-মাকেও মনে রাখতে হবে সন্তানকে মোবাইল ছাড়ার কথা বলে নিজেরাই যেন সারা দিন স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে না থাকেন। রোল মডেল হতে হবে ওঁদেরই।
৮)দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এই আসক্তি একদিনে বা এক সপ্তাহে দূর করা সম্ভব নয়। তাই ধীরে ধীরে অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।