চিত্র- সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: ব্যায়াম করার সময় নেই— অলস জীবনযাপনের পক্ষে এই অজুহাতটিই সবচেয়ে সাধারণ। তবে আধুনিক বিজ্ঞান এখন সেই অজুহাতকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো এক নতুন দিশা দেখিয়েছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় হার্ট জার্নালে প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণায় জানা গিয়েছে যে, সুস্বাস্থ্যের জন্য জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানোর প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিটের অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য শারীরিক কসরত বা ভিগোরাস ইন্টারমিটেন্ট ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি (VILPA) আটটি মারণ রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, বাসের জন্য দৌড়ানো, দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা কিংবা বাড়ির ভারী কাজ দ্রুততার সঙ্গে করার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই শরীরকে দীর্ঘস্থায়ী রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। ৭০ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, ব্যায়ামের স্থায়িত্বের চেয়ে তার তীব্রতা শরীরের ওপর অনেক বেশি কার্যকর প্রভাব ফেলে। এই পাঁচ মিনিটের ক্ষুদ্র ব্যায়াম বা মাইক্রো-ওয়ার্কআউট হৃদরোগ, স্ট্রোক, লিভার ও কিডনির সমস্যা, বাত এবং ডিমেনশিয়ার মতো স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

কেন মাত্র পাঁচ মিনিটের এই হাঁসফাঁস করা পরিশ্রম অলসভাবে হাঁটার চেয়ে বেশি কার্যকর? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, উচ্চ-তীব্রতার ব্যায়াম করলে শরীরে মেটাবলিক ট্রিগার সক্রিয় হয়। যখন কেউ এত জোরে শারীরিক পরিশ্রম করেন যে কথা বলতে গেলে দম আটকে আসে, তখন শরীর থেকে মায়োকাইন নামক উপাদান নির্গত হয় যা প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমাতে সাহায্য করে। এর ফলে কোষের শক্তিঘর তথা মাইটোকন্ড্রিয়া আরও দক্ষ হয়ে ওঠে এবং রক্তনালীর স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পায়, যা স্ট্রোক প্রতিরোধে সহায়ক।
ভারতীয়দের জন্য এই গবেষণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিনগত কারণেই ভারতীয়দের মধ্যে পেটের মেদ, উচ্চ রক্তচাপ এবং উচ্চ রক্ত শর্করার প্রবণতা বেশি থাকে। এছাড়া অল্প বয়সে হৃদরোগ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের প্রকোপও এ দেশে ক্রমবর্ধমান। দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা এবং মানসিক চাপের কারণে অনেকের পক্ষেই জিমে যাওয়ার সময় বের করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে এই ৫ মিনিটের নিয়মটি ভারতীয় জীবনযাত্রার জন্য একটি আদর্শ সমাধান হতে পারে।

এই গবেষণায় যে আটটি বিশেষ রোগের ঝুঁকি কমার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, ফ্যাটি লিভার এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসার। এই রোগগুলো প্রতিরোধের জন্য কোনো বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই উচ্চ-তীব্রতার ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। যেমন— স্টেশনে বা বাস স্টপে যাওয়ার সময় ২ মিনিট খুব দ্রুত হাঁটা, লিফটের বদলে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, ঘরের কাজ দ্রুত করা কিংবা একটি উচ্চ-তালের গানের সাথে পূর্ণ শক্তিতে নাচ করা।
তবে এই পদ্ধতি অনুসরণের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। সপ্তাহে একদিন দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করার চেয়ে প্রতিদিন পাঁচ মিনিট নিয়ম করে এই ক্ষুদ্র ব্যায়াম করা অনেক বেশি ফলদায়ক। যারা দীর্ঘকাল নিষ্ক্রিয় রয়েছেন, তারা শুরুতে ১-২ মিনিট দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন। তবে যাদের আগে থেকেই হৃদযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের উচ্চ-তীব্রতার পরিশ্রম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করে দিল যে, স্বাস্থ্য গঠন কোনো অল-অর-নাথিং খেলা নয়; বরং দিনের ছোট ছোট মুহূর্তের সঠিক ব্যবহারই শরীরকে মারণ রোগের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।