চিত্র: প্রতীকী
অর্পিতা বসু: আপনার কিডনির সঠিক যত্ন কী আপনি নিচ্ছেন?কিডনি হল আমাদের দেহের ছাঁকনি। কিডনির সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে বোঝা যায় না, কারণ কিডনি ৮০-৯০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কিডনির গুরুত্ব, কিডনি সম্পর্কিত ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে প্রতি বছর পালন করা হয় ‘বিশ্ব কিডনি দিবস’। এবছর বিশ্ব কিডনি দিবস ২০২৬’ এর থিম ছিল ‘সকলের জন্য কিডনি স্বাস্থ্য’। কিডনির স্বাস্থ্যের রেড ফ্ল্যাগ কী? কখন সচেতন হবেন? রইল বিশিষ্ট চিকিৎসক, সিনিয়র নেফ্রোলজিস্ট ডক্টর রঞ্জন সরকারের পরামর্শ।

প্রশ্ন : কিভাবে একজন বুঝবেন তাঁর কিডনিতে কোনো সমস্যা রয়েছে?
উত্তর: কিডনির সমস্যা সাধারণত শুরুতে লক্ষণহীন থাকে। আমাদের দেহের অন্যতম অঙ্গ কিডনি। কিডনির কোনো সমস্যা হলে, সারা শরীরে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। কিডনি রোগ দুই ধরনের হয়। অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি (AKI) অর্থাৎ কোনো সংক্রমণ, স্টোন জনিত কারণে কিডনির সমস্যা , এক্ষেত্রে ব্যথা হয় ফলে প্রাথমিক অবস্থায় রোগীরা বুঝতে পারেন কিডনির কোনো সমস্যা হয়েছে। কিন্তু ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) অর্থাৎ যা কয়েক মাস বা বছর ধরে ধীরে ধীরে কিডনি নষ্ট করে, এক্ষেত্রে আগাম কোনো সংকেত পাওয়া যায় না। তাই সতর্কতা শুরু থেকেই প্রয়োজন।
প্রশ্ন : কী কী কারণে কিডনি নষ্ট হতে পারে?
উত্তর : কিডনি নষ্ট বা ফেইলিওর হওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ অন্যতম। যা দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে দায়ী। পলিসিসটিক কিডনি ডিজিজ, নেফ্রাইটিস এছাড়া অতিরিক্ত পেইনকিলার খাওয়া, কম জল পান করার কারণেও কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, পা বা চোখের নিচে ফোলাভাব এবং শারীরিক দুর্বলতা কিডনির সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
প্রশ্ন: কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ কী?
উত্তর : সাধারণত প্রাথমিকভাবে কিডনির সমস্যার লক্ষণ বোঝা সম্ভব হয় না। নানান উপসর্গ নিয়ে রোগীরা যখন আমাদের কাছে আসেন তখন অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। আগেই জানিয়েছি, তাই কিছু লক্ষণ দেখা দিলে কখনোই অবহেলা করবেন না।সারা ক্ষণ ক্লান্তিভাব, ঘন ঘন প্রস্রাবের লক্ষণ কেবল ডায়াবিটিসের নয়, কিডনির অসুস্থতার কারণও হতে পারে।প্রস্রাবের সঙ্গে যদি রক্তপাত হয়, ফেনা আসে তা হলেও কিন্তু বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।কিডনির সমস্যায় শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয় ,পা ফুলে যায়, খাবারে অরুচি ,বমি ভাব ,ব্যথা হতে পারে। এছাড়াও ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে, এমনকী সারা শরীরে বাসা বাঁধতে পারে চুলকানির মতো সমস্যা। তাই হঠাৎ এমন উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রশ্ন : কিডনিতে স্টোনের সমস্যায় অনেকেই ভোগেন, কী কারনে কিডনিতে স্টোন হয়?
উত্তর : মূলত দুটি কারণে কিডনিতে স্টোনের সমস্যা দেখা দেয়। মেটাবলিজমের কারণে অনেকের প্রস্রাব দিয়ে ক্যালসিয়াম বেশি বের হয়।যে ক্যালসিয়াম গুলো জমে স্টোন তৈরি করে। আরেকটি কারণ হল পর্যাপ্ত জল না খাওয়া, নির্দিষ্ট কিছু খাবার যা অক্সালেট সমৃদ্ধ , তার প্রভাবে প্রস্রাবে খনিজ পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে যায়। তাই জল না খাওয়া কিডনিতে স্টোনের একটি প্রধান কারণ কিন্তু একমাত্র কারণ নয়।
প্রশ্ন: এর চিকিৎসা কী?
উত্তর : কিডনিতে স্টোনের চিকিৎসা স্টোনের আকার ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।কিডনি স্টোনের অনেক চিকিৎসা রয়েছে। সেক্ষেত্রে স্টোন ৬ মিমি এর ছোট হলে বেরিয়ে যেতে পারে ওষুধে। সেক্ষেত্রে রোগীকে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। বেশি পরিমাণে জল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।তবে মাথায় রাখতে হবে যে ওই স্টোনের মাপ বড় হলে বা অনেকগুলি স্টোন হলে আর ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে শক ওয়েভের মাধ্যমে স্টোন ভাঙা যায়। তারপর তা বেরিয়ে যায় মূত্রের মাধ্যমে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে ল্যাপরোস্কোপি সার্জারি করা হয়ে থাকে।
প্রশ্ন : কোন কোন খাবার কিডনির ক্ষতি করতে পারে?
উত্তর : কিডনির সমস্যা দেখা দিলে অর্থাৎ ক্রিয়েটিনিন যদি বাড়তে থাকে তাহলে ডায়েটে প্রোটিনের মাত্রা শরীরের চাহিদা মতো রাখুন কিন্তু খেয়াল রাখবেন তা যেন অত্যাধিক না হয়। মাছ, মাংস, ডিম, ছানা খেতে পারেন তবে পরিমিত। এখানে বলে রাখি ১০০ গ্রাম মাছ খাওয়া মানে কিন্তু আপনার শরীর ১০০ গ্রাম প্রোটিন পেল, এমনটা নয়। ১০০ গ্রাম মাছে প্রোটিন থাকে মাত্র ২০ গ্রাম। আমরা সাধারণত বলি, আপনার ডায়েট এমন হওয়া উচিত যাতে, শরীরে মোট প্রোটিনের চাহিদার অর্ধেক প্রোটিন জাতীয় খাবার এবং বাকি অর্ধেক নন প্রোটিন জাতীয় খাবার থেকে আসে। তাই ব্যালেন্স করে খাওয়া উচিত।এখানে বলে রাখা দরকার প্রোটিন লোড কিন্তু কিডনির ক্ষতি করে। যদি ক্রিয়েটিনিনের পরিমাণ তিন বা চারের বেশি হয়, তখন পটাশিয়াম জাতীয় খাবার খাওয়া চলবে না। খাবারে তেল এবং নুনের পরিমাণ কম রাখবেন। তবে একটাই অনুরোধ কিডনির সমস্যা দেখা দিলে কখনোই নিজের মতো বা কারোর কথা শুনে ডায়েট ঠিক করবেন না, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রশ্ন : কিডনি ভালো রাখতে কী প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়া প্রয়োজন?
উত্তর :জল আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক ‘ডিটক্সিফায়ার।প্রত্যেকেরই একটা প্রশ্ন থাকে দিনে কতটা জল খাওয়া প্রয়োজন? প্রথমত ঋতু পরিবর্তনের সাথে শরীরে জলের চাহিদা সরাসরি সম্পর্কিত। সবচেয়ে বেশি জলের প্রয়োজন হয় গরম কালে,কারণ ঘামের মাধ্যমে শরীর প্রচুর তরল হারায় । বর্ষাকালে বাইরে থেকে তৃষ্ণা কম মনে হলেও আর্দ্রতার কারণে শরীর থেকে জলীয় বাষ্প কমে যায় এবং ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি থাকে । তাই জল খাওয়া প্রয়োজন। শীতকালে আমাদের জল তেষ্টা কম পায়, শরীরের জলের চাহিদা ও কিছুটা কম থাকে। সুস্থ-সবল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের দিনে ৩ লিটার থেকে ৪ লিটার জল পান করা ভাল। মহিলাদের ক্ষেত্রে তা ২ থেকে ৩ লিটার হওয়া বাঞ্ছনীয়।সকালে প্রস্রাবের রং স্বচ্ছ বা হালকা ফ্যাকাশে হলুদ হলে নিশ্চিত হতে পারেন যে আপনার শরীর হাইড্রেটেড বা শরীরে পর্যাপ্ত জল রয়েছে। তবে কিডনির সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জল খান।
প্রশ্ন : কিডনির রোগ কী সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব?
উত্তর : অ্যাকিউট কিডনি ডিজিজের ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভব। কিন্তু ক্রনিক কিডনি ডিজিজের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব নয়। শুরুতেই সমস্যা যদি ধরা পড়ে, ধরুন শুধুমাত্র প্রস্রাবে প্রোটিন বেড়ে গেছে ক্রিয়েটিনিন এক বা দুইয়ের মধ্যে রয়েছে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনির সমস্যাকে সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এবং রোগী দীর্ঘদিন পর্যন্ত সুস্থ ভাবে জীবন যাপন করতে পারেন।
প্রশ্ন : কোন পরিস্থিতিতে ডায়ালিসিসের প্রয়োজন হয়?
উত্তর : ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনির সমস্যায় কিডনির কার্যক্ষমতা ১০% বা তার নিচে নেমে গেলে ডায়ালিসিসের প্রয়োজন হয়।সেই সময় কিডনি শরীর থেকে মূত্রের মাধ্যমে বর্জ্য,অতিরিক্ত তরল, ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন বের করতে ব্যর্থ হয়। এবং যখন পঞ্চম পর্যায় কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে তখন ডায়ালিসিস ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। শরীরে অতিরিক্ত জল জমে হাত-পা ফুলে গেলে, শ্বাসকষ্ট,গা গুলোনো,বমি ভাব এবং রক্তে বিষাক্ত টক্সিন জমা হলে, মূত্র উৎপাদন কমে গেলে ডায়ালিসিসের প্রয়োজন পড়ে।
প্রশ্ন : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কী বলতে চাইবেন?
উত্তর : ১)প্রথমত কিডনিতে স্টোনের সমস্যা থাকলে জল বেশি করে খান।
২) যাঁদের প্রোস্টেটের সমস্যা রয়েছে, অবহেলা না করে প্রথমেই চিকিৎসা করান।
৩) ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। নিয়মিত শরীর চর্চা করুন, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন, নিজের ইচ্ছে মতো কোনো ওষুধ খাবেন না।
৪)টাইপ টু ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, ওবিসিটি এবং পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে, নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
৫)আপনার কিডনি সুস্থ আছে কিনা জানার জন্য আমরা নির্দিষ্ট কিছু টেস্টের পরামর্শ দিই।যেমন
কিডনি ফাংশন টেস্ট,
‘ইউরিন এসিআর’ বা ‘ইউরিন অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন রেশিয়ো’ টেস্ট।
আর সবশেষে বলব কোনোরকম সমস্যা দেখা দিলে অবহেলা না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।