ad
ad

Breaking News

Juvenile Arthritis

শৈশবে বাতের থাবা: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও স্বপ্নপূরণ

কিভাবে বুঝবেন আপনার শিশু জুভেনাইল আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত? কি উপসর্গ? চিকিৎসাই বা কি? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক, পেডিয়াট্রিক রিউমাটোলজিস্ট, ডক্টর সঞ্জীব মন্ডল।

Juvenile Arthritis in Children: Symptoms, Causes, Expert Treatment

চিত্রঃ সংগৃহীত

অর্পিতা বসু: শিশুদেরও ছাড় নেই। বড়দের মতো শিশুরাও আক্রান্ত হয় আর্থ্রাইটিসে। পরিসংখ্যান বলছে প্রতি ১লক্ষ শিশুর মধ্যে ৫০ জন এই রোগে আক্রান্ত। ছোটদেরও কী বাতের ব্যথা হতে পারে? উত্তরটা হ্যাঁ। ডাক্তারি ভাষায় একে ‘জুভেনাইল আর্থ্রাইটিস’ (Juvenile Arthritis) বলা হয়। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের বাত আর শিশুদের বাতের মধ্যে অনেকটাই পার্থক্য রয়েছে। গত ১২ই অক্টোবর ‘বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবসে’ এবারের থিম ছিল “Achieve your dreams”। কিভাবে বুঝবেন আপনার শিশু জুভেনাইল আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত? কি উপসর্গ? চিকিৎসাই বা কি? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক, পেডিয়াট্রিক রিউমাটোলজিস্ট, ডক্টর সঞ্জীব মন্ডল।

প্রশ্ন : আমরা সাধারণত বড়দের ক্ষেত্রে আর্থ্রাইটিসের সমস্যার কথা শুনে থাকি, বাচ্চাদেরও কি বাতের ব্যথা হয়?

উত্তর : শুধুমাত্র বড়দের নয়। বাচ্চারাও আক্রান্ত হতে পারে এই রোগে। দুটি অস্থির সংযোগস্থলের সাইনোভিয়াল ফ্লুইডের প্রদাহ জনিত কারণে গাঁটগুলি ফুলে যায় এবং ব্যথা হয়। কিছু সীমিত জীনগত কারণ ছাড়া ক্ষয়জনিত বাত শিশুদের মধ্যে বিরল।

প্রশ্ন : শিশুদের আর্থ্রাইটিস হয় কেন?

উত্তর : শিশুদের নানান‌ কারণে আর্থ্রাইটিস হতে পারে। মূলত এটি অটোইমিউন ডিজ়অর্ডার। অর্থাৎ যখন নিজের শরীরই নিজের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নিজের কোষগুলিই শরীরের সুস্থ কোষগুলিকে প্রভাবিত করে।ইমিউন সিস্টেম কিছু অ্যান্টিবডি (প্রোটিন) তৈরি করে, যা দেহের সুস্থ কোষগুলিকে নষ্ট করতে থাকে। তখন প্রদাহ বাড়ে এবং পেশিতে ও অস্থিসন্ধিতে যন্ত্রণা শুরু হয়। এছাড়াও জিনগত কারণ, শরীরে সংক্রমণের ফলে এবং পরিবেশগত কারণে শিশুদের আর্থ্রাইটিস হতে পারে। কখনো কখনো আবার শিশুদের আর্থ্রাইটিস অন্যান্য অটোইমিউন রোগ যেমন লুপাস, ভাস্কুলিটিস, ডারম্যাটোমায়োসাইটিসের প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে বহিঃপ্রকাশ করে।

প্রশ্ন : বাতের ব্যথা ছাড়া আর কি কি কারণে বাচ্চাদের যন্ত্রণা হতে পারে (Juvenile Arthritis)?

উত্তর : বাতের ব্যথা ছাড়াও শিশুদের বিভিন্ন কারণে যন্ত্রণা হতে পারে, যেমন ‘গ্রোইং পেন’ কোনো আঘাত জনিত কারণ, ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের অভাব, স্ক্যার্ভি, লিউকিমিয়ার কারণেও ব্যথা হতে পারে।

প্রশ্ন : বাচ্চাদের তো ‘গ্রোইং পেন’ হয়, ভিটামিন ডি এর অভাবেও যন্ত্রণা হয়, সেক্ষেত্রে বুঝব কি করে, এটি সাধারণ যন্ত্রণা নাকি বাতের ব্যথা?

উত্তর : শিশুদের বৃদ্ধির সময়ে ‘গ্রোইং পেন’ খুব ভোগায়। এই পেন সাধারণত ৪ থেকে ১২ বছরের শিশুদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এখানে অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয় না ও বিকেলে বা সন্ধ্যের দিকে ব্যথার প্রকোপ বাড়ে। কিন্তু বাতের ক্ষেত্রে ঘুম থেকে ওঠার পর বা দীর্ঘমেয়াদি বিশ্রামের পর জয়েন্টেৎজড়তা ও ব্যাথা হয়। কোনো আঘাত ছাড়া অস্থি সন্ধিতে ব্যথা হলে,সাধারণ চলাফেরা করতে, দৌড়াতে অসুবিধা হলে, পায়ের গাঁটে গাঁটে অসহ্য যন্ত্রণা হলে, ফুলে গেলে অবহেলা করা চলবে না। এছাড়াও জ্বর, র‌্যাশ, চোখের সমস্যা হলে সতর্ক হতে হবে। শিশুর শারীরিক পরীক্ষা এবং কিছু সাধারন রক্ত পরীক্ষায় বাতের কারণ সহজেই নির্ণয় করা যায়।

প্রশ্ন : বড়দের ক্ষেত্রে ইউরিক অ্যাসিড জনিত গাউট হয় , বাচ্চাদেরও কি সেই একই সমস্যা হতে পারে?

উত্তর : না, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয় না। তবে কোনো বাচ্চার রক্তে উচ্চ মাত্রায় ইউরিক অ্যাসিড ও সঙ্গে গাঁটে ব্যাথার সমস্যা হলে লিউকিমিয়ার সম্ভবনা থেকে যায়।

প্রশ্ন : বাচ্চাদের পুষ্টি জনিত সমস্যার সাথে এই রোগের কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে (Juvenile Arthritis)?

উত্তর : বাচ্চাদের খাদ্যভাসের সাথে আর্থ্রাইটিসের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও বাতের জন্য ব্যবহৃত ওষুধে শিশুর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তাই সময়মতো পুষ্টিকর সুষম খাবার খাওয়ান। এতে সংক্রমণের বিপদ এড়ানো যায়। নিয়মিত টিকাকরণ ও নিয়ন্ত্রিত শারীরিক ওজন বাতের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে ও অনুসঙ্গিক সমস্যার সহজ সমাধানে উপযোগী।

প্রশ্ন : চিকিৎসার মাধ্যমে বাচ্চাদের আর্থ্রাইটিস কি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব?

উত্তর : আর্থ্রাইটিস সম্পূর্ণ নিরাময় না হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বর্তমানে ‘অত্যাধুনিক ডিজিজ মোডিফায়িং ইমিউনেমোডুলেটর ও টার্গেটেড বায়োলজিক থেরাপির’ সাহায্যে এই আক্রান্ত বাচ্চারা আরো পাঁচটা নরমাল বাচ্চার মতো স্কুল ,কলেজ যায়, বড়ো হয়। অযথা ব্যাথার ওষুধ ও স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দেবেন না।তবে শুধুমাত্র ওষুধ নয়, তার সঙ্গে প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি, নিয়মিত শরীর চর্চা, যোগ ব্যায়াম, সাঁতার কাটা ,সাইক্লিং ,স্কিপিং যা অস্থি, গাঁট ও পেশিকে সুস্থ ও সচল রাখতে সাহায্য করে।

প্রশ্ন : সঠিক সময় রোগ নির্ণয় না হলে কি কি জটিলতা আসতে পারে?

উত্তর : অনেক সময় দেরিতে চিকিৎসা শুরু হলে রোগ নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লেগে যায়। জয়েন্টের কার্টিলেজের ক্ষয় হতে থাকে। চিকিৎসা শুরু না করলে এই ক্ষয় বাড়তে থাকে, যা স্থায়ীভাবে জয়েন্টকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। চলাফেরায় সমস্যা হয় , ব্যাথা বাড়তে থাকে। এছাড়াও শারীরিক প্রদাহজনিত কারণে ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, কিডনি, রক্তনালী ও চোখের সমস্যা হতে পারে। নিয়মিত চোখের পরীক্ষা জরুরি। অজানা লুকিয়ে থাকা উভেইটিসের কারণে চোখের দৃষ্টিশক্তি ও যেতে পারে চিরতরে।

প্রশ্ন : বাবা মায়ের কখন সাবধান হওয়া উচিত?

উত্তর : ছোটো বেলাতেও বাতের ব্যথা কাবু করতে পারে। তাই কিছু লক্ষণ দেখলে প্রথম থেকেই সতর্ক হন।
১) দীর্ঘমেয়াদি বিশ্রামের পর অস্থিসন্ধির জড়তা ও ব্যাথা।
২)গাঁটে গাঁটে অসহ্য ব্যথা, গাঁটে ফুলে থাকা, লাল হয়ে থাকা গাঁট।
৩)চোখ দিয়ে বার বার জল পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি।
৪) জয়েন্টগুলোতে ফোলাভাব ও ব্যাথার সাথে সাথে অনিয়ন্ত্রিত জ্বর ও শরীর জুড়ে লাল লাল র‌্যাশ।
৫)জয়েন্টে ব্যাথার সাথে সাথে মুখে ঘা, চুল পড়ে যাওয়া, রোদে বেরোলেই চামড়া লাল হয়ে যাওয়া।
৬) গাঁটের সমস্যার সাথে কোমরে ব্যথা, মলের সাথে রক্তপাত।
৭)যদি পরিবারে সোরিয়াসিসের ইতিহাস থাকে, তাহলে সচেতন হওয়া উচিত। এই ধরনের উপসর্গ দেখলে সাবধান হতে হবে।

প্রশ্ন : ফ্যামিলি হিস্ট্রিতে আর্থ্রাইটিস সমস্যা থাকলে কি সচেতন হওয়া উচিত?

উত্তর : পরিবারে আর্থ্রাইটিসের বা যে কোনো অটোইমিউন রোগের ইতিহাস থাকলে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। তাই উপসর্গ দেখা দিলে শুরু থেকেই সচেতন হওয়া উচিত।

প্রশ্ন : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন (Juvenile Arthritis)?

উত্তর : ১) সঠিক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২) রোগ নির্ণয়ের পর নিয়মিত ওষুধ খাওয়ান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া তা বন্ধ করবেন না।
৩) ওষুধ চলাকালীন জ্বর, সর্দি- কাশি হলে বা র‌্যাশ বেরোলে, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৪) বাচ্চার নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান।
৫) যতটা সম্ভব বাইরের খাবারের পরিবর্তে বাচ্চাকে ঘরের তৈরি খাবার দিন।
৬) নিয়মিত যোগব্যায়াম এবং শরীরচর্চা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে।
৭) সংক্রমণ প্রতিরোধে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জেনে নিন শিশুকে কোন কোন টিকা কখন কখন দেওয়া জরুরি।