চিত্র- সংগৃহীত
অর্পিতা বসু: গবেষণায় দেখা গেছে পুরুষদের থেকে মহিলাদের গলব্লাডারে স্টোন হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় এর তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। চর্বিযুক্ত খাবার খেলে হঠাৎই পেটের ডান দিকে বা মাঝখানে তীব্র ব্যথা শুরু হয়।যা অনেকেই গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা মনে করে অবহেলা করেন। কী ধরনের উপসর্গ দেখলে সচেতন হবেন? সার্জারিই কী একমাত্র অপশন? অস্ত্রোপচারের পর কেমন হওয়া উচিত লাইফস্টাইল? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডক্টর জয়জীৎ ভদ্র।

প্রশ্ন : গলব্লাডারে স্টোন কেন হয়?
উত্তর : মূলত তিনটি কারণে গলব্লাডারে স্টোন হয়।
১)পিত্তরসে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।
২)পিত্তরসে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।
৩) পিত্তথলি সঠিকভাবে খালি না হওয়া। প্রথম ক্ষেত্রে অর্থাৎ পিত্তরসে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে তা জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে কঠিন পাথরে পরিণত হয়। ওজন বেশি থাকলে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং
দ্রুত ওজন কমানোর ফলে লিভার গলব্লাডারে অতিরিক্ত কোলেস্ট্রল নিঃসরণ করে যা জমাট বেঁধে পাথরে পরিণত হয়। উচ্চ চর্বিযুক্ত এবং কম ফাইবার যুক্ত খাবার খেলে পাথরের ঝুঁকি তৈরি হয় । ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরে ট্রাই গ্লিসারাইডের পরিমাণ বেশি থাকার কারণে পাথর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, কখনো কখনো লিভার বা রক্ত জনিত রোগ,রেড ব্লাড সেল ডিসঅর্ডার ইত্যাদি কারণে পিত্তরসে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে পাথর তৈরি করে, যেগুলিকে ‘পিগমেন্ট স্টোন’ বলা হয়, যা কালো বা বাদামি রংয়ের হয়। এবং তৃতীয়তঃ পিত্তথলি সঠিকভাবে খালি না হলে পিত্তরস ঘনীভূত হয়ে পাথর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। মূলত অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, skipping of meals , দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, মহিলাদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া গলব্লাডারে স্টোন হওয়ার আরো একটি কারণ।
প্রশ্ন : কাদের হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে?
উত্তর: চিকিৎসা পরিভাষায় আমরা বলে থাকি “4 Fs of gallstone” meaning
Female, Fat ,Fertile and Forty. যার অর্থ মহিলাদের মধ্যে গলব্লাডারে স্টোন হওয়ার অধিক্য পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ, কারণ ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাব। যাঁদের বয়স ৪০ এর বেশি তাঁদের মধ্যে গলব্লাডারে স্টোনের প্রবণতা অনেক বেশি থাকে। মহিলাদের মধ্যে বেশিবার গর্ভধারণ, দীর্ঘ দিন ধরে গর্ভনিরোধক ওষুধ বেশি খেলে বা যাঁরা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি করান, তাঁদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে এবং যেমন আগে বললাম ওবিসিটি, দ্রুত ওজন কমা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস গলব্লাডারে বা পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি কিছু রোগের ক্ষেত্রে যেমন ডায়াবেটিস মেলাইটাস, লিভার ডিসঅর্ডার, crohn’s disease থাকলে তা গলব্লাডারে পাথর হওয়ার একটি কারণ।এখানে উল্লেখ করা দরকার আমেরিকান ইন্ডিয়ান এবং মেক্সিকান আমেরিকানদের মধ্যে গলব্লাডার স্টোনের প্রবণতা সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়।
প্রশ্ন : কোন ধরনের লক্ষণ দেখলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
উত্তর : গলব্লাডারের স্টোনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে আবার কখনো কখনো কোনোরকম উপসর্গ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে রুটিন হেলথ চেক আপের সময় সোনোগ্রাফিতে তা ধরা পড়ে। বারবার এসিডিটি বা অম্বল হওয়া গলব্লাডারে পাথর থাকার একটি সাধারণ লক্ষণ হতে পারে। কিছু খাবার খেলেই হজমের সমস্যা, পেট ফাঁপা,
মাংস বা তেল-মশলাদার খাবার খেলেই পেটে তীব্র যন্ত্রণা হওয়া সঙ্গে বমি হওয়া বা বমি বমি ভাব, পেটের ডান দিক থেকে ব্যথা শুরু হয়ে ডান কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছনো ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ব্লাডারে পাথর জমলে অনেকেই জন্ডিসে আক্রান্ত হন, তাই জন্ডিস হলেও সতর্ক থাকতে হবে। এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে অতি অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যান।
প্রশ্ন : রোগ নির্ণয় পর কী কী ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা প্রয়োজন?
উত্তর: পেটে ব্যথা এবং অন্যান্য কিছু লক্ষণ নিয়ে রোগীরা যখন আমাদের কাছে আসেন যেমন বমি বমি ভাব, জ্বর ,জন্ডিস ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে প্রথমেই পেটের উপরের অংশের আল্ট্রাসাউন্ডের পরামর্শ দেওয়া হয়। রিপোর্টে স্টোন ধরা পড়লে কিছু ব্লাড টেস্টের প্রয়োজন হয়, যেমন CBC, liver function test (LFT), অ্যামাইলেজ/লাইপেজ টেস্ট।
প্রশ্ন:এর চিকিৎসা কী ? ওষুধে কী সেরে যায়?
উত্তর: গলব্লাডারের স্টোনের একমাত্র চিকিৎসা হল অস্ত্রোপচার, যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় আমরা বলি Cholecystectomy. যা মূলত দুভাবে করা যায়। ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেক্টমি অথবা key-hole surgery. যে সমস্ত রোগীদের কিছু জটিলতা থাকে সেক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেক্টমি করা না গেলে ওপেন কোলেসিস্টেক্টমি করা হয়। যাঁদের গলব্লাডার স্টোনের ফলে কোনো উপসর্গ থাকে না বা শারীরিক কোনো কারনে যদি তাঁরা সার্জারির ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হন, তখন মেডিকেল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু জানতে হবে মেডিকেল ম্যানেজমেন্টের কিছু লিমিটেশন থাকে। চিকিৎসা পদ্ধতিও দীর্ঘমেয়াদি হয়, অনেক সময় লেগে যায় । কিছু ওষুধ আছে যা খুব ছোট আকারের cholesterol based stone dissolve করতে পারে, ব্যথা কমানোর ওষুধ দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস। এক্ষেত্রে সেরে যাওয়ার পর স্টোনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রশ্ন: কখন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়?
উত্তর : গলব্লাডারের স্টোন ধরা পড়ার পর আমরা রোগীদের অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়ে থাকি। অনেক ক্ষেত্রে সেই মুহূর্তে কোনো কারনে রোগী যদি অস্ত্রোপচার করতে না চান তখন নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। তা সত্ত্বেও যদি দেখা যায় রোগী কিছু খেতে পারছেন না, অসহ্য পেটে যন্ত্রণা এবং বমি বমি ভাব এইসব উপসর্গ চলতেই থাকে, তখন দ্রুততার সাথে সার্জারির প্রয়োজন হয়।
প্রশ্ন : গলব্লাডার বাদ গেলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে? এবং সে ক্ষেত্রে লাইফটাইল কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর : গলব্লাডারে স্টোন অপারেশনের পর সাধারণত পেট ফাঁপা, বদহজম বা চর্বিযুক্ত খাবার হজমে সমস্যা, ডায়রিয়া
হতে পারে। তবে এই সমস্ত উপসর্গ সবই সাময়িক ধীরে ধীরে তা ঠিক হয়ে যায়। সার্জারির পর
৩-৪ সপ্তাহ চর্বিযুক্ত, ভাজাভুজি ও অতিরিক্ত তেল-মশলাদার খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অল্প অল্প করে বারবার (small, frequent meals) খাওয়া উচিত।ডায়েটে ফ্যাটের পরিমাণ কম এবং ফাইবারের পরিমাণ বেশি রাখুন এবং প্রচুর জল পান করুন।
প্রশ্ন : সেরে যাওয়ার পর আবারও কী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?
উত্তর : অপারেশনের পর আবারও স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
প্রশ্ন : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?
উত্তর: সবশেষে এটাই বলতে চাইব গলব্লাডারে স্টোন কোনো মারণ রোগ নয়। যদি বারবার পেটে ব্যথা এবং তার সঙ্গে জ্বর,গা বমি ভাব থাকে বা জন্ডিসের উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে কোনোভাবেই অবহেলা করবেন না।যে বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার,
১)আচমকা ওজন বেড়ে যাওয়া বা দ্রুত ওজন কমানোর ফলে কখনও কখনও পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং নিয়মিত শরীর চর্চা করুন।
২)দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকবেন না।নিয়মিত বিরতিতে খাবার খান। এতে পিত্তরসের সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে ।
৩)অতিরিক্ত ফ্যাট জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন। ফ্যাট ছাড়া প্রোটিন, ফাইবার যুক্ত খাবার, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ডায়েটে রাখুন।
৪)দীর্ঘদিন ধরে গলস্টোনের সমস্যা ফেলে না রেখে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যাতে শুরুতেই চিকিৎসা শুরু করা যায় এবং অস্ত্রোপচারের পর রোগী আবারও সুস্থ জীবন যাপন করতে পারেন।