চিত্র: সংগৃহীত
অর্পিতা বসু: মাত্র দু-তিন দিনের জ্বর, সুস্থ হয়ে উঠলেও কাটছে না দুর্বলতা (Fever Treatment)। কেন গ্রাস করছে দুর্বলতা? জ্বর হলে ঠিক কোন সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন? সব প্রশ্নের উত্তর জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডক্টর আশীষ রায়।

প্রশ্ন : শরীরের তাপমাত্রা কত হলে আমরা বলতে পারি জ্বর হয়েছে?
উত্তর : ডাক্তারি মতে আমাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। ৯৯ ডিগ্রী ফারেনহাইট থেকে ধরা হয় জ্বর হয়েছে। তবে আমাদের বগলের নিচের তাপমাত্রা মুখের ভেতরের তাপমাত্রা থেকে এক ডিগ্রি ফারেনহাইট কম থাকে। তাই মুখের ভিতরের তাপমাত্রা যদি ৯৯° ফারেনহাইট হয়, তখন বগলের নিচের তাপমাত্রা হবে এক ডিগ্রি ফারেনহাইট কম।
[আরও পড়ুন: Stabbing at Dakshineswar: মেট্রো স্টেশনে প্রকাশ্যে খুন! দক্ষিণেশ্বরে বন্ধুর ছুরির আঘাতে মৃত্যু স্কুলছাত্রের]
প্রশ্ন : জ্বর হয় কেন?
উত্তর : জ্বর কোনো রোগ নয়, এটি শরীরে কোনো সংক্রমণ বা অসুস্থতার একটি লক্ষণ,একটি উপসর্গ যেখানে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেড়ে যায়। নানান কারণে জ্বর হতে পারে। জ্বরের সবচেয়ে সাধারণ কারণ ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণ। ক্যান্সার বা অটোইমিউন রোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতাও শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে জ্বর হতে পারে। অনেক সময় কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থেকেও জ্বর হতে পারে। এছাড়াও হিট স্ট্রোকের কারণেও জ্বর হতে পারে (Fever Treatment)।
প্রশ্ন : হাই গ্রেড ফিভারের ক্ষেত্রে কি কি জটিলতা হতে পারে ?
উত্তর : হাইগ্রেড ফিভারে অনেক সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।যার মধ্যে রয়েছে ডিহাইড্রেশন, খিঁচুনি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, এমনকি মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে। হাই গ্রেড ফিভার আবার বিভিন্ন রোগের লক্ষণও হতে পারে। যেমন ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, বা নিউমোনিয়া। তাই জ্বর হলে, বিশেষ করে যদি টেম্পারেচার বেশি থাকে এবং সাথে অন্যান্য উপসর্গ থাকে তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন : ভাইরাল জ্বরের লক্ষণ কি?
উত্তর : সাধারণত যে লক্ষণ গুলি দেখা যায় তা হল,
১) টেম্পারেচার বেশি থাকে।
২) জ্বরের সাথে সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা হতে পারে, কাঁপুনি হতে পারে।
৩) গায়ে ব্যথা হয়, অনেকের পেটে ব্যথা হয়, প্রচন্ড দুর্বলতা থাকে।
৪) অনেকের গায়ে র্যাশ
দেখা যেতে পারে, চোখ লাল হতে পারে।
৫) পাতলা পায়খানা হতে পারে, গা বমি ভাব হতে পারে বা খিদে কমে যেতে পারে।
প্রশ্ন : জ্বর হলে কি সাথে সাথে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন ?
উত্তর : জ্বর হলে অনেকেই তেমন গুরুত্ব দেন না। নিজেরাই ওষুধ খেয়ে নেন। এর ফল হতে পারে মারাত্মক। যদি শুধুমাত্র জ্বর হয় তার সাথে অন্য কোনো উপসর্গ না থাকে, তাহলে তিনদিন পর্যন্ত দেখা যেতে পারে। কিন্তু জ্বরের সাথে যদি অন্য উপসর্গ থাকে, যেমন মাথা ব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, গা হাত পা যন্ত্রণা, জয়েন্ট পেন তাহলে দুদিনের বেশি জ্বর থাকলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এবং “flu like illness” এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ তিন দিনের বেশি জ্বর থাকলে অবশ্যই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন (Fever Treatment)।
প্রশ্ন : সব জ্বরেই কি প্যারাসিটামল দেওয়া যায় ?
উত্তর : হ্যাঁ দেওয়া যায়।প্যারাসিটামল একটি নিরাপদ ওষুধ হলেও তা খেতে হবে নির্দিষ্ট মাত্রায়। সেই মাত্রার বেশি হলে শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
প্রশ্ন : অনেক সময় আমরা শুনে থাকি টেম্পারেচার বেশি হয়ে গেলে মাথা ধুয়ে দেওয়া উচিত বা স্নান করিয়ে দেওয়া উচিত, এতে কতটা উপকার হয় ?
উত্তর : টেম্পারেচার বেশি হয়ে গেলে কপালে জলপট্টি দেওয়া যেতে পারে। জল দিয়ে মাথা ধুয়ে দিতেও পারেন। এতে দেহের তাপমাত্রা দ্রুত গতিতে কমে, ফলে স্বস্তি মেলে। তবে জ্বরের সাথে যদি অন্য কোনো উপসর্গ থাকে, তাহলে এই পদ্ধতিতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেই হবে (Fever Treatment)।
প্রশ্ন। : জ্বর হলে অনেকেরই খাওয়ার ইচ্ছেটা একদমই চলে যায় ,সেই সময় ডায়েট কি রকম হওয়া উচিত?
উত্তর: জ্বর হলে শরীরে বেশি তরল পদার্থের দরকার হয়। এই সময় বেশি করে তরল খাবার খাওয়া দরকার। যেমন ডাবের জল, ফলের রস, স্যুপ এবং অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণে জল। ডায়েটে সহজ পাচ্য প্রোটিন জাতীয় খাবার দেওয়া উচিত। তার সাথে একটি করে মরসুমী ফল।
প্রশ্ন : আপনারা বলেন জ্বর হলে বেশি জল পান করা উচিত। সেই পরিমাণ কতটা?
উত্তর : জ্বরের সময় শরীর খুব গরম হয়ে যায়। এর পাশাপাশি বমি, পায়খানা ও অত্যধিক ঘামের জন্য শরীর থেকে জল বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে ডিহাইড্রেশন হওয়ার আশঙ্কা থাকে । কতটা জল পান করতে হবে তা অনেকগুলো প্যারামিটারের উপর নির্ভর করে, তবে সহজ হিসেবে বললে, সাধারণ সময় আপনি যতটা জল পান করেন ,জ্বরের সময় তার থেকে অন্তত ৫০ শতাংশ বেশি জল পান করা উচিত (Fever Treatment)।
প্রশ্ন : ভাইরাল ইনফেকশনে যেহেতু বডি ইমিউনিটি অনেকটাই কমে যায়, তা ফিরে আসতে কতটা সময় লাগে ? কারণ দেখা যাচ্ছে ভাইরাল ফিভার কমে যাওয়ার পরেও দুর্বলতা অনেকদিন থাকছে?
উত্তর : ভাইরাল ফিভার ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে সেরে যাচ্ছে। কিন্তু তার পরও দুর্বলতা কাটছে না। অনেক সময় এই সমস্যা ১ মাসের বেশি সময় ধরে ভোগাচ্ছে। ভাইরাল ফিভারে শরীরে একাধিক অঙ্গের ওপর প্রভাব পড়ে। এই সময় খিদে চলে যায়, খাবার ঠিক ভাবে হজম হয় না, ফলে দুর্বল লাগে। এছাড়া ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য শরীর থেকে প্রচুর শক্তি খরচ হয়, শরীর ক্যাটাবোলিজম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সেই কারণেও দুর্বলতা কাটতে বেশ খানিকটা সময় লাগে।
প্রশ্ন : সব শেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন?
উত্তর: ওভার দা কাউন্টার ওষুধ খাবার প্রবণতা অনেকেরই রয়েছে। অনেক সময় আমরা দেখি জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়াও অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে থাকেন যা একেবারেই উচিত নয়। জ্বর, সর্দি, কাশির মতো ভাইরাসজনিত অসুখের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের কোনও ভূমিকা নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রবণতায় অনেক সময় দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে জীবাণু গুলি। ফলে অনেক অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে সঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। অর্থাৎ হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা। বাইরের খাবার এই সময়ে এড়িয়ে চলা উচিত। ঠান্ডা লাগার প্রবণতা থাকলে ফ্রিজে জল পান করবেন না, এবং আগেও যেমন জানালাম জ্বরের সাথে যদি কোনরকম উপসর্গ থাকে, সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পর্যাপ্ত তরল জাতীয় খাবার খান, বিশ্রাম নিন এবং প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুমের (Fever Treatment)।