ad
ad

Breaking News

Fatty Liver

আপনার লিভারে ফ্যাট জমছে না তো! কীভাবে বুঝবেন? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক

প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনি যুক্ত খাবারের পরিমাণ কমান। যদি আপনার ফ্যাটি লিভার থাকে তবে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Fatty Liver Causes, Risks and Treatment Explained

চিত্র: সংগৃহীত

অর্পিতা বসু: ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver) কেন হয়? ঝুঁকি কমাতে কি করনীয়? ফ্যাটি লিভার কি সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব? যকৃত কি আবার আগের অবস্থায় ফিরতে পারে? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক কনসালট্যান্ট হেপাটোলজিস্ট ডা. সৌরীন মুখার্জ্জী।

প্রশ্ন : ফ্যাটি লিভার কেন হয়?

উত্তর: লিভার আমাদের শরীরের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা তৈরি হয়। লিভার পিত্ত তৈরি করে যা উপস্থিত খারাপ বর্জ পদার্থগুলিকে বের করে দিতে সাহায্য করে। দু ধরনের ফ্যাটি লিভার হতে পারে।অ্যালকোহলযুক্ত ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এবং নন-অ্যালকোহলযুক্ত ফ্যাটি লিভার ডিজিজ। কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এবং অ্যালকোহলের কারণে অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার হতে পারে। এর থেকে অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস এবং সিরোসিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার ডায়াবেটিস এবং ওবিসিটির কারণে নন-অ্যালকোহল যুক্ত ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হতে পারে। যা বহুদিন চিকিৎসা না করালে সিরোসিস হতে পারে ।

প্রশ্ন: ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver) হলে কি কি সমস্যা হতে পারে?

উত্তর: নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিসিজের সাথে কোলেস্ট্রল, উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যা, স্থূলতা এবং ডায়াবেটিস এবং হার্টের সমস্যা হওয়ার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হয় সেক্ষেত্রে ফাইব্রোসিস, সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এবং লিভার ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে ।

প্রশ্ন : ফ্যাটি লিভার আছে তা বোঝার উপায় কি?

উত্তর : ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। যাদের ফ্যাটি লিভারের সমস্যা রয়েছে তারা দৈনিক মদ্যপান করলে জন্ডিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সাথে খিদে কমে যাওয়া ,বমি বমি ভাব, পেটের ডানদিকে ব্যথা এবং অস্বস্তি হতে পারে, ক্লান্ত লাগতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেই এই সমস্যা বুঝে উঠতে পারেন না , অনেক সময়ই পরীক্ষার মাধ্যমে তা ধরা পড়ে।

প্রশ্ন : ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver) থেকে কি লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?

উত্তর : ফ্যাটি লিভার থেকে লিভারের ক্ষতি হতে পারে, কারণ লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে লিভারের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ২০ শতাংশের ফাইব্রোসিস, সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এবং লিভার ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে । তাই সঠিক সময় চিকিৎসা শুরু হওয়া প্রয়োজন।

প্রশ্ন: অ্যালকোহল লিভারের ঠিক কতটা ক্ষতি করে?

উত্তর : দৈনিক অতিরিক্ত মদ্যপান করলে ফ্যাটি লিভার, অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস ও লিভার সিরোসিস হতে পারে।লিভার রক্তে অবস্থিত অ্যালকোহল দূর করে। রক্ত পরিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। কাজেই অতিরিক্ত মদ্যপান করলে লিভারের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। লিভারের কার্যক্ষমতার বেশি মদ্যপান করলে লিভারের কোষগুলির মারাত্মক ক্ষতি হয়।

প্রশ্ন: কতটুকু মদ্যপান করলে লিভারের ক্ষতি ততটা হয় না?

উত্তর : বয়স, ওজন ও লিঙ্গর মতো একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে মদ্যপানের পরিমাণ ।
নারীদেহে অ্যালকোহল জনিত প্রভাব পুরুষদের তুলনায় বেশি হয়। ফলে সমপরিমাণ অ্যালকোহল পান করলে, নারীদের লিভার পুরুষদের থেকে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ১ স্ট্যান্ডার্ড ড্রিঙ্কের পরিমাপ হল মোটামুটি হুইস্কি ৪০ মিলিলিটার, বিয়ার ৩০০ মিলিলিটার। যারা অ্যালকোহল পান করেন, তাঁদের জন্য মহিলাদের দিনে ১টির বেশি এবং পুরুষদের ২টির বেশি ড্রিংক পান করা উচিত নয়। তবে মাথায় রাখতে হবে লিভারের কোনো সমস্যা থাকলে অবিলম্বে মদ্যপান বন্ধ করা উচিত। ডায়াবেটিস এবং হার্টের সমস্যা থাকলে মদ্যপান ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন চারটির বেশি ড্রিংক পান করলে এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে দুটির বেশি ড্রিংক পান করলে, ভবিষ্যতে প্রায় নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দেখা দেয় এবং কুড়ি শতাংশ ক্ষেত্রে লিভার ফাইব্রোসিস ও সিরোসিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রশ্ন : ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver) থেকে কি সিরোসিস অফ লিভার হতে পারে?

উত্তর : অনেকদিন ফ্যাটি লিভার ডিজিজের চিকিৎসা না হলে তা ফাইব্রোসিসে পৌঁছে যায়। এই পরিস্থিতিতে হতে পারে সিরোসিস। তবে নন অ্যালকোহোলিকের তুলনায়, অ্যালকোহোলিক ফ্যাটি লিভার বেশি সমস্যার কারণ। এর থেকে সিরোসিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

প্রশ্ন: অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারে কি সমস্যা হয়?

উত্তর : -অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের ফলে লিভারে চর্বি জমে, যা প্রথমে তেমন কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করলেও পরে হেপাটাইটিস এবং সিরোসিস হতে পারে। এর ফলে ক্লান্তি, খিদে না হওয়া, ওজন কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে এবং মারাত্মক পর্যায়ে গেলে লিভারের কার্যকারিতা হ্রাস পায়।

প্রশ্ন: নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার কেন হয় এবং কি কি লক্ষণ থাকে?

উত্তর : পরিসংখ্যান বলছে আমাদের দেশে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার (NAFLD) মূলত অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপের কারণে হয়। সাধারণত খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট, তেল ও ফ্যাট জাতীয় উপাদানের মাত্রা বেড়ে গেলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে, তবে পরবর্তীতে ক্লান্তি, পেটের উপরের ডানদিকে ব্যথা, ওজন হ্রাস এবং খিদে কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যারা এই ডিজিজে আক্রান্ত, ভবিষ্যতে তাঁদের মধ্যে মাত্র দশ শতাংশের ফাইব্রোসিস বা সিরোসিসের সম্ভবনা থাকে।কিন্তু তাঁদের হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের আশঙ্কা বেশি থাকে, যা সত্যিই অ্যালার্মিং।

প্রশ্ন : ফ্যাটি লিভারের (Fatty Liver) সমস্যার চিকিৎসা কি?

উত্তর : ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসার প্রধান উপায় জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনা, যেমন স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ওজন কমানো। অ্যালকোহলজনিত ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে, অ্যালকোহল সেবন বন্ধ করতে হবে। তার সাথে প্রয়োজন সঠিক ডায়েটে‌র। এবং সঠিক সময় চিকিৎসা শুরু করা উচিত। অ্যালকোহলিক এবং নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে চিকিৎসা সম্পূর্ণ আলাদা।

প্রশ্ন: ফ্যাটি লিভারের সমস্যার কি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব?

উত্তর : হ্যাঁ সম্ভব, যদি না ফাইব্রোসিস বা সিরোসিসের সমস্যা থাকে। সেক্ষেত্রে অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে মদ্যপান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সঠিক ডায়েট, নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে এবং সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার দ্বারা সম্পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভব।

প্রশ্ন : কি ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে
লিভারে কোনও সমস্যা রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা সম্ভব?

উত্তর : লিভার ফাংশন টেস্ট (এলএফটি), অল্ট্রাসনোগ্রাফি বা ফাইব্রোস্ক্যান ইত্যাদির মাধ্যমে লিভারের সমস্যা নির্ধারণ করা সম্ভব।

প্রশ্ন : ডায়েট কি রকম হওয়া উচিত?

উত্তর : যে কোনও কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ বাড়ে। তা‌ লিভারে গিয়ে জমে। ফলে দেখা দেয় ফ্যাটি লিভার ডিজিজ।
এড়িয়ে চলুন অত্যধিক তেল মশলা সমৃদ্ধ খাবার এবং ফাস্টফুড। খাদ্য তালিকায় রাখুন শাকসবজি,বেরি, আঙ্গুর, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত ফল, ওটস, ব্রাউন রাইস, বার্লি এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার।

প্রশ্ন : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন?

উত্তর : ফ্যাটি লিভার থেকে সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন। সবুজ শাকসবজি, ফল, এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খান। ফ্যাটি মাছ রাখুন খাদ্য তালিকায়। প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনি যুক্ত খাবারের পরিমাণ কমান। যদি আপনার ফ্যাটি লিভার থাকে তবে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত (Fatty Liver)।