চিত্র- সংগৃহীত
অর্পিতা বসু: শুধুমাত্র শোনা নয়, দেহের ভারসাম্য রক্ষাতেও কানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কান নিয়ে আমাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। দীর্ঘ সময় ইয়ারফোন ব্যবহারের ফলে কানের মারাত্মক ক্ষতি হয়। কতক্ষণ আমরা ইয়ারফোন ব্যবহার করছি, সেটাই আসল কথা অর্থাৎ ডিউরেশন। সেটা লো, মিডিয়াম, হাই যে ভলিউমই হোক না কেন। চিকিৎসকরা বলছেন ধীরে ধীরে স্থায়ীভাবে শ্রবণ শক্তি নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণই হল দীর্ঘসময় ইয়ারফোন ব্যবহার করা। কানের সংক্রমণ, শ্রবণশক্তি হাস ও কানের সমস্যা গুলি কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়, শিশুদের কানের সমস্যার ক্ষেত্রে কী করনীয়? কিভাবে নজর রাখা যায় কানের স্বাস্থ্যের? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক, সিনিয়র ইএনটি স্পেশালিস্ট, ডক্টর জয়ন্ত নারায়ণ চৌধুরী।

প্রশ্ন: কী কী কারনে কানে ইনফেকশন হতে পারে?
উত্তর: কানকে আমরা সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করি। বহি: কর্ন, মধ্য কর্ন ও অন্ত কর্ণ। অন্ত কর্ণ থেকে কানে ব্যথা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। প্রধানতঃ বহি: কর্ন ও মধ্য কর্ন থেকেই ব্যাথার উৎপত্তি হয়।
বহি: কর্নের দুটি জায়গা এক কানের পাতা, দুই কানে সুরঙ্গ থেকে ব্যাথার উৎপত্তি হতে পারে। এই দুই জায়গায় কোনো ফাংগাল ইনফেকশন হলে বা আঘাত লাগলেও কানে ব্যথা হতে পারে। কানের সুরঙ্গে যদি কোনো ফোঁড়া বা টিউমার হয়,কান খোঁচানো হয় বা নোংরা জমেও ব্যথা হতে পারে। মধ্য কর্ণের সাথে একটা সরু নালি দিয়ে নাকের পেছনে যোগাযোগ থাকে, যাকে আমরা ইউস্টেশিয়ান টিউব বলি। যার প্রধান কাজ হচ্ছে বাইরের বাতাস ও কানের মধ্যে বাতাসের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে আমাদের শুনতে সুবিধা হয়। মধ্য কর্ণের ইনফেকশন যেটা বেশিরভাগ সময় সর্দি-কাশি থেকেই হয়,যা এই নালী দিয়েই যায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে কানের পর্দা ফেটেও যেতে পারে,এরকম ক্ষেত্রে কানে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এছাড়াও আরো অনেক কারণেই কানে ব্যথা হতে পারে।
প্রশ্ন : কানে ব্যথা মানেই কী কানের মধ্যে কোনো ইনফেকশন?
উত্তর : না,কানের ভেতরে কোনো ইনফেকশন না হলেও অন্য কারনেও কানে ব্যথা হতে পারে। যাকে আমরা বলি রেফার্ড পেন।যেমন দাঁতের কোন সমস্যা থাকে পোকা হোক, মাড়িতে কোনো ঘা বা ইনফেকশন হোক বা জিভে যদি কোনো টিউমার হয় বা অ্যাকিউট টনসিলাইটিস থেকে কানে ব্যথা হতে পারে। এছাড়াও আমাদের চোয়ালে যে জয়েন্ট অর্থাৎ Temparo Mandibular Joint – এর প্রদাহ থেকেও কানে ব্যথা হতে পারে।
প্রশ্ন : ঠান্ডা লেগে কানে ব্যথা হলে কী করা উচিত?
উত্তর: আগেই বলেছি আমাদের মধ্য কর্ণের সাথে একটি নালীর মাধ্যমে নাকের পিছনে যোগাযোগ আছে। সেখান দিয়েই মধ্য কর্ণে ইনফেকশন প্রবেশ করে, কানে ব্যথার উৎপত্তি হয়। আমাদের সকলের গলার মধ্যে যেমন টনসিল আছে সেই রকম নাকের পেছনে একটা গ্ল্যান্ড আছে, তাকে আমরা অ্যাডিনয়েড বলি। এই গ্ল্যান্ডটি শিশুদের বড় থাকে এবং বয়সের সাথে সাথে সাধারণত এটি আপনা আপনি মিলিয়ে যায়। শিশুদের ইনফেকশনের প্রধান উৎসস্থলই হচ্ছে এই অ্যাডিনয়েড গ্ল্যান্ড। এই গ্ল্যান্ডে ইনফেকশন হলে ওই নালীর মাধ্যমে মধ্য কর্ণে ইনফেকশন প্রবেশ করে তখন প্রচন্ড ব্যথা হয়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে কানের পর্দা ফেটে যেতেও পারে। অনেক সময় প্রয়োজন বোধে গ্ল্যান্ডটি
অপারেশন করতে হতে পারে।
প্রশ্ন : অনেকেই অযথা বা স্নান করার সময় বা কানে কোনো অসুবিধা হলেই তেল দেন এতে কী কোনো ক্ষতি হতে পারে?
উত্তর: কানে তেল দেওয়ার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আমি আমার রোগীদের সব সময় বলি, যে জিনিস ওষুধের দোকানে পাওয়া যায় না,সেটা আর যাই হোক ওষুধ নয়। এটা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার কোনো যুক্তি নেই। আমাদের কানে এমন একটা ব্যবস্থা করা আছে যাতে নোংরা বা অল্প বিস্তর খোল জমলে নিজে থেকেই বের হয়ে যায়, কোনো কিছু করারই দরকার হয় না। বরং কানে তেল দিলে জায়গাটা চ্যাটচ্যাটে হয়ে ময়লা ওখানেই জমে যায়,যা বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। এক কথায় ‘খাল কেটে কুমির আনার’ সমান।
প্রশ্ন : অনেক সময় বাচ্চারা খেলতে খেলতে কানের মধ্যে কিছু ঢুকিয়ে দেয় তখন কী করনীয়?
উত্তর : কখনোই নিজেরা বের করবার চেষ্টা করবেন না।
যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।খুব সহজেই তারা সেটা বের করে দেবেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অজ্ঞান করে বের করারও প্রয়োজন হতে পারে।
প্রশ্ন : বাড, কাঠি বা সেফটিপিন দিয়ে কান খোঁচালে কী কানের কোনো ক্ষতি হতে পারে? কান চুলকালেই বা কী করনীয়?
উত্তর : নিজের আঙুল দিয়ে কান চুলকালে কানের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে নখ থাকলে সেখান থেকে খোঁচা লেগে বা কেটে গিয়ে ইনফেকশন হতে পারে। এছাড়া বাড, কাঠি বা সেফটিপিন দিয়ে কান চুলকালে কানের পর্দা জখম হতে পারে। যার ফলে কানে কম শোনা বা বধিরতা দেখা দিতে পারে।
প্রশ্ন : কিছু রোগী এসে বলেন হঠাৎ করে একটা কানে একদম শুনতে পাচ্ছি না এর গুরুত্ব কতটা?
উত্তর : এটা একটা গুরুতর সমস্যা এবং মেডিক্যাল ইমারজেন্সি। একটাই পরামর্শ যত দ্রুত ইএনটি ডাক্তারবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু না করলে বধিরতা চিরস্থায়ী হতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা করলে কিছুটা উন্নতি অবশ্যই হয়।
প্রশ্ন : কম বয়সীদের মধ্যে কানে শোনার সমস্যা বাড়ছে এর কারণ কি?
উত্তর: হ্যাঁ, বর্তমানে শুধু তরুন প্রজন্ম নয় সকলের মধ্যেই কানে শোনার সমস্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনক ভাবে। প্রধানত: অযথা ও সারাক্ষণ ইয়ারফোন ব্যবহার করা একটা কারণ,এছাড়া উচ্চ আওয়াজ শব্দ যুক্ত পরিবেশের দীর্ঘক্ষন থাকা যেমন ডিজে, যেমন কানের খুবই কাছে ট্রেন বা বাসের ইলেকট্রিক হর্ণ, খেলা বা মারপিটের সময় কানের উপর সজোরে আঘাত লাগা, কান খোঁচানো ইত্যাদি নানান কারণ রয়েছে। এছাড়া কানের সংক্রমণ ও জিনগত সমস্যা এর জন্য দায়ী।
প্রশ্ন : পাঠকের উদ্দেশ্যে কি বলবেন ও কানের ক্ষতি এড়াতে চাইলে কি করা উচিত?
উত্তর: যেমন এর আগেও বললাম,
১)কান কোনো কিছু দিয়ে খোঁচাবেন না বা কাউকে খোঁচাতে দেবেন না।
২) কানে তেল বা বাড়িতে থাকা পুরনো কোনও ঔষধ বা দোকানদারের পরামর্শে কোনও ধরনের কানের ড্রপ ব্যবহার করবেন না।
৩)খুব আওয়াজ যেখানে হচ্ছে যেমন ডিজে চলছে, সেরকম জায়গায় এড়িয়ে চলবেন।
৪)হোলি বা দোল খেলার সময় কেউ যেন পিচকিরি দিয়ে কানের মধ্যে রঙ দিয়ে না দেয় খেয়াল রাখবেন।
৫) নিতান্ত বাধ্য না হলে ইয়ারফোন ব্যবহার করবেন না।
৬)যেসব শিশুরা খুব ঘন ঘন সর্দি কাশিতে ভোগে তাদের অবশ্যই নিয়মিত ইএনটি ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলা উচিত। ৭)স্কুলে স্কুলে অভিজ্ঞ ইএন টি ডাক্তারবাবু দিয়ে যদি একটা স্ক্রিনিং এর ব্যবস্থা থাকে তাহলে সবচেয়ে ভালো হয়।
৮) শিশুরা যদি কানে কম শোনার কথা বলে তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৯) অভিভাবক ও হবু মায়েদের উদ্দেশ্যে বলছি ,এখন প্রায় সব জায়গাতেই খুব অল্প খরচে কোনো কাটাছেড়া ছাড়া বা ব্যথা ছাড়া শিশু জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই দুটি পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে প্রথমদিনেই জানা সম্ভব নবজাতকের কানে শোনার কোনও সমস্যা বা জন্মগত কোনো ত্রুটি আছে কিনা? এই পরীক্ষা দুটির নাম OAE & BERA. যদি জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত এক দুই বছরের মধ্যে পরীক্ষাটি করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।পরীক্ষায় কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে, বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্নভাবে শিশুটিকে কানে শোনানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব। সবশেষে বলি ‘যে বাছা শোনে না, মা বলে সে ডাকে না’।