চিত্রঃ সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: ক্রনিক কিডনি ডিজিজের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান বলছে , প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে যখন কিডনির রোগ ধরা পড়ে, তখন কিডনি প্রায় ৯০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। শুরু থেকে কিডনির সমস্যা নিয়ে সাবধান না হলে ডায়ালিসিস বা কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রয়োজন হতে পারে। তাই কিডনির অসুখের ঝুঁকি সম্পর্কে প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি। জানালেন বিশিষ্ট নেফ্রলজিস্ট ডক্টর অনির্বাণ সেন (Chronic kidney disease)।

প্রশ্ন: প্রাথমিকভাবে কিডনি রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না , সমস্যা যখন ধরা পড়ে তখন অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। কিডনির সমস্যার লক্ষণ প্রকাশ পেতে দেরি হয় কেন?
উত্তর : বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিডনি প্রায় ৮০-৯০% ক্ষতিগ্রস্ত হলে তখন লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়। উপসর্গগুলি প্রাথমিক পর্যায়ে এতই মৃদু হয় যে, কিছু ক্ষেত্রে বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। সচেতনতার অভাবের কারণে অনেকেই এই প্রাথমিক উপসর্গ গুলোকে এড়িয়ে যান।
প্রশ্ন : যখন সমস্যা ধরা পড়ে কি কি লক্ষণ তখন প্রকাশ পায়?
উত্তর : যে লক্ষণ গুলি খেয়াল রাখা উচিত তা হল,
১) দৈনিক মূত্রের পরিমাণ যদি কমে যায় তা হলে বুঝতে হবে কিডনির কোনও সমস্যা হয়েছে। মূত্রের সঙ্গে সাদা ফেনা নির্গত হলে বুঝতে হবে প্রোটিন মিশে রয়েছে, তৎক্ষণাৎ সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
২) পায়ের পাতা, গোড়ালি, হাত,মুখ বা চোখ ফুলে যাওয়া কিডনির সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
৩) দুর্বল এবং ক্লান্ত লাগলে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কারণ কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পেলে দেহে বর্জ্যের পরিমাণ বাড়তে থাকে ফলে ক্লান্তিবোধ হয়।
৪) রক্তচাপ হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেলে সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ কিডনি সঠিক ভাবে কাজ না করলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।
৫) খিদে কমে যাওয়া, হজমের সমস্যা হওয়া, বমি বমি ভাব, ওবিসিটি ,এমনকি অনেক ক্ষেত্রে রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়াও একটা লক্ষণ হতে পারে।
৬) চিন্তা ভাবনায় অর্থাৎ মনে রাখার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হতে পারে।
৭) শ্বাসকষ্ট হতে পারে ,চুলকানি বা ত্বকের সমস্যা হতে পারে (Chronic kidney disease)।
প্রশ্ন : হঠাৎ করে কি কিডনি খারাপ হতে পারে?
উত্তর : কিডনির অসুখকে আপাত ভাবে দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি বা ( AKI) । যা কোনো সংক্রমণ বা কিডনিতে পাথর জমা বা অন্যান্য কারণে হতে পারে। ফলে কিডনি হঠাৎ করে সঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। হঠাৎ কোনো রোগের কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। পেইনকিলার জাতীয় ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে খেলেও বাড়তে পারে বিপদ। ওষুধের ওভার ডোজও হঠাৎ করে সমস্যা তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত র্যাপিডলি প্রগ্রেসিভ রেনাল ফেইলিওর (RPRF)। এর ফলে কিডনির কার্যকারিতা খুব অল্প সময়ের মধ্যে ৫০% বা তার বেশি কমে যায়। এক্ষেত্রে অবিলম্বে চিকিৎসা শুরু না হলে, পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
প্রশ্ন: ক্রনিক কিডনির রোগের প্রধান কারণ কি?
উত্তর : ১)বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ ক্রনিক কিডনি রোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২)কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে খেলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে।
৩)মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) বা অন্যান্য সংক্রমণের কারণে কিডনির সমস্যা হতে পারে।
৪)কিছু ক্ষেত্রে, জন্মগত ত্রুটি বা জিনগত কারণেও কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৫)পলিসিস্টিক কিডনি রোগ (PKD) থেকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনির রোগ (CKD) হতে পারে।
৬) অটোইমিউন ডিজিস যেমন লুপাস নেফ্রাইটিস , ক্রনিক গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস যেমন IgA নেফ্রোলজি, FSGS, স্টেরয়েড রেজিস্ট্যান্ট নেফ্রোটিক সিন্ড্রোমও একটা কারণ।
৭) ওবিসিটি এবং ধূমপান ক্রনিক কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।
প্রশ্ন : কাদের মধ্যে কিডনির সমস্যা বেশি হতে পারে ? এবং ডায়াবেটিস রোগীদের সবারই কি কিডনির সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?
উত্তর : ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রতি তিনজন ডায়াবেটিসের রোগীর মধ্যে একজনের কিডনির সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যারা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যায় ভুগছেন তাঁদের ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যা কিডনি ফেইলিওরের একটা প্রধান কারণ হতে পারে। এছাড়াও ওবিসিটির সমস্যা থাকলে এবং ধূমপান কিডনি ডিজিজের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় (Chronic kidney disease)।
প্রশ্ন: এখন কম বয়সীদের মধ্যেও কিডনির সমস্যা বাড়ছে এর কারণ কি?
উত্তর : যেমন আগেই বললাম
অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওবিসিটি কারণে, কম বয়সীদের মধ্যেও কিডনির সমস্যা বাড়ছে । এছাড়াও অতিরিক্ত তৈলাক্ত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রশ্ন : কিডনির সমস্যা থাকলে শরীরে জলের কতটা প্রয়োজন তা বুঝবো কিভাবে?
উত্তর: কিডনির ক্রনিক অসুখে ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রে জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শরীরে জলের মাত্রা দ্রুত কমতে থাকলে বা জলশূন্যতা হলে কিডনিতে চাপ পড়ে। ফলে রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়ে। কিডনির ক্রনিক সমস্যা বিভিন্ন স্তরের হয়, সেই অনুযায়ী রোগীর শরীরে জলের পরিমাণও নির্দিষ্ট করা হয়। যদি দেখা যায় কোনো কিডনি রোগীর পা ,চোখ, মুখ ফুলে যাচ্ছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তাহলে বুঝতে হবে সে বেশি পরিমাণে জল পান করছে। তখন জলের পরিমাণ কম করা দরকার। যদি কারো ডিহাইড্রেশনের মতো সমস্যা হয়, তাহলে বুঝতে হবে শরীরের জলের পরিমাণ কম হচ্ছে।যা বাড়ানো প্রয়োজন। সাধারণত আমরা বলে থাকি এক থেকে দেড় লিটার পর্যন্ত তরল পদার্থ প্রয়োজন। অর্থাৎ জল, ডাল, দুধ ,ঘোল সবমিলিয়ে এই পরিমান তরল শরীরে দরকার (Chronic kidney disease)।
প্রশ্ন: কিডনি রোগীদের ডায়েট কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর: কিডনি রোগীদের ডায়েটে সোডিয়াম, পটাশিয়াম এবং ফসফরাসের পরিমাণ সীমিত রাখতে হবে। সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণে জল পান করতে হবে। অতিরিক্ত লবণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার, এবং উচ্চ পটাশিয়াম ও ফসফরাস যুক্ত খাবার যেমন – কলা,দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। প্রোটিনের উৎস হিসেবে চর্বিহীন মাছ বা ডিমের সাদা অংশ খাওয়া যেতে পারে এবং সবজি ও ফলমূলের মধ্যে কম পটাশিয়াম যুক্ত খাবার যেমন শসা, মুলো, এবং লাউ খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।
প্রশ্ন : কিডনিতে পাথর জমে কেন? এর চিকিৎসা কি এবং স্বাভাবিক পদ্ধতিতে এই পাথর শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া কি সম্ভব?
উত্তর : সঠিকভাবে জল পান না করলে কিডনিতে পাথর জমার সম্ভাবনা থাকে। পালং শাক, বাঁধাকপি, টমেটো, অ্যানিমাল প্রোটিন, কম ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার এবং অতিরিক্ত ভিটামিন সি যুক্ত খাবার অত্যাধিক পরিমাণে খেলেও স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম , গেঁটে বাত,বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং কিছু অসুখ যেমন
হাইপারক্সালুরিয়া,সিস্টিনুরিয়া, রেনাল টিউবুলার অ্যাসিডোসিস (RTA) কিডনিতে স্টোন হওয়ার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।পাথরের সাইজ ছোট হলে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্ভব । এর সাথে পর্যাপ্ত জল পান করা প্রয়োজন। এতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। পাথরের সাইজ বড় হলে সার্জারির প্রয়োজন।
প্রশ্ন : কোন কোন পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব আমার কিডনি সুস্থ আছে কিনা?
উত্তর : প্রাথমিক ভাবে ক্রনিক কিডনি ডিজিজের তেমন একটা লক্ষণ থাকে না। রোগটা অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পরই লক্ষণ প্রকাশ পায়। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো সিরাম,ক্রিয়েটিনিন, ইউরিন এসিআর (ACR) ছাড়াও বেশ কিছু টেস্ট করার প্রয়োজন পড়ে। এছাড়াও নিয়মিত ব্লাড প্রেসার চেক করান। এই টেস্টগুলি বছরে একবার করলেই কিডনির সমস্যা প্রথমেই ধরা পড়ে, এবং সেই মতো চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। তবে কিডনি অনেকটা খারাপ হয়ে গেলে ওষুধ দিয়ে কিছু করা সম্ভব নয়। তখন ডায়ালিসিসের প্রয়োজনীয়তা পড়ে।
প্রশ্ন: সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন?
উত্তর :১)চেষ্টা করুন ডায়াবেটিস এবং ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
২)অধিকাংশ কম বয়সীরাই এখন ফাস্ট ফুড ও আলট্রাপ্রসেসড ফুড খেতে অভ্যস্ত। এই সব খাবারে থাকে প্রচুর পরিমাণে নুন ও চিনি এছাড়াও নানান ক্ষতিকর উপাদান। ফলে এগুলি খেলে শরীরের নানান ক্ষতির পাশাপাশি কিডনি ফেলিওরের আশঙ্কাও বাড়ে। তাই পুষ্টিকর খাবার খান।
৩)ওবেসিটি বা ওজন বেশি থাকলেও কিডনির উপর তা প্রভাব ফেলে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত শরীর চর্চা করুন।
৪) চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও পেইনকিলের খাবেন না।
৫)প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের মাত্রা ঠিক আছে কিনা জানতে নিয়মিত পরীক্ষা করান।
৫)ডায়াবেটিসের সমস্যা থাকলে বছরে অন্তত একবার কিডনি টেস্ট অবশ্যই করাবেন।
৬) যে লক্ষণগুলির কথা আলোচনা করলাম এই ধরনের কোনো সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।