ad
ad

Breaking News

Childhood Obesity

আপনার শিশু অতিরিক্ত ওজনের শিকার নয় তো? ওবিসিটি নিয়ে সতর্কবার্তা চিকিৎসকের

আপনার শিশুও ওবিসিটিতে আক্রান্ত নয় তো ? কী করনীয়? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর পারমিতা ব্যানার্জি।

Childhood Obesity Prevention: Expert Guide by Doctor

চিত্র: সংগৃহীত

অর্পিতা বসু: বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে ওবিসিটি বা স্থূলতার প্রবণতা, মাত্রাতিরিক্ত ওজন এখন বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা (Childhood Obesity)। ছোট থেকে অতিরিক্ত তেল মশলাদার খাবার, প্যাকেটজাত খাবার, জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাস, এর সাথে কম পরিশ্রম, খেলাধূলা কম করার প্রবণতা শিশুদের মধ্যে ওবিসিটির হার বাড়াচ্ছে। মেদ শুধুমাত্র শরীরের বাইরেই জমে না, লিভারেও ফ্যাট জমে। রক্তে শর্করার পরিমাণও বেড়ে যায়। আপনার শিশুও ওবিসিটিতে আক্রান্ত নয় তো ? কী করনীয়? জানালেন বিশিষ্ট চিকিৎসক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর পারমিতা ব্যানার্জি।

প্রশ্ন: ওবিসিটি বা স্থূলতা রোগ কাকে বলে?

উত্তর: ওবেসিটি বা স্থূলতা হল শরীরে যখন অতিরিক্ত স্নেহ পদার্থ বা চর্বি জাতীয় পদার্থ জমা হয় এবং আমাদের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এর ফলে স্বাস্থ্যের ওপর নানান ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে। এর থেকে শারীরিক এবং মানসিক নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন: শিশুদের বেশি ওজন মানেই কি ওবিসিটির সমস্যা? (Childhood Obesity)

উত্তর: ওজন বেশি মানেই ওবিসিটি নয়। ওবিসিটি বা স্থূলতা বিচার করা হয় (BMI) বা বডি মাস ইনডেক্সের মাধ্যমে। (BMI ) হল একজন ব্যক্তির ভর ( ওজন ) এবং উচ্চতা থেকে প্রাপ্ত একটি মান, যা একটি সাধারণ হিসাবের মাপকাঠি।

শিশুটি ওবিসিটির সমস্যায় ভুগছে কিনা এই বিএমআই-এর মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হয়।বয়স ও উচ্চতার তুলনায় বেশি ওজন হলে তা স্থূলতার পর্যায়ে পড়ার আশঙ্কা। BMI (বডি মাস ইনডেক্স) ২৩-এর বেশি হলে সাধারণত অতিরিক্ত ওজন বলে চিহ্নিত করা হয়। আর ২৭-এর বেশি হলেই তা ওবিসিটি বলে ধরা হয়। দু বছরের কম বয়সী শিশুদের ওজন বেশি কিনা বোঝার জন্য দেখতে হবে উচ্চতা অনুযায়ী তাদের ওজন কত।

প্রশ্ন: একজন শিশুর ওজন কত হওয়া উচিত?

উত্তর: শিশুদের ক্ষেত্রে ওজন বয়স এবং উচ্চতা অনুযায়ী একটি স্বাভাবিক সীমার মধ্যে আছে কিনা তা দেখা হয়। ৫ বছর বয়স পর্যন্ত একটি শিশু সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কিনা, তার অপুষ্টি বা স্থূলতা আছে কি না, তা WHO গ্রোথ চার্টের মাধ্যমে দেখা হয়। ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (IAP) গ্রোথ চার্টের মাধ্যমে দেখা হয়।

প্রশ্ন : শুধুমাত্র জীবন শৈলী আর খাওয়া-দাওয়ার কী শিশুদের মধ্যে ওবিসিটির প্রধান কারণ? (Childhood Obesity)

উত্তর : জীবনশৈলী এবং খাওয়া দাওয়া শিশুদের ওবিসিটির অন্যতম একটি প্রধান কারণ।
১) ৯০ শতাংশের বেশি বাচ্চারা বাড়ির খাবারের পরিবর্তে ভাজাভুজি, মিষ্টি জাতীয় খাবার, বাইরের খাবার বেশি পছন্দ করে।
২) আবার ওবিসিটির সমস্যা বংশগত কারণেও হতে পারে। বাবা বা মায়ের মধ্যে একজন ওবিস হলে শিশুর ৪০ শতাংশ ওবিসিটিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এবং বাবা ও মা উভয়ই ওবিস হলে,শিশুর ৮০ শতাংশ ওবিসিটিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৩) এছাড়াও গর্ভাবস্থায় মায়ের সুগার বা ওজন যদি বেশি বেড়ে যায়, সে ক্ষেত্রেও শিশুর ওবিসিটির সম্ভাবনা থাকে। ৪)ছোটবেলায় দীর্ঘদিন ধরে বোতল ফিডিং ,ওভার ফিডিং, “টডলার ফর্মুলা” ফুডের ব্যবহার করলে এবং একটু বড় বয়সে জাঙ্ক ফুড, প্রসেসড ফুড, নরম পানীয় অতিরিক্ত খেলে, খাবারে নুন বা চিনির পরিমাণ বেশি হলে ওবিসিটির সম্ভাবনা বাড়ে। ৫)বর্তমান সময়ে বাচ্চাদের মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি, খেলাধুলো, শরীর চর্চার প্রতি অনীহা, সঠিক সময় না ঘুমানো, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া ওবিসিটির একটা বড় কারণ।
৬)কোনো শিশু যদি থাইরয়েড বা কোনো হরমোনাল বা জেনেটিক সমস্যায় ভোগে এবং নিউরোলজিক্যাল কোন সমস্যার কারণে তার ওবিসিটির সমস্যা দেখা দিতে পারে ‌।
৭) নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ থেকেও ওজন বাড়তে পারে এবং ওবিসিটির সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন : এর লক্ষণ কী?

উত্তর: প্রধান লক্ষণ হল বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়া। বিশেষ করে পেট, মুখ ও ঘাড়ের চারপাশে মেদ জমে যাওয়া। শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, জয়েন্টে ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, দ্রুত বয়ঃসন্ধি। এছাড়াও নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতে এর থেকে কী কী ধরনের সমস্যা হতে পারে? (Childhood Obesity)

উত্তর : বাচ্চাদের ওবিসিটি থেকে শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা হতে পারে। ভবিষ্যতে টাইপ টু ডায়াবিটিস, পিসিওডি (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম), হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ফ্যাটি লিভারের মতো নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়া এমনকি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এছাড়াও ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপ , মাথা ব্যথা, কোলেস্টেরলের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ঘাড়ে, গলার কাছে, কনুইতে কালচে ছোপ দেখা দেয়, ঘাড়ের কাছে চামড়া কুঁচকে যাওয়া, সেখানে ফুস্কুড়ি, চুলকানির সমস্যাও হয়, যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় ‘অ্যাকান্থোসিস নিগ্রিকানস’ বলা হয়। শুরুতেই যেমন বললাম অতিরিক্ত স্থূলতা শিশুর শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক সমস্যারও কারণ হতে পারে। তাই শুরু থেকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

প্রশ্ন: শিশুদের মধ্যে ওবিসিটিতে আক্রান্ত হওয়ার পরিসংখ্যান সত্যি কথাটা উদ্বেগের?

উত্তর: বর্তমান পরিস্থিতিতে সত্যিই যথেষ্ট উদ্যোগের।পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ৫ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের প্রায় ৪০ শতাংশই ওবিসিটিতে আক্রান্ত। সবথেকে চিন্তার বিষয় গত দু-তিন দশকে এই পরিসংখ্যানটি বেড়েছে প্রায় ২৪ গুন এবং পৃথিবীতে এই সংখ্যাটি প্রায় ১৮ শতাংশ।

প্রশ্ন: এর চিকিৎসা কি? এবং চিকিৎসার দ্বারা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব? (Childhood Obesity)

উত্তর: ওবিসিটির চিকিৎসায় প্রথমেই আমরা ওষুধের ব্যবহার করি না।নজর দেওয়া উচিত জীবন শৈলীর দিকে । ৬ মাসের মধ্যে যদি ওজন নিয়ন্ত্রণে না আসে তখন ওষুধ এবং অন্যান্য মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন বাবা-মায়ের সচেতনতা বাড়ানো। এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো ওবিসিটিতে আক্রান্ত কোনো বাচ্চার ওজন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ৬ মাসের মধ্যে সাত থেকে দশ শতাংশ ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ১ মাসে দেড় কেজির বেশি ওজন যাতে না কমে তা মাথায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে বাবা-মা এবং বাচ্চার কাউন্সিলিংও করা হয়।

প্রশ্ন: শিশুদের ওজন বেড়ে গেলে খাদ্য তালিকা কেমন হওয়া উচিত?

১) প্রথমত আপনার বাচ্চাকে প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস তৈরি করুন।
২)শিশুদের ওজন স্বাস্থ্যকর উপায়ে বাড়াতে খাদ্যতালিকায় ক্যালোরি ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের ভারসাম্য রাখা জরুরি।
৩) টোনড মিল্ক, দই, ডিম, পনির, অ্যাভোকাডো, মাছ বা মুরগির মাংস, শাকসবজি, ফল প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় রাখুন।
৪) মনে রাখবেন অতিরিক্ত মিষ্টি বা প্রসেসড খাবার অস্বাস্থ্যকর।

প্রশ্ন: সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কী বলতে চাইবেন? (Childhood Obesity)

উত্তর : ওবিসিটি হল এমন একটি সমস্যা যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবনশৈলীর উপর নজর রাখা প্রয়োজন। যে অভ্যাস একদম ছোট বয়স থেকে শুরু করা উচিত। বাচ্চারা জন্মের পর ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধেই পুষ্টি পায়। এরপর ২ বছর পর্যন্ত তাকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়ির তৈরি খাবার দেওয়া উচিত। কোনো “টডলার ফর্মুলা” ফুড এড়িয়ে চলাই ভালো। খাবারে যতটা সম্ভব নুন এবং চিনির ব্যবহার না করাই ভালো। ফলের জুসের বদলে গোটা ফল খাওয়ানোর অভ্যাস তৈরি করুন।

জাঙ্ক ফুড (যেমন- ফাস্ট ফুড, চিনিযুক্ত পানীয়, প্রসেসড খাবার) এড়িয়ে চলা উচিত।। এগুলি উচ্চ ক্যালোরি, চর্বি এবং চিনিযুক্ত হওয়ায় স্থূলতা বা ওবিসিটির অন্যতম প্রধান কারণ। আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার বাচ্চাকে কখনোই জোর করে খাওয়াবেন না। বরং নির্দিষ্ট সময় অন্তর তার খাবার অভ্যাস তৈরি করুন। খাবার সময় টিভি বা মোবাইল দেখার অভ্যাস তৈরি করবেন না। দীর্ঘদিন বোতল ফিডিং-এর অভ্যাস তৈরি করবেন না। স্ক্রিন টাইম সীমিত রাখবেন।।নিয়মিত শরীর চর্চা, সাঁতার, দৌড়ানো এবং খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। একই সঙ্গে প্রয়োজন নির্দিষ্ট সময় খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম,যা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ওজন কমাতে কখনোই ভুলভাল ওষুধ খাবেন না এতে সমস্যা আরো বাড়ে। প্রয়োজন হলে দেরি না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।