চিত্র: সংগৃহীত
অর্পিতা বসু: অ্যালার্জি নিয়ে ভয় একটি সাধারণ ঘটনা। জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করতে পারে অ্যালার্জি। আমরা অনেকেই জানিনা অ্যালার্জি কী? কেন হয় (Allergy Causes)? অ্যালার্জি কি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব? জানালেন হোমিওপ্যাথি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শুভ্র ভট্টাচার্য।
[আরও পড়ুন: Sri Lanka: কুশল মেন্ডিসের তাণ্ডব, আফগানিস্তানকে হারিয়ে সুপার ফোরে শ্রীলঙ্কা]
প্রশ্ন: অ্যালার্জি কী?
উত্তর: আমাদের শরীরে বাইরে থেকে যদি কোনো অ্যালার্জেন প্রবেশ করে,শরীর তখন তা গ্রহণ করতে পারে না, তার বিরুদ্ধে শরীর একটা প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলে । ফলে যে লক্ষণ গুলি শরীরে তখন প্রকাশ পায়, তাকেই বলা হয় অ্যালার্জি। আমাদের প্রত্যেকের শরীরে নিজস্ব একটি প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। কোনও কারণে সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে, তার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে অ্যালার্জি দেখা দেয়।
প্রশ্ন : কী কী কারণে অ্যালার্জি হয় (Allergy Causes)?
উত্তর : আমাদের প্রত্যেকের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে, যাকে বলা হয় ইমিউন সিস্টেম। যখন এই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করে না, বা শরীরের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয় এমন সব জিনিসের ওপর যখন প্রতিক্রিয়া দেখায় তখন অ্যালার্জি হয়। বিভিন্ন কারণে অ্যালার্জি হতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম হলো অ্যালার্জেন। সাধারণ অ্যালার্জেনের মধ্যে রয়েছে পরাগ, ধুলো, নির্দিষ্ট কিছু খাবার, পোকামাকড়, পশুর লোম, এবং কিছু ওষুধ। এছাড়াও যদি কারো পারিবারিক ইতিহাস থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বলতা হয় এবং পরিবেশগত পরিবর্তনও অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।
প্রশ্ন : চোখ ,নাক বা ত্বকে অ্যালার্জির লক্ষণ কি? এছাড়াও আর কি কি ধরনের অ্যালার্জি হতে পারে এবং তার লক্ষণ কি (Allergy Causes)?
উত্তর : ১)চোখের অ্যালার্জির ক্ষেত্রে মূলত চোখ চুলকায়, চোখ লাল হয়ে যায়, চোখ থেকে জল পড়ে , কখনো কখনো ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
২)নাকের অ্যালার্জির ক্ষেত্রে নাক ব্লক হয়ে যেতে পারে, কখনো কখনো গলায় সর্দি জমে অস্বস্তি হতে পারে, যা সাধারণত শোওয়ার পর শুরু হয়। হাঁচি, কাশি বা সর্দি হতে পারে। কখনো কখনো মাথায় যন্ত্রণা হতে পারে।
৩)ত্বকের অ্যালার্জি বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এক্ষেত্রে ত্বকের কোথাও চুলকাতে পারে, লাল চাকা চাকা হয়ে ফুলে যেতে পারে। ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। সারা শরীরে ছোট বড় নানা ধরনের র্যাশ হতে পারে, ৪)একজিমার ক্ষেত্রে ত্বক শুষ্ক এবং লাল হয়ে যায়।
৫)বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা থেকে ডাস্ট অ্যালার্জি হতে পারে। ঘাস, ফুল ও বাতাসে মিশে থাকা পোলেন শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে যায়, পশু পাখির লোম, চুল থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে। এবং মোল্ড নামে এক প্রকার ফাঙ্গাস বাতাসে ভাসে যা ডাস্ট অ্যালার্জির অন্যতম কারণ। এর লক্ষণ হল নাক থেকে অনবরত জল পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং চুলকানো , হাঁচি এবং কাশি।
৬)কসমেটিকস থেকে অনেকের অ্যালার্জি হতে পারে। ফলে ত্বকে চুলকানি, লালভাব, ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
অনেকের আবার সূর্যের আলো বা তীব্র আলো থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে। সেক্ষেত্রে ত্বকে লালচে ভাব, চুলকানির মতন সমস্যা দেখা দেয়।
৭) নির্দিষ্ট কোনো খাবার থেকে কারো কারো অ্যালার্জি হতে
পারে। সেক্ষেত্রে ঠোঁট, মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া , বমি বমি ভাব
ডায়রিয়া ও পেটে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রশ্ন : অ্যালার্জির সমস্যা তো যেকোনো বয়সেই হতে পারে কিন্তু কাদের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে?
উত্তর : ছোট থেকে শুরু করে যে কোনো বয়সেই অ্যালার্জি হতে পারে। তবে যাদের পরিবারে অ্যালার্জির ইতিহাস আছে, অ্যাজমা, একজিমা বা অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের মতো রোগ থাকলে, তাদের অ্যালার্জি হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।
প্রশ্ন : অ্যালার্জি কী জেনেটিক (Allergy Causes)?
উত্তর : হ্যাঁ, অ্যালার্জি জেনেটিক বা বংশগত। আপনার যদি অ্যালার্জির পারিবারিক ইতিহাস থাকে, তাহলে আপনার অ্যালার্জি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়াও পরিবেশগত কারণ, যেমন দূষণ বা জীবনযাপনের ধরন, অ্যালার্জিকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রশ্ন : অ্যালার্জি থেকে কী মারাত্মক বিপদ পর্যন্ত হতে পারে?
উত্তর: হাইপারসেনসিটিভিটি থেকে মারাত্মক বিপদ হতে পারে।ব্যক্তিবিশেষে এর ধরন ও প্রতিক্রিয়া আলাদা। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, সালফারযুক্ত ওষুধ, অ্যাসপিরিন থেকে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা পরিভাষায় যা অ্যানাফিল্যাক্সিস বা ‘অ্যালার্জিক শক’ নামে পরিচিত যা থেকে জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত হতে পারে।
প্রশ্ন : কি কারনে বা কিসের থেকে অ্যালার্জি হচ্ছে সেটা বোঝার কি কোনো রকম পরীক্ষা রয়েছে?
উত্তর : অ্যালার্জির উৎস খুঁজে বার করা চিকিৎসকদের কাছে একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হওয়া যায় না, কী থেকে রোগীর অ্যালার্জি হচ্ছে। অ্যালার্জির উৎস নির্ণয় করা গেলে পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করা সহজ হয়। অ্যালার্জির কারণ নির্ণয়ের জন্য সাধারণত যে পরীক্ষাগুলো করা হয় তা হল,
১)স্কিন প্রিক টেস্ট বা SPT
২)রক্ত পরীক্ষা।
৩)ওরাল ফুড চ্যালেঞ্জ টেস্ট।
প্রশ্ন : ওষুধ থেকেও কি কোনো অ্যালার্জি হতে পারে?
উত্তর : ওষুধের অ্যালার্জি থেকে অনেক সময় বিপদজনক উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যা নির্ভর করে অ্যালার্জি এবং আক্রান্ত রোগীর সংবেদনশীলতার উপর। অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথা উপশমকারী এবং চেতনানাশক ওষুধের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এছাড়াও যে কোনও ওষুধেই নির্দিষ্ট রোগীদের মধ্যে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সাধারণত যে উপসর্গগুলি দেখা দেয় তা হল শ্বাসকষ্ট, শরীরের বিভিন্ন অংশে বা সারা শরীর ফোলাভাব, দম বন্ধ হয়ে যাওয়া, র্যাশ ইত্যাদি। তাই এই ধরনের সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রশ্ন : হোমিওপ্যাথিতে অ্যালার্জির চিকিৎসা কি?
উত্তর : হোমিওপ্যাথি বা অ্যালোপ্যাথি যে কোনো ক্ষেত্রেই প্রথমে প্রয়োজন কি থেকে অ্যালার্জি হচ্ছে তা নির্ধারণ করা, এবং তা থেকে বিরত থাকা। হোমিওপ্যাথিতে যেহেতু রোগের চিকিৎসা নয় রোগীর চিকিৎসা করা হয়, তাই সমস্যা অনুযায়ী কোন ওষুধ রোগের জন্য কার্যকর তা নির্ধারণ করা গেলে উপসর্গ এবং লক্ষণ অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে স্পেসিফিক অ্যান্টি অ্যালার্জিক ওষুধ হোমিওপ্যাথিতে নেই। নির্দিষ্ট অ্যালার্জির ক্ষেত্রে প্রত্যেক রোগের জন্য একই ওষুধ যে কার্যকর হবে তা নয়।
প্রশ্ন : অ্যালার্জি কি পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব ?
উত্তর : অ্যালার্জির সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়, তবে উপসর্গ এবং লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী উপশম পাওয়া সম্ভব। ওষুধের ব্যবহার, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা, নির্দিষ্ট অ্যালার্জেন এড়ানোর মাধ্যমে অ্যালার্জির উপসর্গগুলি কমানো সম্ভব।
FB POST: https://www.facebook.com/share/p/1B9Po9NjBN/
প্রশ্ন : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন , যাদের অ্যালার্জির প্রবণতা রয়েছে কিভাবে তারা সাবধানতা অবলম্বন করবেন (Allergy Causes)?
উত্তর : ১)প্রথমত নির্ধারণ করতে হবে কি থেকে অ্যালার্জি হচ্ছে এবং তা থেকে বিরত থাকতে হবে।২)শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখা প্রয়োজন। তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি, ভিটামিন, খনিজ পদার্থের প্রয়োজন। তাই অ্যালার্জির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলতে রোজের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন সি , ভিটামিন ই যুক্ত খাবার রাখুন।
৩) নির্দিষ্ট কোনো খাবার থেকে অ্যালার্জি হলে তা খাওয়া বন্ধ করুন।
৪) অ্যালার্জির সমস্যা হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।