চিত্রঃ সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: আসক্তি বলতে আমরা সাধারণভাবে বুঝি এক ধরণের সাময়িক প্রশান্তি,যার জন্য আমরা বারবার সেই একই জিনিসের দ্বারস্থ হই। এবং একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর আবারও আমাদের ভিতরে সেই জিনিসের চাহিদা তৈরি হয়। সমাজে বহু ধরণের আসক্তি আছে। মনে রাখতে হবে আসক্তি কিন্তু জেনেটিক নয়। এটি পারিপার্শ্বিকতার সমস্যা। কখন একজনকে নেশাগ্রস্ত বলা হয়? এখান থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি? জানালেন বিশিষ্ট সাইকোথেরাপিস্ট ঝিলাম বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রশ্ন: কোন পরিস্থিতিতে একজন নেশাগ্রস্থ বা আসক্ত হয়ে পড়তে পারেন?
উত্তর:যখন একজন ব্যক্তি মাদক, অ্যালকোহল বা কোনো আচরণের যেমন জুয়া, ইন্টারনেটের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও তা চালিয়ে যায়, তখন তাঁকে নেশাগ্রস্ত বা আসক্ত বলা হয়। এটি এক ধরনের নিউরো সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার।
প্রশ্ন: আসক্তি বা অ্যাডিকশন কি রোগ ?
উত্তর: হ্যাঁ,আসক্তি বা অ্যাডিকশন একটি রোগ। আসক্তি মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন এবং কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনে, যা স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণকে ব্যাহত করে।
কোনো কিছু ক্ষতিকর জেনেও তা বন্ধ করতে পারিনা। যেমন মাদক বা অ্যালকোহল ডোপামিন নিঃসরণকে ট্রিগার করে।ডোপামিন আমাদের ভালো বোধ করায় এবং আমরা যা করছি তা করে যেতে চাই। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে চিকিৎসার প্রয়োজন।
প্রশ্ন: কোন কোন জিনিসের উপর আসক্তি তৈরি হতে পারে ?
উত্তর: আমরা দুভাবে বলতে পারি, প্রথমত বিহেভিয়ারাল অ্যাডিকশন বা আচরণগত আসক্তি । এটি হল এক ধরনের বাধ্যতামূলক আচরণ, যেখানে নেতিবাচক ফলাফল থাকা সত্ত্বেও আমরা কোনো নির্দিষ্ট কাজ যেমন, জুয়া খেলা, গেমিং, ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার আমরা বারবার করে থাকি এবং তা নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হই। ফলে তা আমাদের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক ও কাজকে মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে। এই যে ডিজিটাল দুনিয়ার উপর প্রচণ্ড আকর্ষণ , স্মার্টফোনে আসক্ত নতুন প্রজন্ম, সেখান থেকে তৈরি হতে পারে আচরণগত সমস্যা। জীবনে ডিজিটাল দুনিয়ার প্রয়োজন থাকলেও খেয়াল রাখতে হবে তা যেন কখনোই আসক্তিতে পরিণত না হয় এবং জীবনে তার খারাপ প্রভাব না পড়ে ।
দ্বিতীয়তঃ সাবস্টেন্স অ্যাবিউজ।যখন কেউ অতিরিক্ত পরিমাণে কোনো মাদকদ্রব্য যেমন, অ্যালকোহল, ওষুধ, বা অবৈধ মাদক ব্যবহার করে, যার ফলে তাঁর নিজের বা অন্যদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, বা আর্থিক ক্ষতি হয় এবং ব্যবহার কমানোর বা বন্ধ করার চেষ্টা করা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হন।
মাদকের প্রভাব থেকে দূরে থাকলে withdrawal symptoms দেখা দেয় , এবং এক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: এখানে থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি ?
উত্তর: এখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন থেরাপি। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে সাইকো থেরাপিউটিক ইন্টারভেনশন বলা হয়। যা এক ধরনের মানসিক চিকিৎসা। যেখানে আলোচনা ও নির্দিষ্ট কিছু থেরাপি যেমন বিহেভিওরাল থেরাপি, সাইকোডাইনামিক থেরাপির মাধ্যমে রোগীকে মোটিভেশনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করা হয়।
প্রশ্ন: যখন এই ধরনের সমস্যা নিয়ে রোগীরা আপনাদের কাছে আসেন তখন কিভাবে তাদের কাউন্সিলিং করা হয়?
উত্তর: প্রথমেই প্রয়োজন রোগীর চিন্তা স্তরের পরিবর্তন ঘটান। কাউন্সেলিং এর সময় আলোচনার মাধ্যমে জানা দরকার রোগী নিজের ইচ্ছায় এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন নাকি তাঁর পরিবারের লোকজন তাঁকে এই পরিস্থিতি থেকে জোরকরে বার করতে চাইছেন। প্রথম ক্ষেত্রে কাজটি অনেক সহজ হয় কারণ রোগীকে বুঝতে হবে নেশার সেই দ্রব্য তাঁর কাছে থাকলেও সেটি ব্যবহারের কারণে কি ক্ষতি হচ্ছে।মোটিভেশন এনহ্যান্সমেন্ট থেরাপির মাধ্যমে তাঁকে এই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বোঝানো হয়, যাতে ধীরে ধীরে সে নিজে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। এখানে ওষুধের প্রয়োগ নূন্যতম। ওষুধের প্রয়োজন তখনই পরে যখন হঠাৎ করে নেশা জাতীয় দ্রব্য বন্ধ করার পর যদি withdrawal symptom দেখা দেয় এবং শারীরিক সমস্যা হয়।।
প্রশ্ন: সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্য কি বলতে চাইবেন?
উত্তর : দরকার সচেতনতা।স্মার্টফোন, কম্পিউটার, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস থেকে আসক্তি কমাতে প্রয়োজন ডিজিটাল ডিটক্স । অর্থাৎ প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে নেশা জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে বুঝতে হবে। যদি বোঝেন কোনো নেশাজাত দ্রব্যের উপর আপনার আসক্তি বাড়ছে, প্রথমে চেষ্টা করতে হবে সেই জায়গা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। এবং প্রয়োজনে দেরি না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।