চিত্র: সংগৃহীত
সৃজিতা মল্লিক: প্রাচীন কলকাতার অলিগলি জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা ঐতিহ্যের গল্প। তার মধ্যেই এক অনন্য অধ্যায় পাথুরিয়াঘাটার মল্লিকবাড়ির মা সিংহবাহিনী পুজো। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো এই পুজো আজও ঐতিহ্যের প্রতীক। বৈদ্যনাথ দে মল্লিকের হাত ধরেই সূচনা হয়েছিল এই পুজোর।পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১৬১৪ সালের দিকে বৈদ্যনাথ মল্লিক স্বপ্নাদেশ পান দেবী সিংহবাহিনীর কাছ থেকে (Kolkata)।
[আরও পড়ুন: সপ্তাহজুড়ে শুষ্ক আবহাওয়া, উইকেন্ডে দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গে বৃষ্টি? উপকূলে বাড়ছে সতর্কতা]
স্বপ্নে দেবী নির্দেশ দেন, চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের এক গুহা থেকে তাঁর মূর্তি নিয়ে এসে পুজো করার জন্য। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী বৈদ্যনাথ মল্লিক গুহায় গিয়ে দেবীর অষ্টধাতুময় মূর্তি আনতে যান । আর তখনই বাধ সাধলেন দেবীমূর্তি, পুজা ও পরিচর্যা করা এক মুনি।মুনি কিছুতেই রাজি হলেন না। তখন বৈদ্যনাথও গুহার মুখে বসে থাকেন। এরপর ওই দিন রাতেই দেবী স্বয়ং গুহায় থাকা সেই মুনিকে স্বপ্নাদেশে জানালেন, তাঁর ইচ্ছার কথা। শেষমেশ সেই আদেশেই কাজ হয়। এবং সিংহবাহিনী দে মল্লিক বাড়িতে আসেন এবং পুজো শুরু হয়।
প্রায় দেড় ফুট উচ্চতার দেবী মূর্তিটি চতুর্ভুজা, হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ। সিংহের ওপর আরোহিতা দেবীর পায়ের কাছে হাতির কাটা মুণ্ড । মহিষাসুর, হাতির বেশে আক্রমণ করলে দেবী যখন তার শিরশ্ছেদ করেন, এই মূর্তি সেই গল্পই বলে। আর মায়ের শাড়ি সোনার। মাথায় মুকুট পরে রয়েছেন। এই মূর্তির ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে । জানা যায়, দেবী সিংহবাহিনী ছিলেন রাজা হর্ষবর্ধনের পুষ্যভূতি বংশের কুলদেবী। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’ এবং বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’-এ এই দেবীমূর্তির উল্লেখও পাওয়া যায়। রাজা মানসিংহ দেবীমূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজস্থানে কুলদেবী রূপে (Kolkata)।
মুঘল আক্রমণের সময় এক পুরোহিত দেবীমূর্তিকে চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকেই পরে বৈদ্যনাথ মল্লিক দেবীকে কলকাতায় আনেন। প্রথমে হুগলির সপ্তগ্রামে প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে পাঁঠা বলি সহযোগে পুজো শুরু হয়। পরে পরিবার কলকাতায় চলে এলে পাথুরিয়াঘাটার বাড়িতেই স্থায়ীভাবে এই পুজোর প্রচলন হয়। বিশ্বাস করা হয়, দেবী সিংহবাহিনী নিজেই এই পরিবারে এসেছেন নিজের ইচ্ছায়। মল্লিকবাড়ির পূজোয় এখনও পুরনো রীতি অনুযায়ী পাঁঠাবলি হয়। পাশাপাশি প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে ডাব-চিনির ভোগ দেওয়ার প্রথাও রয়ে গিয়েছে।
FB POST: https://www.facebook.com/share/r/1AY5GfSXnJ/
উল্লেখ্য, এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের নামও। কথিত আছে, মল্লিকবাড়ির কুলদেবীর মাহাত্ম্যের কথা শুনে তিনি নিজে একবার পাথুরিয়াঘাটা মল্লিকবাড়িতে এসে দেবীর দর্শন করেছিলেন।বর্তমানে পরিবারের অনেক সদস্য বিদেশে থাকলেও, প্রতি বছর শরিকদের মধ্যে পালা করে হয় সিংহবাহিনী পুজো। দেবীর ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক মাহাত্ম্যের কারণে পূজার সময় নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।চার শতাব্দীর ঐতিহ্য ও শ্রদ্ধায় আজও মল্লিকবাড়ির মা সিংহবাহিনী পূজিত হন সগৌরবে, আর সেই পুজোই কলকাতার পুরনো সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে (Kolkata)।