চিত্র: সংগৃহীত
শান্তম চক্রবর্তী: ইতিহাস আর ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে কী পার্থক্য, সেটা নিয়ে সম্যকভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীযুক্ত পল্লব সেনগুপ্ত মহাশয়। আমি তখন স্নাতকোত্তর ছাত্র, আর অদ্ভুত সমাপতন হল – দীনবন্ধু মিত্রের লেখা ‘নীল দর্পণ’ নাটক নিয়েই সেদিন আলোচনা চলছিল ক্লাসে। আর এসেছিল রঘু ডাকাতের প্রসঙ্গও। ধান ভানতে শিবের গীত মনে হল? না, এবারের পুজোয় রিলিজ করা ‘রঘু ডাকাত’ (Raghu Dakat) সিনেমাটি নিয়েই আলোচনা। বা বলা ভাল, দর্শক হিসেবে একটি প্রতিক্রিয়া মাত্র।
[আরও পড়ুন: শ্রী রামকৃষ্ণ দেবও এসেছিলেন দর্শনে, চার শতাব্দীর ঐতিহ্য মল্লিকবাড়ির মা সিংহবাহিনী]
দর্শকদের সিনেমা হল-এ যাওয়ার আগেই মাথায় রাখতে হবে যে রঘু ডাকাত (Raghu Dakat) একটি ঐতিহাসিক চরিত্র। রবিন হুড টাইপের ‘ধনীর শত্রু গরিবের বন্ধু’ এই ডাকাতটির কথা অল্পবিস্তর সকলেই জানি। কিন্তু যে ইতিহাসের কথা তেমনভাবে জানি না, এই রঘুর হাত ধরেই গতিবেগ পেয়েছিল ‘নীল বিদ্রোহ’। ইংরেজ নীলকর আর তাদের সহায়ক অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ালে জুটত পেয়াদাদের মার, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও।
সেই সময়ে গরিব চাষির ‘দেবদূত’ হয়ে রীতিমত অস্ত্র হাতে মোকাবিলা করার জন্য সামনে এসে দাঁড়ায় রঘু ডাকাত। আর সেই গল্পই বলতে চেয়েছেন ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দেব অধিকারী। তবে ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে সিনেমা বানালে তার মধ্যে কিছু ‘গল্প’ তো ঢুকবেই। কিন্তু কীভাবে ঢুকবে, সেটাই পরিচালক তথা গল্পকারের ক্যারিশমা। কারণ হাতের কাছে তো সাম্প্রতিক অতীতের একটি বহু সমালোচিত সর্বভারতীয় হিন্দি সিনেমা তো ছিলই। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, ‘ছাবা’ ফিল্মটির কথাই বলছি।
সে যাক, আসা যাক ‘রঘু ডাকাত’ সিনেমার কথায়। গোটা ফিল্মের গল্প বলার জন্য বসিনি, ওটা সিনেমা হলে গিয়ে দেখতে হবে। কোনও স্পয়লারও দেব না। শুধু কয়েকটা বিষয়ে কিছু কথা। বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকাররা একটা কথাই বারবার বলতে চেয়েছেন, সিনেমার গড়পড়তা দর্শক চোখের সামনে দেখতে যান একটা গল্পের চিত্ররূপ। ইন্টেলেকচুয়াল দর্শক তার মধ্যে সিনেমা বানানোর মুন্সিয়ানা খোঁজেন।
খোঁজেন স্ক্রিপ্টিং-এর জোর, ক্যামেরার কারসাজি, ভিএফএক্স বা অভিনয় – ইত্যাদি। কিন্তু এই চলচ্চিত্রটি ক্লাস-এর জন্য নয়, মাস-এর জন্য। কিছুটা ইতিহাস এবং কিছুটা কল্পনা মিশিয়ে গড়া। কারণ এই ডাকাত চরিত্রটিকে নিয়ে প্রচুর গল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গোটা বাংলা জুড়ে। এমনকি পূর্ববর্তী শতকের কালীভক্ত রামপ্রসাদ সেনের সঙ্গেও জড়িয়ে গল্প প্রচলিত রয়েছে রঘু ডাকাতের। এমনকি কলকাতার বুকে কালীমন্দিরের সঙ্গেও রঘু-র নাম জড়িয়ে দিয়েছে এই লোকমুখে ছড়িয়ে যাওয়া ‘গল্প’। কিন্তু এই ছায়াছবিতে সেসব বাহুল্য ছেঁটে ফেলে একটা নিটোল গল্প উপহার দেওয়ার প্রয়াস রয়েছে, যেটা দরকারি ছিল।
এবার একটু অভিনয়ের কথায় আসি। তবে তার আগে একটা জরুরি কথা বলা দরকার। ছবির শুরুতে বেশ একটা গল্প বলার আমেজ ছড়িয়ে দিয়েছেন পরিচালক। তবে চমকটা ছিল আরও আগে, ছবির টাইটেল কার্ডে। মেগাস্টার দেব… পুরোপুরি দক্ষিণী কায়দায় নামটা যখন মাল্টিপ্লেক্সের পর্দায় ভেসে উঠল, গায়ে কাঁটা দিল, বিশ্বাস করুন। হ্যাঁ, দেব অধিকারী একজন বাঙালি মেগাস্টার বলেই। রজনীকান্ত, অল্লু অর্জুন, বিজয় থালাপতি বা দক্ষিণী স্টারদের ধরণে তাঁর নামটি পর্দায় ভাসতেই তাই ‘গুজবাম্প’। আর যে যাই বলুন, রঘু ডাকাতের চরিত্রে দেব দীপক অধিকারী ছাড়া এই মুহূর্তে বাংলা ছবিতে আর কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।
শারীরিক গঠন হোক বা লড়াইয়ের কসরত – প্রচুর খেটেছেন ভদ্রলোক। আর তার ফল? পর্দায় তাঁর প্রথম আবির্ভাবেই সেই চেনা স্লোগান – ‘শিরায় শিরায় রক্ত…’ ভেসে এল ফ্রন্ট-রিয়ার স্টল থেকে। ওপরতলার দর্শকরাও একটু নড়েচড়ে বসতে বাধ্য পেশীবহুল দেব-দর্শন করে। না, শুধু তিনিই নন, এই ছবির প্রত্যেকেই খেটেছেন, বেশ কয়েকমাস ধরে লড়াইয়ের কায়দা থেকে ঘোড়ায় চড়া ইত্যাদির জন্য রীতিমত ট্রেনিং করতে হয়েছে কলাকুশলীদের। যাহোক, সোহিনীর কথা আগে বলি, তিনি অসাধারণ।
‘মন্দার’-এর ‘লায়লি’-র কথা মনে পড়ছিল বারবার ‘গুঞ্জা’-কে দেখতে দেখতে। কিন্তু এই চরিত্রেও তিনি ফাটাফাটি। ইধিকাও যথাযথ। রূপা গঙ্গোপাধ্যায়কে অনেকদিন পর সিলভার স্ক্রিনে দেখে ভাল লাগল। পুরনো চাল এখনও ভাতে বাড়ে, সেটা প্রমাণিত হল। আর হ্যাঁ, অনির্বাণ ভট্টাচার্য… থিয়েটারকে ফিল্মের পরিধির মধ্যে নিয়ে আসার যে ট্রেন্ডটা তিনি সেট করতে চাইছেন, এবারও সেই বিষয়ে তিনি সফল। অনুজয় চট্টোপাধ্যায়, সুমিত সমাদ্দার, লোকনাথ দে, ওম সাহানি এবং বাকিরা যথাযথ।
গান রয়েছে বেশ কয়েকটি। রথীজিৎ ভট্টাচার্য ও নীলায়ন চট্টোপাধ্যায় সুর করেছেন, লিখেছেন সুগত গুহ, প্রসেন, নীলায়ন এবং সুব্রত বারিশওয়ালা। ‘রঘু রঘু’ সিগনেচার গানটি বেশ রক্তগরম করা, রথীজিৎ গেয়েছেন। এছাড়া ‘জয় কালী’ গানে রঘুর নাচের কথা তো আগেই বলেছি, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল’ গানটি গেয়েছেন ঈশান মিত্র আর শুচিস্মিতা চক্রবর্তী – বেশ ভাল লাগল। মনে মনে গুনগুন করার মতো গান। ‘আগুনপাখি’ গানটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে, মিশে গিয়েছে ছবির সিচুয়েশনের সঙ্গে। চোখে জল না এলেও মন খারাপ করা গানের সুর। সব মিলিয়ে বেশ ভাল কাজ করেছেন সুরকাররা। আর সেই সঙ্গে বেশ ভাল ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও (Raghu Dakat)।
এই ছায়াছবিটি দেখতে যাওয়ার আগে এটা মাথায় ঢুকিয়ে নিতে হবে যে, ‘রঘু ডাকাত’ মোটেও রঘু ডাকাতের বায়োপিক নয়। অনেকেই সমাজমাধ্যমের পাতায় নানা রকমভাবে নেগেটিভ রিভিউ দিচ্ছেন। তাঁরা হয়ত ভাবতে পারেননি যে, দশ-বারো কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় দক্ষিণী সিনেমার ধাঁচে এরকম একটা ছবি পুজোর সময় দর্শকের থালায় মোগলাই খানার মতো পরিবেশন করা হবে। হ্যাঁ, ঊনবিংশ শতকের একজন ভালমানুষ ডাকাতের জোড়া প্রেমের গল্প, নীলকরদের পা-চাটা জমিদারের বনশালি স্টাইলের পোশাক, উড়ন্ত ডাকাতের দুরন্ত অ্যাকশন, থাইল্যান্ডে স্বপ্নদৃশ্য ইত্যাদি নিয়ে কেউ কেউ কটাক্ষ করছেন।
ইতিমধ্যে এই ছবি নিয়ে সমাজমাধ্যমের পাতায় রীতিমত চাপানউতোরও চলেছে। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন। ‘বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ান’ – এই স্লোগানটি প্রায়শই বলে ওঠেন যাঁরা, তাঁদের কিন্তু একটি নতুন বাংলা সিনেমার জৌলুস অনুভব করতে গেলে সেটা ‘হল’-এ গিয়েই করতে হবে। এবং টিকিট কেটেই যেতে হবে, কবে ‘ভিডিয়ো লিংক’ শেয়ার হবে, তার জন্য অপেক্ষা করে নয়। এবং সেটা একটা ‘এক্সপেরিয়েন্স’ হবে, সেটা বলাই যায়। একই সঙ্গে চার চারটি সিনেমা পুজোর সময় রিলিজ করেছে, লড়াইটাও জমজমাট হয়েছে। সেই লড়াইয়ের সাক্ষী হবেন না? তাহলে আর কিসের আপনি সিনেমাপ্রেমী?