চিত্র- সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: ২০০ কোটি টাকার হাইপ্রোফাইল আর্থিক তছরুপ এবং প্রতারণার মামলায় বলিউড অভিনেত্রী জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজের অস্বস্তি আরও বাড়ল। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলায় এবার অত্যন্ত বড়সড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ মোড় এল। শ্রীলঙ্কান বিউটি জ্যাকলিনের বিরুদ্ধে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি চার্জ বা অভিযোগ গঠনের নির্দেশ দিল দিল্লির পাটিয়ালা হাউস কোর্ট। শুধু জ্যাকলিনই নন, মূল অভিযুক্ত ও কুখ্যাত ঠগ সুকেশ চন্দ্রশেখর, তাঁর স্ত্রী লীনা মারিয়া পল-সহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এই মেগা দুর্নীতি মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারপর্ব (Trial) যে অত্যন্ত জোরকদমে শুরু হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। শনিবার দিল্লির পাটিয়ালা হাউস কোর্টের অতিরিক্ত সেশনস বিচারক প্রশান্ত শর্মা মামলার নথি ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর জমা দেওয়া সমস্ত তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে এই নির্দেশ দেন। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, আগামী ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে এই চার্জশিটে স্বাক্ষর করা হবে।
বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, “মামলার সমস্ত নথিপত্র এবং ইডির পেশ করা প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, অভিযুক্তরা প্রত্যেকেই প্রাথমিকভাবে (Prima Facie) এই আর্থিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই আইন মেনে তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।” আদালত এই মামলার মূল চক্রী সুকেশ চন্দ্রশেখরের বিরুদ্ধে একাধিক কঠোর ধারায় চার্জ গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। নিজেকে সরকারি আধিকারিক পরিচয় দিয়ে প্রতারণা, হুমকি, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও বেআইনি সম্পত্তি রাখার পাশাপাশি সুকেশের বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্রের অত্যন্ত কড়া আইন ‘মকোকা’ (MCOCA – Maharashtra Control of Organised Crime Act)-এর ধারায় অভিযোগ গঠন করা হচ্ছে। ১৯৯৯ সালে প্রণীত এই বিশেষ আইনটি সাধারণত সংগঠিত অপরাধচক্র, মাফিয়া এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসবাদ রুখতে ব্যবহার করা হয়, যা পুলিশকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা দেয়। সুকেশের স্ত্রী লীনা মারিয়া পল এবং বাকি সহযোগীদের বিরুদ্ধেও তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও মকোকার বিভিন্ন ধারায় চার্জ গঠন করা হবে। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের দায়ের করা এই মামলার মূল তদন্তভার ছিল ইকোনমিক অফেন্সেস উইং (EOW)-এর হাতে।
মামলার সূত্রপাত বেশ কয়েক বছর আগে। অভিযোগ, দিল্লির হাই-সিকিউরিটি তিহার জেলে বন্দি থাকা অবস্থাতেই সুকেশ চন্দ্রশেখর এক অভিনব জালিয়াতির জাল বুনেছিলেন। নিজেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিক পরিচয় দিয়ে ফোন মারফত প্রাক্তন র্যানব্যাক্সি (Ranbaxy) কর্তা শিবিন্দর সিংয়ের স্ত্রী অদিতি সিংয়ের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন সুকেশ। এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা বা ‘ক্রাইম প্রসেডস’ কোথায় কোথায় ব্যবহার করা হয়েছিল, তা তদন্ত করতে গিয়েই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইডির নজরে আসেন বলিউডের চল্লিশ বছর বয়সী অভিনেত্রী জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজ। ইডির চার্জশিটে দাবি করা হয়েছিল, সুকেশ যে একজন আন্তর্জাতিক প্রতারক এবং এই বিপুল সম্পত্তি যে দুর্নীতির টাকা, তা ভালোভাবেই জানতেন জ্যাকলিন। সব জেনেবুঝেও তিনি সুকেশের দেওয়া কোটি কোটি টাকার হিরে, দামি গাড়ি ও লাক্সারি উপহার নিয়েছিলেন এবং সেই কালো টাকা ভোগ করেছিলেন।
যদিও শুরু থেকেই জ্যাকলিন নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে দাবি করে এসেছেন। তাঁর পালটা দাবি ছিল, সুকেশ নিজেকে বড় ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে তাঁর আবেগ নিয়ে খেলেছেন এবং তাঁকে এই মামলায় বলির পাঁঠা বানিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। মামলা থেকে বাঁচতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জ্যাকলিন আদালতের কাছে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা সরকারি সাক্ষী হওয়ার আবেদনও জানিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, তদন্তের স্বার্থে অনেক গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি পুলিশকে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু ইডি তাঁর সেই আবেদন খারিজ করে দেয় এবং জানায় যে, অপরাধ জানার পরেও জ্যাকলিন সুকেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। আদালতের এই সাম্প্রতিক নির্দেশের পর মামলার প্রাথমিক তদন্তের পর্ব শেষ হয়ে এবার তা আইনি বিচারের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করল। আগামী ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ গঠন হয়ে গেলেই আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ট্রায়ালের মূল প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে।