গ্রাফিক্স: নিজস্ব
Bangla Jago Desk: রাজু পারাল: কোনো কোনো মানুষ সমাজে ছাপ ফেলে যান তাঁর সৃষ্টির দ্বারা। এই ধরিত্রীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেও থেকে যায় তাঁর কাজগুলি। সিনেমা জগতেও ঠিক এমনি একজন এসেছিলেন যিনি তাঁর কাজের দ্বারা সকলের মন অধিকার করে নিয়েছিলেন। আজও তাঁর ছবি প্রদর্শিত হলে দর্শকরা দেখেন চোখ টান টান করে। কমেডিয়ান ছিলেন। কিন্তু সিরিয়াস চরিত্রেও অভিনয় করতেন সাবলীল ভাবে। তিনি তুলসী চক্রবর্তী (১৮৯৯ – ১৯৬১)।

৬৩ বছরের বেশি সময় হয়ে গেল তিনি এই ধরাধাম ছেড়ে চলে গেছেন। তবু তিনি আজও জনপ্রিয়। সমকালীন অনেক অভিনেতা, অভিনেত্রী’ই তাঁর কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। চিন্ময় রায়, অনুপ কুমার, রবিঘোষ – সকলেই গুরু মানতেন তাঁকে। তাঁরা অনেকের অভিনয় নকল করলেও কখনও তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় নকল করতে পারেননি।
বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের এই মহান অভিনেতার জন্ম নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের ‘গোয়াড়ি’ নামক এক ছোট গ্রামে। বাবা আশুতোষ চক্রবর্তী ছিলেন ভারতীয় রেলের কর্মী। মা নিস্তারিণী দেবী ছিলেন সুগৃহিনী। বাবার কাজের সূত্রে তুলসী চক্রবর্তীকে অবিভক্ত বাংলার নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে বাল্যকালে। খুব অল্প বয়সে তিনি পিতাকে হারিয়ে কলকাতার জোড়াসাঁকোয় কাকা প্রসাদ চক্রবর্তীর কাছে মানুষ হতে থাকেন। অর্থের জন্য তখন থেকেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন বহুবিধ কাজের সঙ্গে। তাই পড়াশোনায় বেশি দূর এগোতে পারেননি তিনি।
পনেরো বছর বয়সে সার্কাস দলে খেলা দেখাবার কাজ পেয়ে যান। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে তিনি সার্কাস দলের সঙ্গে রেঙ্গুন চলে যান। ঐ বয়সেই জাগলারি ভালোভাবে আয়ত্ত করেছিলেন। সে সবই দেখাতেন সার্কাসে। কখনও বা জোকার সেজে নেমে পড়তেন সার্কাসে। কিন্তু পরের দিকে সেসবে তাঁর আর মন টিকল না। ফিরে এলেন কলকাতায়। কাকা প্রসাদ চক্রবর্তী বারো টাকা মাইনের একটি কাজে ঢুকিয়ে দিলেন তাঁকে। পরে গানে তাঁর সহজাত প্রতিভা দেখে কাকা তাঁকে স্টার থিয়েটারে ভর্তি করে দেন।

সেখানে তিনি নৃত্য শিক্ষকের কাছে রীতিমতো নাচ শিখতেন। অপেরাধর্মী বহু নাটকে শিল্পীদের সমবেত নৃত্যগীতেও তিনি অংশ নিতেন। ছোটখাটো ভূমিকায় তিনি অভিনয়ও করতেন। তবলা ও বাঁশি বাজাতেও পারতেন চমৎকার। ১৯২৫ সালে ‘ঋষির মেয়ে’ নামক একটি নাটকে সত্য সেনের ভূমিকায় তিনি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন। পরে স্টার থিয়েটারের প্রতিটি নাটকে তিনি অভিনয় করেছিলেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের অভিনয় জীবনে তাঁর অভিনীত ছবি ও নাটকের সংখ্যা প্রায় তিন শতাধিক। কৌতুকাভিনেতা হিসাবে তাঁর সমকক্ষ প্রায় কেউই ছিলেন না।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘ পরশ পাথর ‘ ছবিতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন। ছবিটি মুক্তি পাবার পর সবাই বুঝল যে শুধু ভারতবর্ষ নয়, তুলসী চক্রবর্তী ঐ ছবিতে পৃথিবীর বিখ্যাত কমেডিয়ানদেরও হারিয়ে দিয়ে সিনেমা জগতে একটি মাইলস্টোন তৈরী করেছেন। এ বিষয়ে একটা মজার ঘটনা শোনা যায়। মানিকদা (সত্যজিৎ রায়) তুলসীবাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ আপনি এত কম টাকায় রাজি হলেন কেন? আপনি তো ছবির হিরো।’ উত্তরে তুলসী চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘ না , না। আমি যদি এখনই এত হাজার টাকা পাই তবে পরে আর আমায় কেউ নেবে না। সবাই বলবে, তুলসী রেট বাড়িয়ে দিয়েছে।’

একথা শোনার পর মানিকদা তাঁর প্রোডাকশন কন্ট্রোলের লোকদের বলেছিলেন, তুলসীবাবুর রেট একটু বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এরকমই ছিল মানিকদার (সত্যজিৎ রায়) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সত্যজিৎ রায় তাঁকে উদ্দেশ্য করে একবার বলেছিলেন, ‘উনি হলিউডে জন্মালে এতদিনে অস্কার পেতেন।’ তুলসী চক্রবর্তীর ‘পরশ পাথর’ দেখে সত্যজিৎ রায় তাঁর এক বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘ তুলসীবাবুর মতো এক বড় মাপের অভিনেতাকে আমি ব্যবহার করতে পেরেছি বলে গর্বিত।’
তখনকার প্রায় সবরকম ছবিতেই তুলসী চক্রবর্তী অভিনয় করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের কথা, তাঁকে খুব ছোট বা বড় ভূমিকায় নেওয়া হত চাকরের চরিত্রে। তিনি হাসি মুখে যেমন চরিত্রটি নিতেন তেমনি মন দিয়ে কাজটাও করতেন। মেস মালিক থেকে পাঠশালার গুরুমশাই অথবা মুদি থেকে ব্যাংকের কেরানি, কখনও গৃহ-ভৃত্য, কখনও গাঁজাখোর —যখন যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, হাসির বন্যা বইয়ে দিয়েছেন।

‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে উত্তম – সুচিত্রা নায়ক -নায়িকা থাকলেও সিনেমা দেখার পর অনেকেই মনে করতেন ছবিটি তাঁদের জন্য হিট হয়নি, হিট হয়েছিল তুলসী চক্রবর্তী ও মলিনাদেবীর জন্য। ছবি নিয়ে কেউ তাঁর প্রশংসা করলে তিনি নিজের সম্পর্কে বলতেন, ‘আমি হলাম গিয়ে হেঁশের বাড়ির হলুদ। ঝালে-ঝোলে-অম্বলে সবেতেই আছি। কিন্তু হলুদের কি নিজস্ব কোন স্বাদ আছে !’
অভিনয়ে কিভাবে অসাধ্যসাধন করতেন তিনি? এক সাংবাদিককে তিনি বলেছিলেন, ‘চোখ -কান খোলা রাখি, আর সব ধরণের মানুষ দেখে বেড়াই। চরিত্রের দাবি অনুযায়ী, যখন যাকে দরকার, তাকে তুলে ধরি। এসব চরিত্র ফুটিয়ে তোলার দরকার হয় নাকি? এসব তোমার আমার চারপাশে ঘুরছে। যে কোন- ও একটাকে তুলে এনে নিজের কাঁধে ভর করাও।’

শোনা যায়, অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তী নাকি হাওড়ার বাড়ি থেকে টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় আসতেন ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসে। যাতে খরচটা কম হয়। বলতেন, ‘আমি ট্যাক্সিতে চেপে এলে পরিচালকরা ভাবতে পারেন বেশি টাকা চাইব, তাই কেরানিদের মতো ট্রামে আসাই ভালো।’ টাকা উপার্জনে তাঁর খুব একটা আগ্রহ ছিল বলে শোনা যায়নি। তবে জীবিতাবস্থায় দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন সংস্থান করতে হিমশিম খেতে হয়েছিল তাঁকে। নিদারুন ঠান্ডায় তাঁর গরম পোশাক না থাকার খবর পেয়ে মহানায়ক উত্তমকুমার নিজে তাঁর অভিনয়ের স্টুডিওতে পৌঁছে একটি শাল তাঁকে পড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঐ শাল পেয়ে নিজের আবেগকে ধরে রাখতে না পেরে উত্তম কুমারকে জড়িয়ে ধরে ছোট শিশুর মতো হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি।
কাজ না পাওয়ার ভয়ে খুব কম পারিশ্রমিকে কাজ করতেন তুলসী চক্রবর্তী। যার পরিণতি খুব খারাপ হয়েছিল। শেষ জীবনে টাকা পয়সা তেমন নিজের স্ত্রীকে দিয়ে যেতে পারেননি। যা সত্যিই একটা ট্রাজেডি। শোনা যায়, তুলসী বাবুর অবর্তমানে তাঁর স্ত্রীকেও যোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। তুলসী চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর আর্টিস্ট ফোরাম থেকে কিছু টাকা -পয়সার ব্যবস্থার করে ওঁনার স্ত্রীকে পাঠানো হত। ভাবতে কষ্ট লাগে যিনি সারাজীবন লোক হাসিয়ে তাদের মনোরঞ্জন করে এলেন তাঁর শেষ অবস্থা কী এরকম হওয়া উচিত ছিল? মধ্য হাওড়ার ২ নং কৈলাস বোস থার্ড বাই লেনের ছয় ফুটের সরু গলি আজও উসকে দেয় তাঁর স্মৃতিকে।