চিত্র- সংগৃহীত
Bangla Jago Desk: এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সাক্ষী থাকল কলকাতার নন্দন চত্বর। যে সরকারি প্রেক্ষাগৃহে জীবিতাবস্থায় বারবার ব্রাত্য থেকেছেন পরিচালক অনীক দত্ত, যাঁর ছবিকে প্রদর্শনের অনুমতি দেয়নি তৎকালীন শাসকদল, জীবনের অন্তিমলগ্নে সেই নন্দনেই এসে পৌঁছল তাঁর নিথর দেহ। ফুলের মালায় সুসজ্জিত, কাচের শববাহী গাড়িতে শায়িত ‘অপরাজিত’ ছবির পরিচালককে শেষবারের মতো দেখতে এদিন ভেঙে পড়েছিল টলিপাড়া। বাবার এই শেষযাত্রার ছায়াসঙ্গী ছিলেন মেয়ে রাই। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর স্রষ্টাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এদিন নন্দন প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছিলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, বিদিপ্তা চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মতো রাজনৈতিক ও চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্বরা। প্রত্যেকেই করজোড়ে প্রয়াত পরিচালককে প্রণাম ও শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন।
পরিচালকের এই প্রয়াণলগ্নে দাঁড়িয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের ‘ব্যান কালচার’ বা বয়কট রাজনীতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন উপস্থিত বিজেপি নেত্রীবৃন্দ। অনীক দত্তকে স্মরণ করে লকেট চট্টোপাধ্যায় বলেন, “সিনেমার মাধ্যমে মানুষের মনের কথা তুলে ধরতেন অনীকদা। সেই শূন্যস্থান আর কেউ পূরণ করতে পারবে না।” বিগত ১৫ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে আঙুল তুলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, আগামী দিনে শিল্পীদের সঙ্গে এমন আচরণ আর ঘটবে না। লকেটের কথায়, গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে এবং তার জন্য কাউকে ব্যান করা বা প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। তৃণমূল জমানার সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে বিজেপি জমানায় প্রত্যেক শিল্পীকে তাঁর কাজের যোগ্য সম্মান দেওয়া হবে এবং সেখানে কোনও রাজনৈতিক রঙের ছোঁয়া থাকবে না।
অনুরূপ সুর শোনা গিয়েছে অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারীর গলাতেও। পূর্বতন সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি বলেন, “এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে উনি দেখে যেতে পারলেন না টলিগঞ্জ এখন রাহুমুক্ত।” নন্দনে সব ধরনের সিনেমা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনের দাবি তুলে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মূর্খ মানুষের জন্য আগে তথ্যচিত্র প্রদর্শন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ‘অপরাজিত’ ছবির নেপথ্যে থাকা তথ্যের কথা উল্লেখ করে পাপিয়া দাবি করেন, ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে সমাজের অন্ধকার দিকটা তুলে ধরার কারণেই তৎকালীন সরকারের রোষে পড়তে হয়েছিল অনীক দত্তকে। মানসিক নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ওরা খুনি। শুধু ছুরি দিয়েই খুন হয় না, এটাও এক ধরনের খুন।” বর্তমান পরিবর্তনের আবহে সেই সরকারকে তাড়ানো সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পরিচালকের শেষকৃত্যের সময়সূচি এবং পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানান অভিনেতা-বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ। তিনি জানান, নন্দন চত্বরে ভক্ত ও গুণমুগ্ধদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পর পরিচালকের দেহ নিয়ে যাওয়া হবে টলিগঞ্জের এনটিওয়ান স্টুডিওতে, যেখানে তিনি কর্মজীবনের সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন। সেখানে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত দেহ শায়িত রাখার পর, দুপুর একটার সময় শ্মশানের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হবে। এই অন্তিম যাত্রায় শামিল হয়ে রুদ্রনীলের স্পষ্ট বার্তা, পূর্বতন সরকার অনীক দত্তর যে সমস্ত ছবি নন্দনে প্রদর্শনে বাধা দিয়েছিল, বর্তমান সরকার খুব শীঘ্রই সেই ছবিগুলি এখানে দেখানোর ব্যবস্থা করবে। নন্দন চত্বরে দাঁড়িয়ে বিজেপি সরকারের তরফে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দেন যে, আগামী দিনে টলিপাড়ায় যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ হবে এবং কোনও রকম স্বৈরাচার বরদাস্ত করা হবে না।