ad
ad

Breaking News

Zohran Mamdani

SIR নিয়ে ব্যস্ত ভারত, এরই মাঝে মামদানির জয়, কী শেখাল আমাদের?

যদি কেউ এই বার্তা বুঝতে ভুল করেন, তাহলে বিহার নির্বাচনও তিনি বুঝবেন না, আর পশ্চিমবঙ্গেও কী হতে চলেছে, তা আন্দাজ করতে পারবেন না।

Zohran Mamdani, New York Victory: A Message for Indian Politics

চিত্র: সংগৃহীত

সুমন ভট্টাচার্য (বিশিষ্ট সাংবাদিক): নিউ ইয়র্কের মেয়র পদে জোহরান মামদানির জয় আসলে কী শেখাল? বা সত্যিই কি আমরা কিছু শিখতে পারলাম? নিউ ইয়র্ক, পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত শহরে একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিমের জিতে আসা এবং তাও আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জকে উপেক্ষা করে, কী বার্তা দেয় বা কী বোঝায়? আমাদের মনে রাখতে হবে, জোহরান মামদানির বিরুদ্ধে শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প নামেনি (Zohran Mamdani)।

তাঁর নিজের দল ডেমোক্র্যাভটদের একটা বড় অংশ মামদানির বিরুদ্ধে কাজ করেছে। গোটা নিউ ইয়র্কের সমস্ত ‘এলিট’, বুর্জোয়া বড় বড় শিল্পপতিরা তাঁকে হারাতে কোটি কোটি টাকা ঢেলেছেন এবং ‘মেইন স্ট্রিম মিডিয়া’ তাঁর বিরুদ্ধে যাবতীয় কুৎসা, নিন্দা চালিয়ে গিয়েছে। এমনকি নির্বাচন শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে এটাও কাউকে কাউকে দিয়ে বলানো হয়েছে, যে যেহেতু জোহরান মামদানি একজন মুসলিম, তাই তাঁকে জেতাতে অর্থ সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে প্যালেস্তাইনের জঙ্গি সংগঠন বলে পরিচিত হামাস। কিন্তু এই কোনও কিছুই শেষ পর্যন্ত জোহরান মামদানিকে টলাতে পারেনি।

তিনি সবাইকে উড়িয়ে দিয়ে নিউ ইয়র্কের সাধারণ মানুষের সমর্থন পেয়ে প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন মুসলিম মেয়র। ভারতবর্ষ যখন আলোড়িত ‘সার’ নিয়ে, বিহার নির্বাচনে কী হবে সেই নিয়ে সবাই দুরু দুরু বুকে অপেক্ষায় আছেন, তখন নিউ ইয়র্ক শহরের গরিব-গুর্বো মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষ্ণাঙ্গরা, দক্ষিণ এশিয়রা আসলে আমাদের কী শেখাল বা যা শেখাল, তা কি আমরা বুঝতে পারলাম (Zohran Mamdani)?

যে কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যখন রাহুল গান্ধি লড়াই করেন, যে কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যখন তেজস্বী যাদব কথা বলেন, তখন তাঁরও সম্ভাবনা রয়েছে, সেকথা কি আমরা বুঝতে পারলাম? বুঝতে পারলাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা বললে, যেমন মামদানিও বলেছেন— ফ্রি বাস, পুরসভা পরিচালিত মুদির দোকান, এইসব কিছুর প্রতিশ্রুতি দিলে বড় বুদ্ধিজীবী এবং বড় কর্পোরেটকেও হার মানিয়ে দেওয়া যায়?

মীরা নায়ারের পুত্রের নিউ ইয়র্ক জয় করার আখ্যান দেখতে দেখতে এবং বিবিধ ব্যাখ্যা দেখতে দেখতে বুঝতে পারছিলাম, যে ভারতবর্ষের পুঁজিপতিরাও, বড় মিডিয়ার মালিকরাও একটু ঘাবড়ে গিয়েছেন। তাহলে তাঁদের লাগাতার প্রচার, সন্ধ্যাবেলায় খাপ পঞ্চায়েত বসানো, নিজেদের মতো করে কাউকে তুলে ধরা এবং নিজেদের মতো করে কাউকে বুদ্ধিজীবী সাজানো, এই সমস্ত কিছুকেই কি নস্যাৎ করে দিতে পারে মাটির সঙ্গে সংযোগ রাখা কোনও মানুষ?

হ্যাঁ, মাত্র এক বছর আগে অবধি যাঁকে কেউ চিনত না, সেই জোহরান মামদানির অভাবনীয় জয় বুঝিয়ে দিচ্ছে টাকা, ক্ষমতা এবং চকচকে গ্ল্যামারের বাইরেও একটা পৃথিবী আছে, যে পৃথিবী এমনকি নিউ ইয়র্ক শহরের গ্ল্যামার, পুঁজি, কর্পোরেট পয়সা সমস্ত ধরনের প্রযুক্তিকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এক ৩৪ বছরের মুসলিম তরুণকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে পারে।

আমি এই লেখায় এখনও অবধি এতবার ‘মুসলিম’ শব্দটি ব্যবহার করেছি এই কারণে, যে খাস কলকাতা শহরে একজন মুসলিমকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়র করলে যে পরিমাণ সামাজিক টিটকিরি, যে পরিমাণ বিদ্বেষের বাণ ধেয়ে আসে, সেটাকে মাথায় রেখে। এবং এই বিদ্বেষের বড় অংশ আসে তথাকথিত কলকাতা শহরে ‘এলিট’দের কাছ থেকে, ‘প্রগতিশীল’দের কাছ থেকে, যাঁরা নিজেদের প্রগতিশীলতার চাদর গায়ে জড়িয়ে, এই শীতে একটু কাশ্মীরি চাদর গায়ে জড়ানোর মতো করেই চলচ্চিত্র উৎসবে, নাটকের আসরে কিংবা আবৃত্তির আসরে ঘৃণা উগরে দেন (Zohran Mamdani)।

যেমনতর ঘৃণা আমরা উগরে দিতে দেখেছি সম্প্রতি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে অথবা খবরের কাগজের সাক্ষাৎকারে তথাকথিত ‘বাজারি’ সাহিত্যিকদের। এবং সেই ‘বাজারি’ সাহিত্যিকদের কেউ পুরুষ, কেউ মহিলা। তাঁরা সমাজের বর্ণাশ্রমকে যেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন, ঘৃণাকে যেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন, তার তুলনা মেলা ভার। জোহরান মামদানি, তিনি নিউ ইয়র্ক শহরের একজন বাসিন্দা এবং যা যা করেছেন, তার কোনওটাই ঠিক প্রথাগত রাজনীতির মধ্যে দিয়ে যায় না। তাঁকেও এই ধরনের ঘৃণার, মেরুকরণের মোকাবিলা করতে হয়েছে।

শুধুমাত্র তিনি মুসলিম বলে তাঁর সম্পর্কে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী এমনটাও বলতে দ্বিধা করেননি, যে আর একটা ট্যুইন টাওয়ারে হামলা হলে হয়তো জোহরান মামদানি খুশি হবেন। যেমনটা আমাদের এই রাজ্যেও বা এই দেশেও মুসলমানদের হামেশাই শুনতে হয়, যে আসলে তো ও জঙ্গিই এবং তথাকথিত প্রগতিশীল, সাহিত্যমনামণ্ডলেও, বুদ্ধিজীবীমণ্ডলেও এই নিয়ে আলোচনা হয়।

মীরা নায়ারের পুত্র, এক গুজরাটি মুসলিম অধ্যাপকের পুত্র জোহরান আসলে সত্যি সত্যি কি আমাদের কিছু শেখাল? ক্ষমতার অলিন্দে থাকা যে মানুষরা ক্রমাগত বিপক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছেটে ফেলেন শুধুমাত্র নেটওয়ার্কিং দিয়ে, শুধুমাত্র ক্ষমতার বৃত্তের ভিতরে তাঁর আনাগোনা দিয়ে তিনি থামিয়ে দিতে চান নতুন উঠে আসা কোনও প্রতিভাকে, তাঁরা কি বুঝতে পারলেন জোহরান মামদানি কী বার্তা দেন? যদি নিউ ইয়র্কের মতো শহরে, যেখানে ‘প্রতিভা’, ‘এলিটিজম’, ‘গ্ল্যামার’ বিচ্ছুরণ হয়, সেখানে আন্দ্রে কুওমো, আন্দ্রে কুওমোকে আপনি পশ্চিমবঙ্গের বা ভারতবর্ষের যে কোনও ধনকুবেরের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন এবং ধনকুবেরের জায়গায় আন্দ্রে কুওমোকে বসিয়ে দিলে বুঝতে পারবেন, যে আসলে এই বাংলার তথাকথিত ‘এলিট’, ‘ধনকুবের’, ‘বুদ্ধিজীবী’, ‘চকচকে পেজ থ্রি পার্টিতে নিয়মিত যাওয়া আসা করা’ মানুষদের কতটা বেআব্রু করে দিয়েছেন জোহরান মামদানি (Zohran Mamdani)।

কুওমো, যাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের একাধিক অভিযোগ ছিল, যিনি কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাই নিয়ে নিউ ইয়র্কের কারও অন্তত কোনও সংশয় ছিল না, তাঁকেও বাঁচাতে ডেমোক্র্যািট দলের বড় অংশ, যে অংশকে আবার আমরা চিনি আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনুসকে বসানোর জন্য, কিংবা স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প জান লড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর সেই কুওমো, যাঁকে ব্রাত্য বসুর কোনও নাটকের আপনি ক্ষমতার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে ধরতে পারেন, যেমনতর নাটক লিখে ব্রাত্য একসময় ব্রাত্য হয়ে উঠেছিলেন, অর্থাৎ, তাঁর ‘অশালীন’ থেকে ‘অদ্য শেষ রজনী’, সেইরকম নাটকের কোনও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা চরিত্র হিসেবে ধরতে পারেন, যাঁরা আসলে সব কিছু নির্ধারণ করে দিতে চান, সেই সমস্ত নির্ধারণকে, পড়ুন কুওমো কিংবা আমাদের এই বঙ্গের ‘বাজারি’ মিডিয়াকে জোহরান মামদানি চ্যালেঞ্জ করছিলেন।

চ্যালেঞ্জ করছিলেন এটা বলে, যে তুমি আমার নাম লিখবে না, তুমি আমার বিরুদ্ধে রোজ মিথ্যে লিখবে, তুমি আমার বিরুদ্ধে কুৎসা করবে, তুমি আমার স্ত্রী সম্পর্কে জঘন্যতম মন্তব্য করবে, কিন্তু দেখো, তবু আমার দিকে সাধারণ মানুষের ভোট পড়েছে। গরিব-গুর্বো, হারলেমে থাকা কৃষ্ণাঙ্গের, নিউ ইয়র্কে পৌঁছে গিয়ে পায়ের তলায় জমি খুঁজতে থাকা দক্ষিণ এশিয়— সবার সমর্থন আছে। তুমি ক্ষমতা দিয়ে, তুমি নেটওয়ার্কিং দিয়ে, তুমি টেলিভিশন চ্যানেলে তোমার বলার সুযোগ দিয়ে তুমি আমায় কেটে দিতে পারবে না।

আমি লড়ব সোশ্যাল মিডিয়ায়, আমি লড়ব রাস্তায়, আমি লড়ব রেস্টুরেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী, বিত্তশালী দেশে ও সবচেয়ে আলোচিত শহরে, যে শহরকে নিয়ে আমাদের সবার উচ্ছ্বাস, সেই নিউ ইয়র্ক শহরে যখন মামদানি জিতছেন, তখন ভারতবর্ষের রাজনীতিতেও আলোড়ন। একের পর এক আত্মহত্যার অভিযোগ, একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে যখন ভারতবর্ষেও কত মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে (Zohran Mamdani)।

‘সার’ নামক এক অদ্ভুত ঘটনা দিয়ে ভারতবর্ষের শাসকদল কত নাগরিককে বেনাগরিক এবং কত মানুষকে অস্তিত্বহীন করে দিতে চাইছে বলে রব উঠেছে। বিরোধীরা বলছে এই সবই আসলে ভারতবর্ষের ৭৮ বছরের গণতন্ত্রকে টলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। কী আশ্চর্য দেখুন, যখন নেহরুর তৈরি গণতন্ত্রকে টলিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতবর্ষের শাসকদল উদগ্রীব, তখনই জোহরান মামদানি জিতে নেহরুর কথা স্মরণ করালেন। বললেন, যে ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে আবার নাকি তাঁর দেশও দাঁড়িয়ে আছে।

নেহরুর ওই কথাটা ‘Tryst with Destiny’। নেহরুকে স্মরণ করা মানে তো শুধুই নেহরুকে স্মরণ করা নয়, আসলে এক বহু বর্ণ, বহু ভাষার যে দেশের কথা নেহরু বলে গিয়েছিলেন, আজ হয়তো নিউ ইয়র্ক শহরের সংস্কৃতিও যে, বহু বর্ণের, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির মেলবন্ধনের কথা বলে, জোহরান মামদানি সেটাকে মনে করালেন। মনে রাখবেন ঠিক সেই সময় মুর্শিদাবাদ থেকে ক্যানিং, কোচবিহার থেকে পানিহাটি বাঙালি আতঙ্কিত ‘সার’ নামে এক জিনিস নিয়ে, যা বাঙালিকে রাষ্ট্রহীন করার, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্তে অভিযুক্ত। নিউ ইয়র্কেও তো ডোনাল্ড ট্রাম্প একই ধরনের দমনপীড়ন চালাতে চান, মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে চান। জোহরান মামদানি তার বিরুদ্ধে লড়ছেন।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার বিরুদ্ধে লড়ছেন। বিহারে তেজস্বী যাদব, রাহুল গান্ধি জোর কণ্ঠে বলছেন, ‘গণতন্ত্রকে এভাবে দাবিয়ে রাখা যাবে না।’ তবু কি ক্ষমতা বুঝল? বুঝলেও কবিতার আসরে কেটে দেওয়া কবি রাস্তায় গিয়ে কবিতা বলতে পারে, ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ছিটকে দেওয়া অধ্যাপক রাস্তায় নেমে মিছিল করতে পারে, কোনও সেলিব্রেটি অনুষ্ঠানে ডাক না পাওয়া মানুষটিও রাস্তায় নেমে প্রচারে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিষ্ঠানকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। যদি বোঝে, তাহলেই জোহরান মামদানির বার্তা পড়তে পারবেন। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় যে পরিবর্তনের ঝড় উঠেছিল বা চলছে, সেই ঝড়েরই আর একটা দিক আমরা দেখতে পেলাম নিউ ইয়র্কে মামদানির জয়ের মধ্যে দিয়ে। যদি কেউ এই বার্তা বুঝতে ভুল করেন, তাহলে বিহার নির্বাচনও তিনি বুঝবেন না, আর পশ্চিমবঙ্গেও কী হতে চলেছে, তা আন্দাজ করতে পারবেন না (Zohran Mamdani)।