চিত্রঃ প্রতীকী
জয়ন্ত চক্রবর্তী: পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভোট মিটতে না মিটতেই শুরু হয়ে যাবে বিশ্বকাপ ফুটবল। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল— ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’। আমার পেশার সুবাদে তিনটি বিশ্বকাপ কভার করেছি। বলতেই পারি যে, বিশ্বকাপ ফুটবলের কাছে আর কোনও কিছুই লাগে না। বাঙালি তার অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ ঘটাবে এবারের ভোটে, কিন্তু তার থেকে ঢের বেশি ক্ষরণ ঘটবে ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। ভবানীপুরে মমতা বন্দোপাধ্যায় কত ভোটে শুভেন্দু অধিকারীকে হারালেন, তার থেকেও কলকাতাবাসীর কিংবা এই বঙ্গের মনোযোগ আকর্ষণ করবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ম্যাচ। বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হলে গোটা বিশ্বজুড়ে যে উন্মাদনার সৃষ্টি হবে, তার ছিটেফোটাও নিজেদের কোলে টানতে পারবে না রাজনৈতিক দলগুলি। আরও স্পষ্ট করে বলা ভাল, তৃণমূল কিংবা বিজেপি! ফুটবলের এমনই মহিমা! আমি তিনটি বিশ্বকাপ কভার করেছি আগেই বলেছি। ইংল্যান্ড ও ভারতে ক্রিকেটের বিশ্বকাপও কভার করেছি। ভারতের সাধারণ নির্বাচন, বিধানসভার নির্বাচন, পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন কিংবা বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন কভার করেছি। কিন্তু স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, সবার মধ্যে সব ঘেকে উত্তেজক আর রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবলকে। শুধু যে এই প্রতিযোগিতার বৈভব অথবা বিত্ত এটার কারণ তা বলতে পারছি না। বিশ্বকাপ ফুটবল আসলে একটি অনুভূতি। কারও সঙ্গেই তার তুলনা চলে না।
এবার বিশ্বকাপে রেকর্ড সংখ্যক আট চল্লিশটি দল খেলবে। পাঁচ লক্ষের কম যাদের জন্যসংখ্যা সেই কেপ ভারদে কিংবা আইসল্যান্ডের মতো দল বিশ্বকাপ খেলবে। আর ১৪০ কোটি মানুষের দেশ আমাদের এই ভারতবর্ষ লেবেনচুষ মুখে দিয়ে সেই খেলা দেখবে! সেরা দর্শক হওয়ার যদি কোনও বিশ্বকাপ হয় তাতে আমাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না। এ কথা হলফ করে বলে দেওয়াই যায়।
এবারের বিশ্বকাল ফুটবলে আরও অভিনবত্ব আছে। এবার তিনটি দেশ সংগঠক হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। মেক্সিকো, কানাডা এবং আমেরিকা। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার আয়োজনে করা বিশ্বকাপ ফুটবল কভার করেছি। আজ সিওল তো কাল টোকিও করতে গিয়ে হিমসিম খেয়েছি। এবার তো আবার তিনটি দেশ। ১১ জুন মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ শুরু হবে। ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল। মেক্সিকোর তিনটি শহর মেক্সিকো সিটি, গুয়াডেলজেরা ও মন্টেক শহরে বিশ্বকাপের আসর বসবে। কানাডার টরেন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারে এই আসর বসবে। এবারে প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্দান্ত ভাবে করা হচ্ছে। সেমি অপারেটেড অফসাইড নির্ধারণের ব্যবস্থা যেমন থাকছে, তেমনই থাকছে উন্নত মানের ভিডিয়ো অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ‘ভার’। নির্বাচন কমিশনের রেফারিরা যতই অনৈতিক কাজ করুন অথবা করার চেষ্টা করুন বিশ্বকাপ ফুটবলে কারচুপির কোনও জায়গা নেই। নির্বাচন এবার দু’দফায় হচ্ছে বলে মেয়াদটা কম। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলার মেয়াদ কম নয়। এবার আট চল্লিশটি দল আছে বলে মেয়াদ একটু বেশি। এবার ৩৯ দিনে ১০৪টি ম্যাচ হওয়ার পর বিশ্ব নতুন চ্যাম্পিয়ন পাবে। এবার একটি দলের নান্দনিক ফুটবলের বড় অভাব অনুভূত হবে বিশ্বকাপে। ইতালি এবার প্রাথমিক পর্বের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। অর্থাৎ ইতালিকে এবার বিশ্বকাপে দেখা যাবে না। ১৯৯০ সালে ইতালি বিশ্বকাপ ফুটবল আমি কভার করেছি। রোমের রাজপথে ইতালির সাফল্যে একসঙ্গে মোটরের ভেঁপু বাজানোর আওয়াজ আমি শুনেছি, আবার আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর রোমকে আমি শোকে নিথর হতে দেখেছি। অজুরিদের (এই নামেই ইতালিতে জাতীয় দলকে ডাকা হয়) এই পরাজয়ের
পর ইতালিয়ানদের মনের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। ইতালির বদলে নতুন যে শক্তিকে বিশ্ব সমীহ করছে তা হল মরক্কো। আফ্রিকার এই দেশের কাউন্টার অ্যাট্যাক সমৃদ্ধ ফুটবলকে ভয় পাচ্ছে ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার সেরা দেশগুলিও। এছাড়াও নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে কানাডা এবং মালি। এবার ইতালির পাশাপাশি নেই চিলি ও নাইজেরিয়া। সালাস-এর দেশ এবং কানু-র দেশের অভাব এবার বিশ্বকাপে অনুভূত হবে।
এবার ভোটে যেমন অশুভ শক্তির সঙ্গে শুভর লড়াই, বিশ্বকাপেও তা। অক্টোপাস পল আর নেই, কিন্তু বিশ্বের অগ্রণী ফুটবল গণৎকাররা বলছেন, এবার চ্যাম্পিয়ন হবে স্পেন। রাজনৈতিক আর ফুটবল জ্যোতিষরা এখন নিজেদের গণনা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। এই ব্যস্ততা তাঁদের চলবে নির্বাচন আর বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ না হওয়া পর্যন্ত।