চিত্র: সংগৃহীত
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: গণতন্ত্রের ভিত্তি কয়েকটি মৌলিক অধিকারের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের মধ্যে ভোটাধিকার কেবল একটি সাংবিধানিক সুযোগ নয়, নাগরিক মর্যাদার অন্যতম প্রধান স্বীকৃতি। এই অধিকার সুরক্ষার দায়িত্ব যাঁদের উপর ন্যস্ত, তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাই আইনের পাশাপাশি সংবেদনশীলতা, দূরদর্শিতা এবং মানবিক বিবেচনার উপস্থিতি থাকা জরুরি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ চিহ্নিত করার নামে এসআইআর শুনানির যে অভিজ্ঞতা সামনে আসছে, তা ভোটাধিকারের সেই মর্যাদাকেই গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে (Voter Rights)।
নিয়মের খাতায় এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে যুক্তিসঙ্গত— ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা বজায় রাখা, ভুয়ো নাম বা দ্বৈত এন্ট্রি চিহ্নিত করা, নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে সেই নিয়ম যখন মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা, বয়স, অসুস্থতা কিংবা সামাজিক বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কার্যকর হয়, তখন তা সুরক্ষার বদলে নিপীড়নের রূপ নেয়। আজ এসআইআর শুনানি ঘিরে যে নাগরিক ভোগান্তির ছবি উঠে আসছে, তা প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক ব্যর্থতার কথাও স্পষ্ট করে বলছে।
রাজ্যের গ্রাম থেকে শহরতলি সর্বত্রই প্রায় একই চিত্র। ভোরের অন্ধকারে লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন আশি-নব্বই বছরের প্রবীণ নাগরিক। হাঁটার শক্তি নেই, চোখে ঝাপসা দৃষ্টি, কানে কম শোনা— তবু শুনানি কেন্দ্রে হাজিরা না দিলে ভোটার তালিকায় নাম নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা। অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পানীয় জল বা শৌচাগারের সুযোগও সীমিত। জীবনের অধিকাংশ সময় ভোট দিয়ে আসা মানুষটির কাছে এই অভিজ্ঞতা শুধু শারীরিক ক্লান্তির নয়, গভীর মানসিক অপমানেরও (Voter Rights)।
এই ভোগান্তির আর একটি করুণ দিক উঠে আসে সদ্য সন্তান প্রসব করা ও অন্তঃসত্ত্বাদে ক্ষেত্রে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাতৃত্বের এই সময় অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্রাম, পরিচর্যা ও মানসিক নিরাপত্তাই যেখানে প্রধান প্রয়োজন, সেখানে শুনানির নোটিশ হাতে পেয়ে অনেককে সেই পরামর্শ উপেক্ষা করতেই বাধ্য হতে হচ্ছে। কোলে নবজাতক নিয়ে, শরীরে অপারেশন-পরবর্তী যন্ত্রণা সত্ত্বেও হাজিরা না দিলে ‘সমস্যা হবে’— এই আশঙ্কাই তাঁদের ঠেলে দিচ্ছে ভিড়ঠাসা কেন্দ্রে। অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, ভিড়ের ধাক্কা, শৌচাগারের অপ্রতুলতা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
গুরুতর অসুস্থ নাগরিকদের অবস্থাও আলাদা নয়। ডায়ালিসিসে যাতায়াতকারী রোগী, ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষ, হৃদরোগ বা শ্বাসকষ্টে ভোগা প্রবীণদের অনেককেই চিকিৎসার ফাঁকে ফাঁকে শুনানি কেন্দ্রে পৌঁছতে হচ্ছে। চিকিৎসকের শংসাপত্র বা হাসপাতালের নথি থাকা সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থার কোনও স্পষ্ট নির্দেশিকা নেই। ফলে ছাড় পাওয়া বা না-পাওয়া নির্ভর করছে স্থানীয় স্তরের কর্মীদের ব্যক্তিগত বিবেচনার উপর। এই অনিশ্চয়তাই এক ধরনের মানসিক নিপীড়নের জন্ম দিচ্ছে (Voter Rights)।
সম্প্রতি ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ শব্দবন্ধটি সাধারণ মানুষের জীবনে এক অচেনা আতঙ্ক হিসেবে ঢুকে পড়েছে। জন্মতারিখে সামান্য অমিল, নামের বানানে পার্থক্য, ঠিকানার পুরনো ও নতুন রূপ— এই সব কারণেই বহু ক্ষেত্রে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। অথচ ভারতের মতো দেশে নথিগত এই ধরনের অসামঞ্জস্য অস্বাভাবিক নয়। অশিক্ষা, পুরনো কাগজপত্রের সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান সব মিলিয়ে এই অমিলগুলিকে প্রশাসনিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত ছিল। তার বদলে সেগুলিকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির। যদি আগামভাবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও বিশেষ পরিস্থিতির ভিত্তিতে নাগরিকদের শ্রেণিবিন্যাস করা হতো, তবে এই ভোগান্তির বড় অংশ এড়ানো যেত। আশি বছরের ঊর্ধ্ব নাগরিকদের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় যাচাই বা বাড়িতে শুনানি, অন্তঃসত্ত্বা ও সদ্য প্রসব করা মহিলাদের জন্য সময়সীমা শিথিলকরণ বা বিকল্প ব্যবস্থা, গুরুতর অসুস্থদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নথির ভিত্তিতে ছাড় এই সবই প্রশাসনিকভাবে সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা অনুপস্থিত (Voter Rights)।
তথ্যের অস্পষ্টতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই কী কী নথি আনতে হবে, কতক্ষণ সময় লাগতে পারে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে কী সুবিধা পাওয়া যাবে। ফলে মানুষকে একাধিকবার শুনানি কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। প্রতিবার যাতায়াত মানেই অর্থনৈতিক খরচ, শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক চাপ যা দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ক্ষেত্রে আরও গভীর ক্ষত তৈরি করছে।
এই ভোগান্তির সামাজিক অভিঘাতও কম নয়। যখন প্রবীণ নাগরিক অপমানিত বোধ করেন, মাতৃত্বের সময় একজন নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন তার প্রভাব ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। মানুষের মনে জন্ম নেয় এক মৌলিক প্রশ্ন— রাষ্ট্র কি সত্যিই আমাদের পাশে আছে, না কি কেবল কাগজের নিয়মই তার একমাত্র ধর্ম?
প্রশাসনিক কর্মীদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম প্রয়োগের পাশাপাশি সহানুভূতির ভাষা বোঝার প্রশিক্ষণ না থাকলে কঠোরতা অনিবার্যভাবে নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ের কর্মীরাই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছেন ক্ষুব্ধ ও অসহায় নাগরিকদের। তাঁদের হাতে স্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকলে সিদ্ধান্তের ভার পড়ছে ব্যক্তিগত বিবেচনার উপর— যা কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্যকর নয় (Voter Rights)।
প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার এই সংকট অনেকটাই লাঘব করতে পারত। অনলাইন প্রাক-যাচাই, নির্দিষ্ট সময়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে শুনানি এই সবই আজ বাস্তবসম্মত বিকল্প। অথচ মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ সীমিত। প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব ও উদাসীনতা এই সম্ভাবনাগুলিকে বাস্তবে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি উঠে আসে, তা মানসিকতার। ভোটার তালিকা কি কেবল একটি ডেটাবেস, নাকি এটি জীবন্ত মানুষের নথি? প্রতিটি নামের পিছনে রয়েছে একটি জীবন, একটি ইতিহাস, একটি শরীরের সীমা ও একটি মনের অনুভূতি। যদি এই সত্য স্বীকার না করা হয়, তবে গণতন্ত্র কেবল নিয়মের কাঠামোয় বন্দি হয়ে পড়বে। তার মানবিক আত্মা হারিয়ে যাবে (Voter Rights)।
এসআইআর শুনানি প্রক্রিয়ার বর্তমান অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি সহমর্মিতার ঘাটতিও স্পষ্ট। এই ঘাটতি স্বীকার করে দ্রুত সংশোধনের পথে না হাঁটলে ভবিষ্যতে নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের সঙ্কট আরও গভীর হবে। গণতন্ত্র কেবল আইন মানার প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের উপর আস্থার সম্পর্ক।
ভোটার তালিকা যতই নিখুঁত হোক, যদি সেই প্রক্রিয়ায় নাগরিক অপমানিত হন, অসুস্থ হন বা ভয় ও অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তবে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আজ সময় এসেছে নিয়ম ও মানবিকতার মধ্যে নতুন করে ভারসাম্য স্থাপনের। কারণ গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত বাঁচে সহমর্মিতায়— কাগজের কঠোরতায় নয় (Voter Rights)।