ad
ad

Breaking News

Venezuela Crisis

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের চেষ্টা, লক্ষ্য কি মাদক-রোধ না তেল?

সবাই অতিষ্ট, বিকল্পের সন্ধানে নেতৃত্ব দিয়ে কেউ সেভাবে এগিয়ে আসেনি। সাহস দেখাচ্ছে  তথাকথিত কম শক্তিধর দেশগুলো।

Venezuela Crisis: US Military Pressure, Drug Trade Allegations

চিত্র: সংগৃহীত

রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: অবৈধ মাদকের ওভারডোজে প্রবাহ মার্কিনী জীবন ও সংস্কৃতি এক চরম অস্থিরতার মধ্যে। আমেরিকা তার এই সঙ্কটে ভেনেজুয়েলাকে দায়ী করছে। বলছে, ওখান থেকেই নাকি ঢুকছে অবৈধ মাদক, ফেন্টানিল ও কোকেন। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলাকে সবক শেখাতে চায়। তাই পূর্ণাঙ্গ সামরিক শক্তি নিয়ে হাজির ভেনেজুয়েলার দুয়ারে। শুরু হয়েছে ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’ নামক এক দুর্ধর্ষ সামরিক ও নজরদারি অভিযান (Venezuela Crisis)।

ভেনেজুয়েলার নিকটবর্তী মার্কিন শাসিত অঞ্চল পুয়ের্তো রিকোর রুজভেল্ট রোডস নৌ ঘাঁটি পুনরায় সক্রিয় হয়েছে যুদ্ধের ফরোয়ার্ড অপারেটিং বেস হিসাবে। ঘাঁটিটিতে এসেছে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বিমানবাহক, এফ ৩৫বি ফাইটার জেট এবং এসি ১৩৯ জে ঘোস্টরাইডার গানশিপ, সেই সঙ্গে হাজার হাজার মার্কিন সেনা। বি ৫২ স্ট্রাটোফোর্ট্রেস বিমান নিয়ে ‘বোমারু হামলা ডেমো’ চলছে। নজরদারিতে রয়েছে রোবোটিক এবং মনুষ্যবিহীন বিমান ও জাহাজ। ১৯৬২ সালে কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছিল, বর্তমান সামরিক আয়োজন তার থেকেও বেশি বলে মনে হচ্ছে অনেকেরই।

ভেনেজুয়েলার আকাশসীমাকে ‘পুরোপুরি বন্ধ’ ঘোষণা হয়েছে। সন্দেহভাজন জাহাজের উপর আক্রমণ চলছে, মৃত শতাধিক। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরো চুপ চাপ নেই। আমেরিকার শান্তি প্রস্তাব খারিজ করেছেন, ‘দাসের শান্তি’ কথা বলে। দেশজুড়ে ২ লাখ ভেনেজুয়েলার সেনার ‘ব্যাপক সমাবেশ’ শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ সামরিক এবং বৃহত্তম অর্থনীতি। অন্য দিকে, ভেনেজুয়েলা আর্থিক ও সামরিক শক্তিতে শুধু অনেক পিছিয়ে নয়, এই মুহূর্তে মারাত্মক অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন। তবু কেন এই মার্কিনী যুদ্ধের হুমকি, তা বুঝতেই আজকের এই আলোচনা (Venezuela Crisis)।

অবৈধ  মাদক কারবার ও ভেনেজুয়েলা

আজকের বিশ্বে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সর্বাধিক ব্যবহৃত অবৈধ মাদকদ্রব্য হল গাঁজা বা মারিজুয়ানা। এরপরেই আসে অবৈধভাবে উত্পাদিত ফেন্টানিল বা সিন্থেটিক ওপিওয়েডস। এটা মরফিনের চেয়ে পঞ্চাশ থেকে একশো গুণ বেশি শক্তিশালী। ব্যবহারকারীর অজান্তে প্রায়শই হেরোইন, কোকেন এবং জাল প্রেসক্রিপশন ওষুধের সঙ্গে এই মাদক মিশ্রিত হয়। তাই যে কোনও মাদক সেবনে থাকে মারাত্মক ওভারডোজের ঝুঁকি। এতকাল ব্যথা উপশমকারী প্রেসক্রিপশন ড্রাগস যেমন অক্সিকোডোন, হাইড্রোকোডোন এবং মরফিন প্রভৃতি ওপিওয়েড ব্যবহৃত হত মাদক নেশায়। এই নির্দিষ্ট ওষুধগুলির অপব্যবহার সমানে চললেও, অবৈধ ফেন্টানিলের ব্যবহার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

প্রাথমিকভাবে মেক্সিকোতেই অবৈধ ফেন্টানিলের উত্পাদন হয় বহুজাতিক অপরাধী সংগঠনগুলির সৌজন্যে। রাসায়নিক কাঁচামাল আসে মূলত চিন এবং কিছুটা ভারত থেকে। মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেল, বিশেষত সিনালোয়া কার্টেল এবং জালিসকো নিউ জেনারেশন কার্টেল মার্কিন বাজারে প্রবেশকারী অবৈধ ফেন্টানিলের প্রাথমিক উত্পাদক। তারা এশিয়া থেকে পূর্বসূরি রাসায়নিক এবং পিল প্রেসিং সরঞ্জাম আমদানি করে, গোপন ল্যাবগুলিতে চূড়ান্ত পণ্যটি সংশ্লেষণ করে এবং তারপরে বৈধ বন্দর, না হলে চোরাচালান পথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। ব্যথানাশক এবং চেতনানাশক ওষুধ উত্পাদনে ফার্মাসিউটিক্যাল-গ্রেড ফেন্টানিল বিভিন্ন দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা বৈধভাবেই উত্পাদন করে। বেলজিয়াম এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফেন্টানিলের প্রধান আইনি উত্পাদকারী (Venezuela Crisis)। 

ভেনেজুয়েলা উল্লেখযোগ্য ভাবে অবৈধ ফেন্টানিল উৎপাদন করে না। অবৈধভাবে উত্পাদিত ফেন্টানিল প্রায়শই বৈধ প্রেসক্রিপশন ওষুধের অনুরূপ পাউডার, ট্যাবলেটের মতনই তৈরি করা হয়। অনুনাসিক স্প্রে, চোখের ড্রপ বা ব্লটার পেপারে তরল হিসাবেও পাওয়া যায়। খুব অল্প পরিমাণে ফেন্টানিল, এমনকি লবণের দানার আকারের দুই মিলিগ্রাম যথেষ্ট মারাত্মক। ফেন্টানিল সহজে শনাক্তকরণ করা যায় না, বিশেষ টেস্ট স্ট্রিপ প্রয়োজন। তাই ভেনেজুয়েলা থেকে আমেরিকায় সামুদ্রিক রুটে ফেন্টানিল পাচার ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। স্থল সীমান্তই এই মাদক পাচারের আদর্শ রুট। ভেনেজুয়েলা থেকে আমেরিকায় ফেন্টানিল আসছে এমন দাবির সমর্থনে তথ্য নেই। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে বৈধ চিকিত্সা সরবরাহ থেকে অল্প পরিমাণে সরিয়ে ফেন্টানিল উত্পাদন হয়। বড় আকারের কোনও গোপন উত্পাদন কেন্দ্র আজও শনাক্ত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার অপরাধী সংগঠন ট্রেন দে আরাগুয়া এবং কারটেল দে লস সোলেসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন (এফটিও) হিসাবে চিহ্নিত করেছে। আমেরিকার আইনে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা যায়। ভেনেজুয়েলার যে দুটি সংগঠনকে মাদক পাচারের জন্য আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন বলা হল, তারা আসলে বহুমুখী অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত। মানব পাচার, অপহরণ, জুলুম, মাদক ও অস্ত্র পাচার এবং চুক্তি হত্যা সবই করে থাকে ছোট পর্যায়ে (Venezuela Crisis)।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী মাদক চোরাচালান সংস্থাগুলি মূলত মেক্সিকান কার্টেল। মাদক চোরাচালানে এদের বিশ্বব্যাপী আধিপত্য রয়েছে। শীর্ষ মাদক কার্টেলের মধ্যে পরে সিনালোয়া কার্টেল, জালিসকো নিউ জেনারেশন কার্টেল, গালফ কার্টেল, ইতালির এনড্রাঙ্গেটা, লস জেটাস। ভেনেজুয়েলার অপরাধ সংস্থাগুলি এদের কাছে চুনোপুঁটি। ইসলামিক স্টেট (আইএস) বা আল-কায়েদা বা তাদের সহযোগীদের সন্ত্রাস কাণ্ডের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সন্ত্রাসীদের কোনও তুলনা চলে না। ট্রেন দে আরাগুয়া (টিডিএ) রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘সন্ত্রাসী কার্যকলাপ’ করে না।

এরা বিভিন্ন ধরনের নৃশংস, আন্তঃদেশীয় অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত। টিডিএ সদস্যরা প্রায়শই ভেনেজুয়েলার অভিবাসী মহিলাদের দক্ষিণ আমেরিকা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক যৌন কর্মে যেতে বাধ্য করে, ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকি দিয়ে টাকা তোলে। কোকেন, এমডিএমএ এবং ‘টুসি’ (গোলাপী কোকেন) সহ বিভিন্ন অবৈধ মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত জুড়ে অস্ত্র পাচার এদের প্রধান কাজ। টোকোরন কারাগার থেকে পালানো কয়েদি হেক্টর রাস্তেনফোর্ড গুয়েরেরো ফ্লোরেস এই গ্যাংটির প্রতিষ্টাতা। ওনার স্ত্রী রিওস গোমেজ মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ‘অর্থ পাচার, সন্ত্রাসবাদ এবং সন্ত্রাসী অর্থায়নের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত’ এবং ট্রেন ডি আরাগুয়ার অবৈধ মুনাফায় সমৃদ্ধ তিনি (Venezuela Crisis)। 

চলতি বছরের নভেম্বরে মার্কিন সরকার কার্টেল দে লস সোলসকে ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদে’ লিপ্ত বিদেশি সন্ত্রাসী সংস্থা (এফটিও) হিসাবে কলঙ্কযুক্ত করেছে। বোমা হামলা বা গণ শুটিংয়ের মতো কোনও নির্দিষ্ট ‘সন্ত্রাসী হামলায়’ কার্টেল ডি লস সোলসের নাম নেই। তবুও মার্কিন বিচারে এরা ‘দাগী সন্ত্রাসী’, কেন না কলম্বিয়ার গেরিলা গ্রুপ এফএআরসি-এর সঙ্গে এদের যোগাযোগ আছে। ভেনেজুয়েলার সরকার একে সন্ত্রাসবাদী মনে করে না। ইনসাইট ক্রাইমের মতো থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ‘কার্টেল দে লস সোলস’ একটি সামরিক বাহিনীর মদতপুষ্ট বেসরকারি সংস্থা যারা দুর্নীতি ও অপরাধের মধ্যে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করতে চায়।

সরকার এদের ব্যপারে যথেষ্ট নীরব। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণে মাদক চোরাচালান এদের অর্থায়ন করে। আমেরিকার মতে, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস অবৈধ মাদক ব্যবসার বড় সুবিধাভোগী। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ফ্লোরেসের দুই ভাগ্নে, এফরাইন আন্তোনিও ক্যাম্পো ফ্লোরেস এবং ফ্রান্সিসকো ফ্লোরেস ডি ফ্রেইটাসকে হাইতিতে মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) এক স্টিং অপারেশনে গ্রেফতার করে। তাদের কাছে প্রায় ৮০০ কিলোগ্রাম কোকেন ছিল বলে অভিযোগ। পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এদের কারাদণ্ড দেওয়া হয় (Venezuela Crisis)।

ফ্লোরেস সরাসরি কোনও ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত না হলেও, ভেনেজুয়েলা সরকারের মদতেই মাদক পাচার হচ্ছে বলেই আমেরিকার ধারণা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি, মাদক পাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ফ্লোরেস এবং মাদুরো প্রশাসনের আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ভেনেজুয়েলার সরকার এই গ্রেফতারি ও নিষেধাজ্ঞাকে ‘সাম্রাজ্যবাদী হামলা’ এবং সরকারকে কলঙ্কিত করতেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মার্কিন প্রয়াস বলে অভিহিত করেছে। 

ভেনেজুয়েলে মার্কিন অভিযানের আসল লক্ষ্য

আফিম এবং এর উদ্ভূত হেরোইনের উত্পাদন হয় মূলত আফগানিস্তান আর ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চল অর্থাৎ মায়ানমার লাওস এবং থাইল্যান্ডের কিছু অংশে। কোকেন উত্পাদন প্রায় একচেটিয়াভাবে হয় দক্ষিণ আমেরিকায় কলম্বিয়া, পেরু আর বলিভিয়ায়। সিন্থেটিক ড্রাগ, যেমন ফেন্টানিল, মেথামফেটামিন বিশ্বব্যাপী গোপন পরীক্ষাগারগুলিতে উত্পাদিত হয় প্রাথমিকভাবে চিন ও ভারত থেকে প্রাপ্ত পূর্বসূরি রাসায়নিক ব্যবহার করে। মায়ানমার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল মেথামফেটামিন উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। অবৈধ মাদক চোরাচালানের হোতা মেক্সিকো। ভেনেজুয়েলা পিকচারেই নেই। তবু তাদের মাদক সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করা, যুদ্ধের ভয় দেখানো খুবই রহস্যজনক। আমেরিকার অভিসন্ধি পরিষ্কার ধরা পড়ে, যখন তারা নিকোলাস মাদুরোকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে চারশ কোটি টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করে। নারকোটিক্স রিওয়ার্ডস প্রোগ্রামের বাজেট থেকেই এই পুরস্কার। কিছু দিন আগে পুরস্কার মুল্য ছিল ২৫ মিলিয়ন ডলার, ৭ আগস্ট দ্বিগুণ করা হয় পুরস্কারের অর্থ (Venezuela Crisis)।

নিকোলাস মাদুরো নেতৃত্বাধীন ভেনেজুয়েলা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে, বা মাদুরোকে নির্বাসনে বাধ্য করার জন্য চাপ দিতেই এই মার্কিন ‘মাদক যুদ্ধ অভিযান’। স্ট্রাইক গ্রুপ সহ বিমানবাহী রণতরী একটি স্ট্যান্ডার্ড মাদকদ্রব্য বিরোধী মিশনের জন্য অত্যধিক, এটা সবাই মানবেন। ভেনেজুয়েলার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত তার তেল মজুদের নিয়ন্ত্রণ দখল নিতেই আমেরিকার এই প্রয়াস।

ভেনেজুয়েলার তেল ভান্ডার

বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদ আছে ভেনেজুয়েলায়। ওদের সঞ্চিত তেলের পরিমাণ তিনশ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। তেল মজুতের হিসেবে সৌদি আরবকে ছাড়িয়ে গেছে ওরা। এই তেল সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারলে ওরা বিশ্বের ধনী দেশগুলির অন্যতম হতো, কিন্তু হয়নি। ভেনেজুয়েলাকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদ থাকলেও তার প্রতিদিনের উত্পাদন মাত্র সাড়ে সাত লক্ষ ব্যারেল, অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন হয়।

বোঝাই যাচ্ছে, বার্ষিক নিষ্কাশনের হার মাত্র ০.০৯ শতাংশ। এইভাবে নিষ্কাশন হলে ভেনেজুয়েলা হাজার বছর চালিয়ে যাবে সঞ্চিত তেল নিয়ে কিন্তু প্রগতি সমৃদ্ধি দুরাশা। কম নিষ্কাশন অবশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে দেশের প্রযুক্তি, সম্পদ পরিচালন ব্যবস্থা সঠিক নয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘস্থায়ী অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের অভাব, ক্রমাগত দক্ষ তেল শ্রমিকদের ব্রেন ড্রেন তেলের মজুদের একটি ভগ্নাংশ উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৪ 

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় ২৮ জুলাই, ২০২৪। এই নির্বাচনে আমেরিকা প্রধান বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুটিয়া এবং বিরোধী জোট, পিইউডিকে মার্কিন স্বার্থের অনুপন্থী বা সহায়ক মনে করে। গঞ্জালেজ একজন অবসরপ্রাপ্ত পেশাদার কূটনীতিক যিনি পূর্বে ওয়াশিংটন ডিসিতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গে উল্লেখযোগ্য যোগাযোগ রয়েছে। নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে সরাতেই তিনিই আমেরিকার প্রথম পছন্দ। জাতীয় নির্বাচনী কাউন্সিল (সিএনই) প্রায় ৫১.৯৫ শতাংশ ভোট পেয়ে বর্তমান রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করে। বিরোধীরা বলে ভোট গননায় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করে। মার্কিন সরকার গঞ্জালেজকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে স্বীকৃতি দেয় (Venezuela Crisis)।

ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তার আহ্বানকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছে। মাদুরো সরকার গঞ্জালেজকে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ মার্কিন বাহিনী দ্বারা পরিচালিত এবং অর্থায়নে সমৃদ্ধ বলে মনে করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এডমুন্ডো গঞ্জালেজকে বিজয়ী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ভোটের নিরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া, চিন, ইরান এবং কিউবার মতো দেশগুলি অবশ্য মাদুরোর সঙ্গেই রয়েছে।

সিএনই’র ঘোষণার পরপরই ভেনেজুয়েলা জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মাদুরো প্রশাসন ‘অপারেশন তুন তুন’ নামক কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে বিক্ষোভ দমন করে। নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও আসে বিস্তর। এডমুন্ডো গঞ্জালেজ স্প্যানিশ দূতাবাসে আশ্রয় চায় এবং পরে স্পেনে পালিয়ে যায়। ভেনেজুয়েলা সরকার গঞ্জালেজের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ১০ জানুয়ারি, ২০২৫ তৃতীয় মেয়াদে শপথ নেন মাদুরো ।  

নিকোলাস মাদুরো নিয়ে ভারতের অবস্থান

আমেরিকা বা পশ্চিমী দেশের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিকোলাস মাদুরো সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ভেনেজুয়েলার সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কারাকাস এবং নয়াদিল্লি উভয় দেশেই আবাসিক দূতাবাস রয়েছে এবং উভয় দেশ রাষ্ট্রদূত প্রেরণ এবং উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় জড়িত রয়েছে। ভারতের নীতি নিরপেক্ষতা এবং অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। ২০১৮ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ২০১৯ সালের সংকটের সময়, যখন অনেক পশ্চিমী দেশ অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসাবে বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদোকে সমর্থন করেছিল, তখন ভারত এই প্রচেষ্টায় যোগ দিতে অস্বীকার করে। ভেনেজুয়েলার জনগণের সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান আসবে বলে ভারত জানিয়েছিল। বিতর্কিত জুলাই ২০২৪ এর নির্বাচনের পরে, ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ এর প্রস্তাব অনুযায়ী বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুটিয়াকে বিজয়ী হিসাবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে।

ভারত এবং ভেনিজুয়েলার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য মোটামুটি ভাবে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল আমদানি কেন্দ্রিক। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বাণিজ্যের পরিমাণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অক্টোবর ২০২৩ এবং এপ্রিল ২০২৪ এর মধ্যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ সহ ভারতীয় শোধনাগারগুলি উল্লেখযোগ্য আমদানি পুনরায় শুরু করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বাণিজ্য থমকে যায়। ভেনেজুয়েলায় ভারতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য, যন্ত্রপাতি এবং টেক্সটাইল যায় (Venezuela Crisis)।

ভেনেজুয়েলার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক সঙ্কটের কারণে ভারতের ভেনেজুয়েলার বাজার সংকুচিত হয়েছে। ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের ভোক্তা এবং চাহিদার ৮৫ শতাংশ এরও বেশি আমদানি করতে হয়। তাই সুলভে অপরিশোধিত তেলকে অগ্রাধিকার দিয়ে শক্তি নিরাপত্তা নীতির মাধ্যমে ভারতের নিরন্তর যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম শোধন ক্ষমতার অধিকারী এবং পরিশোধিত পেট্রোপণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য রপ্তানিকারক। তাই ভারত ছুটছে সারা বিশ্বে অপরিশোধিত তেল কিনতে। ভেনেজুয়েলার তেল ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কোনও অবস্থাতে ভারত সে দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লংঘন সমর্থন করে না।

কে এই নিকলাস মাদুরো?

ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলার (পিএসইউভি) নেতা, নিকোলাস মাদুরো ভেনেজুয়েলার তৃতীয় মেয়াদের রাষ্ট্রপতি। সামরিক ও বিচার বিভাগসহ ভেনেজুয়েলার সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মাদুরোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। মাদুরো কারাকাস মেট্রো বাসের চালক এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তিনি হুগো শ্যাভেজ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক আন্দোলন এমবিআর-২০০ এর পদমর্যাদার মধ্য দিয়ে উঠে আসেন। ২০১৩ সালের মার্চে শ্যাভেজের মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে জাতীয় পরিষদের সভাপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা যে আমেরিকার আজ্ঞাবাহক এবং আমেরিকার নজর যে ভেনেজুয়েলার সম্পদের উপর তা মাদুরো দেশের মানুষকে বোঝাতে পেরেছেন। অবশ্য এই কাজের অনেকটাই সেরে ফেলেছিলেন তার গুরু প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ। গুরু-শিষ্য উভয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং নব্য উদারনীতিবাদ এবং লেসেজ-ফেয়ার পুঁজিবাদের সোচ্চার বিরোধী। ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এক বিখ্যাত বক্তৃতায়, গুরু শ্যাভেজ মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশকে ‘শয়তান’ বলেছিলেন। তাঁর বক্তৃতার আগের দিন বুশের ভাষণ থাকায় তিনি রূপক ছলে বলেছিলেন মঞ্চ ‘এখনও সালফারের গন্ধযুক্ত’।

তিনি ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছিলেন এবং যুদ্ধকে ‘সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের লড়াই’ আখ্যা দিয়েছিলেন। ল্যাটিন আমেরিকার বামপন্থী নেতাদের একত্র করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো এবং বলিভিয়ার ইভো মোরালেস প্রভৃতি মার্কিন বিরোধী বামপন্থী নেতাদের নিয়ে ল্যাটিন আমেরিকায় ‘গোলাপী জোয়ারের’ প্রধান উদ্যোক্তা। শ্যাভেজ লিবিয়া ও ইরানের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত দেশগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন (Venezuela Crisis)।

মাদুরো রাশিয়া, চিন, কিউবা, ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়েছেন। রাশিয়া জাতিসংঘে কূটনৈতিক সমর্থন এবং ভেনেজুয়েলার তেল প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। চলছে যৌথ সামরিক মহড়া। মার্কিন প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য হিসাবে ভেনেজুয়েলা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাশিয়ায় তৈরী সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। অস্ত্রশস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৌশলগত সামরিক সহায়তা আসছে রাশিয়া থেকে। গত দুই দশকে ভেনেজুয়েলা রাশিয়া থেকে এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমান, টি-৭২ ট্যাঙ্ক এবং এস-৩০০, বুক, প্যান্টসির-এস ১ মতন আকাশ সুরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে, রাশিয়া এবং ভেনেজুয়েলা একটি বিস্তৃত দশ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। রাশিয়ার কালাশনিকভ রাইফেল ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ভেনেজুয়েলায় তৈরি হচ্ছে যৌথ অংশীদারিত্বে।

চিন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা এবং ‘তেলের বিনিময়ে ঋণ’ দিচ্ছে তারা। ইরান ভেনেজুয়েলার শোধনাগার মেরামতের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সামরিক প্রযুক্তি এবং সম্পদ আহরণে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করছে। দীর্ঘদিনের মতাদর্শগত ও মিত্র কিউবা ভেনেজুয়েলায় হাজার হাজার গোয়েন্দা ও সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে অভ্যুত্থান থেকে মাদুরোর শাসনকে রক্ষা করতে। আমেরিকা যে ভেনেজুয়েলার জনগণের সবচেয়ে বড় শত্রু মাদুরো তা দেশের মানুষের কাছে রাখতে পেরেছেন।

সমাপ্তি মন্তব্য

জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি এবং আত্মরক্ষা ছাড়া অন্য দেশে শক্তি প্রয়োগ করা যায় না। তবে আন্তর্জাতিক রীতি নীতির তোয়াক্কা করে না। আর্থিক প্রাচুর্য আর সামরিক শক্তিকে ভর করে, আমেরিকা দুনিয়া জুড়ে দাদাগিরি চালাচ্ছে। অনেক বড় বড় দেশ আত্মসমর্পণ করলেও, ভেনেজুয়েলা করেনি। মাদুরোর সঙ্গে আছে জনতার বড় অংশ, আছে রাশিয়া, চিনের মতো শক্তি। ভারত ভেনেজুয়েলার প্রত্যক্ষ সমর্থনে না থাকলেও, মার্কিন আগ্রাসনের সমর্থক নয়। ভেনেজুয়েলা একা নয়। ট্রাম্প শাসনে আজ অনেক দেশই আক্রান্ত, হুমকির খাঁড়া ঝুলছে অনেক দেশের ওপর। সবাই অতিষ্ট, বিকল্পের সন্ধানে নেতৃত্ব দিয়ে কেউ সেভাবে এগিয়ে আসেনি। সাহস দেখাচ্ছে  তথাকথিত কম শক্তিধর দেশগুলো (Venezuela Crisis)।