চিত্র: সংগৃহীত
রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেনের ক্রিমিয়া আক্রমণের মাধ্যমে। ২০২২ সালের আর এক অভিশপ্ত ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। রাশিয়ার দুই লাখ সেনা গিয়েছিল ইউক্রেন রাজধানী কিয়েভে দখলে। দুই অসম শক্তির লড়াই কয়েক দিনেই শেষ হওয়ার কথা, কিন্তু তা আজও শেষ হয়নি। তবে এখন ইউক্রেনের (Ukraine War) এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে।
[আরও পড়ুন: মঙ্গলে কেমন কাটবে আপনার সময়? জেনে নেওয়া যাক আজকের রাশিফল]
বাইডেন জমানা শেষে আমেরিকার সাহায্য বন্ধ হলে ইউক্রেন আর যুদ্ধ বেশিদিন টানতে পারবে না, এইরকমই ভাবা গিয়েছিল। তবে রাশিয়া যা নেওয়ার নিয়ে নিয়েছে। সেখানে গণভোটের মাধ্যমে আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের সাধ্য নেই, সেই সব এলাকা পুনর্দখলের। রাশিয়ার ভূখণ্ডে বিক্ষিপ্ত হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেন, রাশিয়া মাঝে মধ্যে জবাব দিচ্ছে, স্রেফ ভয় দেখাতে।
নতুন এলাকা দখলের ইচ্ছে নেই, চাইছে ইউক্রেন যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুক। ট্রাম্পও পুতিনের এই চিন্তায় সহমত। তাই আলাস্কায় বৈঠক করতে অসুবিধে হয়নি। দুই দেশের মূল লক্ষ্য ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বোঝানো সেই বিখ্যাত প্রবচন, ‘সর্বনাশে সমুৎপন্নে অর্ধং ত্যজতি পণ্ডিতঃ’ (যখন চরম সর্বনাশ আসন্ন, তখন জ্ঞানী ব্যক্তি অর্ধেক ত্যাগ করতেও দ্বিধা করেন না)। মেনে নিলে জেলেনস্কিকে দেশের মানুষ ছাড়বে না। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের রাশিয়ায় মিশে যাওয়া ছাড়া আর পথ থাকবে না।
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের সর্ববৃহৎ খনি ও শিল্প অঞ্চল ডনবাস রাশিয়ার দখলে। লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক এই দুই প্রদেশ নিয়েই ডনবাস। শিল্পের প্রয়োজনীয় প্রায় সব খনিজ দ্রব্য ইউক্রেনে (Ukraine War) মাটির নিচে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য ব্যাটারি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয় গ্রাফাইট। প্রায় ১৯ মিলিয়ন টন গ্রাফাইটের প্রমাণিত মজুত রয়েছে ইউক্রেনে। বিমান থেকে বিদ্যুৎ– সর্বত্রই কাজে লাগা টাইটানিয়ামের পর্যাপ্ত মজুদ আছে ইউক্রেনে। এটা ইউরোপের সরবরাহের ৭ শতাংশ। বর্তমান ব্যাটারির মূল উপাদান, লিথিয়াম।
সমস্ত ইউরোপীয় আমানতের এক তৃতীয়াংশ আছে ইউক্রেনে। এছাড়া আছে, পারমাণবিক অস্ত্র এবং চুল্লির জন্য ব্যবহৃত বেরিলিয়াম এবং ইউরেনিয়াম। তামা, সিসা, দস্তা, রৌপ্য, নিকেল, কোবাল্ট এবং ম্যাঙ্গানিজের মজুত আছে যথেষ্ট। অস্ত্র, বায়ু টারবাইন, ইলেকট্রনিক্স পণ্যে ব্যবহৃত সতেরোটি রাসায়নিক উপাদানের বিরল পৃথিবী উপাদান (আরইই) আছে প্রভূত পরিমাণে। ইউক্রেনের আরও দুটি অঞ্চল-জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন রাশিয়া দখল নিয়েছে ক্রিমিয়ার সঙ্গে ডনবাসের সংযোগ পথ রাখতে।
তিন বছর যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন আলাস্কায় বসলেন শান্তির আলোচনায়। বেরিং প্রণালীর এপার রাশিয়া, ওপার আলাস্কা, মাঝে ডায়োমেড দ্বীপপুঞ্জ। রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে আলাস্কার মূল ভূখণ্ডের দূরত্ব প্রায় ৮৮.৫ কিলোমিটার। প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কিনেছিল। ১৯৫৯ সালে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে হয়।
আলাস্কার এই রাশিয়ান ঐতিহাসিক যোগাযোগের কারণে, পুতিন আলাস্কায় বৈঠকে রাজি হতে পারেন। তবে বড় কারণ, পুতিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ইউক্রেনের শিশুদের অবৈধভাবে নির্বাসনের জন্য আইসিসি বিচারে পুতিন যুদ্ধাপরাধী। পুতিন তাদের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়লে আইসিসি-র ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্র তাকে গ্রেফতার করে আদালতে হস্তান্তর করতে বাধ্য।
বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশ তাকে এড়িয়ে চলেছিল। তার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ছিল মূলত উত্তর কোরিয়া এবং বেলারুশের মতো বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে। ভারত আইসিসি সদস্য নয়। বলা যেতেই পারে গ্রেফতারি পরোয়ানা এড়াতেই এত সহজ পথে পুতিনের আমেরিকার ভূখণ্ডে প্রবেশ। এর আগে ২০২১ সালের মার্চ মাসে চিনা প্রতিপক্ষের সঙ্গে জো বাইডেনের সাক্ষাৎ হয়েছিল এই আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে।
আলাস্কার শীর্ষ সম্মেলন পুতিনের ব্যক্তিগত বিজয় তো বটেই। যে মানুষটা কিছুদিন আগেও আমেরিকার কাছে ছিলেন ব্রাত্য, তিনি পেলেন জয়েন্ট বেস এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসনের রানওয়ে জুড়ে লাল গালিচায় অভিবাদন স্বয়ং রাষ্ট্রপতির কাছে। সঙ্গে জুটেছে সাঁজোয়া লিমুজিনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সফর। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কিছুটা বুঝতে পেরেছেন বিশ্বের জনমত কোথায়। আলাস্কায় অবতরণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে শুনতে হয়, সাংবাদিকের চিৎকার করা প্রশ্ন, ‘আপনি কি বেসামরিক মানুষ হত্যা বন্ধ করবেন? ২৫ বছরের শাসন আমলে পুতিন নিজ দেশে গণমাধ্যমকে ধ্বংস করেছেন, সরকারের সামান্যতম সমালোচকও ঘেঁষতে পারে না পুতিনের পাশে।
আলাস্কায় ফটো সেশনের সময় রাশিয়ান ভাষায় প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করতে প্রস্তুত কিনা। রহস্যময় হাসি ছাড়া কোনও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া আসেনি পুতিনের কাছ থেকে। সম্মেলন শেষে পুতিন ও ট্রাম্প বিবৃতি দিয়েছেন, সাংবাদিকদের কোনও প্রশ্নের জবাব দেননি। কেবল স্মরণ করেছেন রাশিয়ার অঞ্চল হিসাবে আলাস্কার অতীতের ইতিহাস, সঙ্গে ট্রাম্পের প্রশংসা। যুদ্ধ থামার শর্ত হিসাবে রাশিয়া চাইছে ইউক্রেন (Ukraine War) থেকে কেড়ে নেওয়া ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনের ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব। পাশাপাশি তারা চায় ইউক্রেনের অসামরিকীকরণ ও যতো শীঘ্রসম্ভব সেখানে নির্বাচন। কোনও বিদেশি হস্তক্ষেপ যাতে না হয় তার প্রতিশ্রুতিও চায় রাশিয়া। বাকি আর কী থাকে!
আলাস্কায় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের কয়েকদিন আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তির শর্ত হিসেবে ‘ভূমি বিনিময়’-এর কথা বলেছিলেন। আগামী বৈঠকে জেলেনস্কিকে দোনেৎস্ক এবং লুহানস্কের পুরো আত্মসমর্পণের জন্য চাপ দেবেনই ট্রাম্প। রাশিয়া যে জমি জোর করে দখল করেছে তার বিনিময়ে ইউক্রেন কি পাবে তার কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নেই। লুহানস্ক প্রায় পুরোটাই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। তবে ইউক্রেন এই মুহূর্তে দোনেৎস্কের কিছু অংশ ধরে রেখেছে। রাশিয়ার কাছে ডনবাসের মতন খনিজ সমৃদ্ধ এলাকা ছাড়া হবে ইউক্রেনের আত্মঘাতী কাজ। তবে ইউক্রেনও যুদ্ধে চরম ক্লান্ত। পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে লাখ লাখ সেনা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছে।
[আরও পড়ুন: তিনটি নতুন মেট্রো রুটের উদ্বোধন, রইল ভাড়ার তালিকা]
এখন ইউক্রেন (Ukraine War), বিশেষ করে ডনবাসের মানুষ দুর্ভোগের অবসান চাইবে। শান্তির যে সমস্ত রাস্তা ভেসে আসছে, তাতে সাধারণ মানুষ শান্তির বিনিময়ে এখন আরও বেশি হারাতে পারে। আর যুদ্ধে গেলে বাঁচার আর পথ নেই, যুদ্ধ করার রসদ আর নেই, আমেরিকা থেকে আর কোনও অস্ত্র আসবে না, ইউরোপ অস্ত্র দিলেও তা আর পর্যাপ্ত নয়। ন্যাটো ইউক্রেনকে সদস্য করেনি, ন্যাটো চুক্তির ৫ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সদস্য দেশ সম্মিলিত প্রতিরক্ষার সুরক্ষা পায়। সেক্ষেত্রে, রাশিয়া ইউক্রেন অভিযানের দুঃসাহস হয়ত দেখতো না। তাই ন্যাটোয় যাব না এই এক অঙ্গীকারেই যুদ্ধভাবনা শেষ হয়ে যেত। সত্যি, জেলেনস্কির হাতে আর কোনও কার্ড নেই। পুরো দেশটা রাশিয়ার সঙ্গে মিশে গেলে রক্তক্ষয় বন্ধ হবে, তবে শান্তি আসবে কিনা জানা নেই।