ad
ad

Breaking News

Trump

Trump: ট্রাম্প ট্যারিফ কি শুধুই খামখেয়ালিপনা?

এই মুহূর্তে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের ওপর সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক বসানো হয়েছে। প্রথম এক লাখ গাড়ির ক্ষেত্রে এই শুল্ক প্রযোজ্য, তারপর ২৫ শতাংশ বসবে।

Trump Tariffs or Trade Tantrum?

চিত্র: সংগৃহীত

রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর কর বসছে। পয়লা আগস্ট থেকে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে ৫০ শতাংশ, তামা আমদানিতে ৫০ শতাংশ, বিদেশি তৈরি গাড়ি ও আমদানি করা ইঞ্জিন ও অন্যান্য গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসেছে। ৮ জুলাই ট্রাম্প (Trump) ওষুধ আমদানির ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেও এখনও এ বিষয়ে বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তি নেই। ট্যারিফ বিন্যাস প্রতি মুহূর্তেই পরিবর্তন হচ্ছে। এই মুহূর্তে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের ওপর সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক বসানো হয়েছে। প্রথম এক লাখ গাড়ির ক্ষেত্রে এই শুল্ক প্রযোজ্য, তারপর ২৫ শতাংশ বসবে।

[আরও পড়ুন: Zodiac Forecast: অপ্রত্যাশিত ভাবে অর্থ লাভ, দেখুন বৃহস্পতিবারের রাশিফল]

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ)-এর ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ। ইইউ ব্লক ভুক্ত ২৭টি দেশ বিনা শুল্কে মার্কিন পণ্য নিজ দেশে প্রবেশাধিকার দেবে, এই অঙ্গীকার করায় শুল্কের হার পনেরো শতাংশে নেমেছে। ৭ আগস্ট থেকে কার্যকরী হচ্ছে ব্রাজিলের পণ্যে ৫০ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যে ৩০ শতাংশ, ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ সঙ্গে ‘অনির্দিষ্ট জরিমানা’, ভিয়েতনামি পণ্যে ২০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ১৯ শতাংশ, ফিলিপিনো পণ্যে ১৯ শতাংশ, জাপানি পণ্যে ১৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক। কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যে উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (নাফটা) রয়েছে। চুক্তির আওতার বাইরে সব পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে।

যুক্তরাষ্ট্র-চিন বাণিজ্য আলোচনা চলছে। রাশিয়ার তেল ও অস্ত্র কেনার ‘অপরাধে’ ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর অনির্দিষ্ট জরিমানা সহ ২৫ শতাংশ শুল্ক বসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Trump) ৫ আগস্ট সিএনবিসি-কে একটি টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে জানান, রাশিয়ার তেল কেনার অব্যাহত রাখার কারণে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় আমদানির উপর আরোপিত শুল্ক ‘খুব উল্লেখযোগ্যভাবে’ বাড়ানো  হবে। গত এপ্রিলে ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা করলেও পরে তা নিয়ে উচ্চবাচ্য হয়নি।

ট্যারিফ ব্যপারটা কী?

অন্য দেশ থেকে আমদানি করা পণ্য ও পরিষেবাগুলির উপর সরকার কর্তৃক আরোপিত করই হল ট্যারিফ বা কাস্টমস শুল্ক। তারা সাধারণত পণ্যের দামের একটি শতাংশ। বিদেশি পণ্যগুলি দেশে প্রবেশের সময় এই কর দিতে হয়। স্বাভাবিক ভাবে ট্যারিফ বসলে ট্যারিফযুক্ত জিনিসের দাম বাড়ে। কী হারে ট্যারিফ বসছে তার ওপর নির্ভর করে ট্যারিফের আর্থিক প্রভাব। দেশের উৎপাদনের কতটা রফতানি হচ্ছে, তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশ যত বেশি রফতানি করে, ট্যারিফ বাড়লে তার আর্থিক অস্থিরতা বাড়ে।

আন্তর্জাতিক অস্থিরতা আসে বাণিজ্যের মাধ্যমেই। বিশ্ব ব্যাঙ্কের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর বহু দেশ চলে বিদেশে জিনিস বেচে। কানাডায় রফতানি মোট দেশজ উৎপাদনের ৩২.৫ শতাংশ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ৫০.৭ শতাংশ, মেক্সিকো ৩৬.৮ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকা ৩১.৮ শতাংশ, ভিয়েতনাম ৮৬.৫ শতাংশ, সিঙ্গাপুর ১৭৮.৮ শতাংশ। রাশিয়া, ব্রাজিল, ভারত ও চিন মোটামুটি ভাবে জাতীয় আয়ের ২০ শতাংশ রফতানি করে, ফলে এই সব দেশে বিদেশের অস্থিরতা সহজে এসে পৌঁছয় না, অর্থাৎ ট্যারিফ বাড়লে ব্যবসা সাময়িক কমবে, সারা দেশ বিপন্ন হবে না।

ট্যারিফের সুবিধা ও অসুবিধা 

ট্যারিফ দেশীয় শিল্পগুলি বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেয়। ট্যারিফের পর বিদেশি পণ্য তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল হয়, ফলে দেশীয় পণ্যগুলির চাহিদা বাড়ে, শিল্পগুলি প্রসারিত হয় এবং সর্বোপরি উত্পাদন বাড়ে। আবার কিছু দেশজ শিল্পের বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন রয়েছে, তাদের উত্পাদন নির্ভর করে আমদানি করা উপকরণ এবং যন্ত্রাংশের উপর। এইক্ষেত্রে ট্যারিফ বসলে দেশীয় উত্পাদন খরচ, সঙ্গে দাম বাড়বে। কোনও দেশ ট্যারিফ বসালে, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশও পাল্টা ট্যারিফ আরোপ করে। যে অর্থনীতিগুলি প্রাথমিকভাবে ‘শুল্ক আরোপকারী’ ছিল তারা প্রতিশোধমূলক শুল্কের মুখোমুখি হয়।

শুল্ক সরকারের আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ল্যাব ২৮ জুলাই ২০২৫ তারিখের পরিসংখ্যা অনুযায়ী, পণ্য আমদানির উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত গড় কার্যকর শুল্কের হার ছিল ১৮.২ শতাংশ। ১৯৩৪ সালের পর থেকে এটাই সর্বোচ্চ। ডোনাল্ড ট্রাম্প (Trump) দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার আগে ২০২৪ সালে ট্যারিফের হার ছিল ২.৪ শতাংশ। এই উল্লেখযোগ্য ট্যারিফ বৃদ্ধিতে মার্কিন সরকারের শুল্ক রাজস্বও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুনে শুল্ক আয় ছিল ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের মাসিক আয়ের তিনগুণ। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন রাজস্ব পর্যবেক্ষক সংস্থা কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও)-য়ের হিসাব ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত আরোপিত নতুন মার্কিন শুল্কে মার্কিন সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণ ১০ বছরে ২০৩৫ সাল নাগাদ ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমতে পারে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২৩ সালে সেখানে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭৭ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। মার্কিন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ব্যুরো বিইএ, ২০২৪ তথ্য অনুযায়ী, যেখানে আমেরিকা ৩,৮২৬.৯ বিলিয়ন ডলার আমদানি করেছে, সেখানে রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩,০৫৩.৫ বিলিয়ন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম রফতানি ছিল গাড়ি, খাদ্য এবং বাণিজ্যিক বিমান। সবচেয়ে বড় আমদানি ছিল সেল ফোন, তেল এবং গাড়ি। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি পণ্যের ঘাটতি চিনের সঙ্গে, ২৭৯ বিলিয়ন ডলার। প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতির এক তৃতীয়াংশেরও বেশি চিন থেকে আমদানির কারণে।

যুক্তরাষ্ট্র চিন থেকে যে সব আমদানি পণ্য কিনেছে তার মধ্যে রয়েছে পোশাক, যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স। মেক্সিকোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ১৫৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ২০২৩ সালে মেক্সিকো থেকে যানবাহন ও গাড়ির যন্ত্রাংশসহ ৪৭৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি, ১০৪  বিলিয়ন ডলার। আমদানিকৃত পণ্যের প্রাথমিক বিভাগগুলির মধ্যে রয়েছে যন্ত্রপাতি, বস্ত্র ও চর্মজাত দ্রব্য। জার্মানির সঙ্গে ৮৩ বিলিয়ন ডলারের, জাপানের সঙ্গে ৭১.২ বিলিয়ন ডলারের, কানাডার সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের ৬৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১২৯.২ বিলিয়ন ডলার।

২০২৪ সালে ভারতে মার্কিন পণ্য রফতানি ছিল ৪১.৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে ভারত থেকে মার্কিন পণ্য আমদানি হয়েছে মোট ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলার, ফলে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য ঘাটতি ছিল। ভারত থেকে রফতানির মূল পণ্যদ্রব্যগুলির মধ্যে রয়েছে গহনা, ওষুধ, সেল ফোন এবং পেট্রোকেমিক্যাল। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতিই প্রমাণ করে যে অন্যান্য দেশগুলি আমেরিকা থেকে যা কিনছে তার থেকে বেশি জিনিস বেছেছে এবং এতে তাতে অন্য দেশ আমেরিকার খরচে লাভবান। এরকমই ট্রাম্পের ধারণা। তাই তিনি ভাবেন, আমদানি হ্রাস করে বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে শুল্ক বৃদ্ধিই একমাত্র পথ।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Trump) দ্বিতীয় অভিষেকের পর থেকেই ট্যারিফ গর্জন শোনা গিয়েছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে ২০২৫ মার্চে মার্কিন আমদানি বিরাট ভাবে বেড়ে গিয়েছিল। জানুয়ারির আমদানি যেখানে ছিল ৪০৩ বিলিয়ন ডলার তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় মার্চে ৪১৯ বিলিয়ন ডলারে। অনিশ্চিত ট্যারিফের কথা ভেবে অনেক মার্কিন সংস্থাই মজুদ বাড়ায়। মে জুন মাসে আমদানি ৩৫০ বিলিয়ন ডলারে নামে। ২০২৪ সালের মে মাসে ৩৩২ বিলিয়ন ডলার আমদানি ছিল। আমদানি জানুয়ারি থেকে কমেছে বটে, কিন্তু গত বছরে স্বল্প ট্যারিফে যা আমদানি হয়েছে, বেশি ট্যারিফ জমানার শুরুতে, সেই লেভেলে পৌঁছনো যায়নি।

ট্যারিফ বসলেই দাম বাড়ে কিন্তু কতটা বাড়বে তা নির্ভর করে চাহিদার দাম স্থিতিস্থাপকতার ওপর। জিনিসটা খুব প্রয়োজনীয় হলে, ভোক্তার বিশেষ বিকল্প নেই, তাই ট্যারিফ বসলে কর ভোক্তার ঘাড়ে চাপে। আবার পণ্যটির প্রচুর বিকল্প থাকলে, দাম বাড়লে, লোকে বিকল্প দ্রব্য ব্যবহার করে। ফলে শুল্ক বসলে, বিক্রেতা কর পুরোটাই ভোক্তার দিকে স্থানান্তরিত করতে পারে না। ট্যারিফে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই।

এটা কোনও সন্দেহ নেই যে সব দেশ রফতানি নির্ভর হয়ে পড়েছে, তাদেরকে চাপে রেখে আরও কিছু আদায় করায় হল ট্যারিফের লক্ষ্য। অবৈধ অভিবাসন, মাদক পাচার মোকাবিলায় মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘ দিন এই বৈদেশিক শুল্ক ব্যবহার করছে। আবার কর বসিয়ে বহু অর্থনীতিকে লন্ডভণ্ড করে দিতেও পিছুপা হয় না, আমেরিকার মতো দেশ। গত ১৪ জুলাই ট্রাম্প (Trump) হুমকি দেন, ৫০ দিনের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কোনও চুক্তি না হলে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা কোম্পানিগুলির বিরুদ্ধে বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করা হবে।

ট্রাম্পের (Trump) বিভিন্ন ঘোষণায় বৈশ্বিক শেয়ার বাজারে ব্যপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। শেয়ার বাজারের অস্থিরতা চাকরি বাজার, সুদের হার, এমনকী পেনশনের ওপর পরে। আশার খবর, ধীরে ধীরে বাজার স্থির হচ্ছে। ট্যারিফ পাগলামিতে শেয়ার বাজার সেভাবে আর উত্তাল নয়। এতকাল মার্কিন ডলার একটি নিরাপদ সম্পদ বলে বিবেচিত হতো। মার্কিন ডলারের মান দারুণ ভাবে কমছে। গত পয়লা জানুয়ারি এক ডলারে মিলতো ০৯৬৬ ইউরো, ৩ আগস্ট মিলছে ০.৮৬৩৫ ইউরো।

শুল্কের ফলে যে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হ্রাস কমছে তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং প্রভাবশালী দেশগুলির আর্থিক জোট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) তাদের পূর্বাভাসেই জানিয়েছে। উভয় সংস্থাই আশঙ্কা করছে যে মার্কিন অর্থনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে। শুধু বিরোধী ডেমোক্র্যাট এবং বিদেশি নেতারা নন নিজের রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী নেতা ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি বাণিজ্য নীতির তীব্র বিরোধিতা করছেন।

ভারতের ওপর আর্থিক প্রতিক্রিয়া

ভারত বলেছে, তারা একটি ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক লাভজনক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত বছর ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪৫.৮ বিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ছিল। ২০২৪ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৯০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ট্রাম্প (Trump) ও মোদি এই অঙ্ক দ্বিগুণ করে ৫০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রাও দিয়েছিলেন। ভারত সরকার জানিয়েছে, তারা ট্রাম্পের সাম্প্রতিকতম মন্তব্যের তাৎপর্য খতিয়ে দেখছে। তবে জাতীয় স্বার্থরক্ষা করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ জানিয়ে ভারত বলেছে, কৃষক, উদ্যোগপতি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নিয়ে কোনও সমঝোতা হবে না।

ভারত ইতিমধ্যে বোরবন হুইস্কি এবং মোটরসাইকেলসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের উপর শুল্ক হ্রাস করলেও চিঁড়ে ভেজেনি। বহু বছর ধরেই আমেরিকা নানান ছুতোয় ভারতের কৃষি ও দুগ্ধজাত ক্ষেত্রে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। বিদেশি প্রতিযোগিতাহীন বিরাট বাজার তাদের হাতছানি দেয়। কিন্তু কৃষি শুধু মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা নয় কৃষি ভারতের ধর্ম। কৃষি বাণিজ্যে যে কোনও অনিশ্চয়তা ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির পক্ষে ভয়ঙ্কর। হাজার মার্কিনী চাপেও তাই কৃষি ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের অভ্যন্তরীণ বাজার আমেরিকা কেন, কোনও বিদেশির জন্য খোলা যাবে না।

আমেরিকা শুধু রাশিয়ার তেল আর অস্ত্র কেনা নিয়ে ভারতের ওপর রেগে নেই। ভারত এবছর ব্রাজিল, চিন, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অন্যান্যদের নিয়ে ব্রিকস আর্থিক গোষ্ঠীর প্রধান পুরোহিতের দায়িত্বে। ব্রিকস বিশ্বের ৪০ শতাংশ অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, তারা ব্রিকস মুদ্রার কথা ভাবছে। ট্রাম্পের (Trump) ভয় তো সেখানেই। ট্রাম্প ভারতে সন্ত্রাসী হামলার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হোয়াইট হাউসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিলেন। পাকিস্তানকে মাত্র ১৯ শতাংশ সুবিধাজনক শুল্ক এবং সেই সঙ্গে যৌথভাবে পাকিস্তানের গচ্ছিত তেল অনুসন্ধানের প্রতিশ্রুতি ভারতকে ভয় দেখানোর চেষ্টা।

ভারত বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আইফোন উৎপাদনের এক পঞ্চমাংশেরও বেশি সরবরাহ করে, চিনকে ছাড়িয়ে গেছে ভারত এই নির্দিষ্ট পণ্যে। করোনা ভাইরাসের কঠোর বিধিনিষেধের পর চিন থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টায় গত চার বছরে ভারতে উৎপাদন বাড়িয়েছে অ্যাপল। মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের সব চেয়ে বড় সাফল্য ভারতে অ্যাপলের উপস্থিতি ও এগিয়ে যাওয়া। অ্যাপলের অনুপ্রেরণায়, টেসলা ইনকর্পোরেটেড এবং মাইক্রন টেকনোলজি ইনকর্পোরেটেডের মতো চিপ নির্মাতারা ভারতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে। কিন্তু ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চহারে শুল্ক আরোপ হলে ভিয়েতনাম বা চিনে তৈরি আইফোন ভারতের থেকে বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলবে। তবে এক জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত তদন্তের জন্য ভারতে তৈরি আইফোন করের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফার্মা রফতানির জন্য ভারতের বৃহত্তম গন্তব্য, ভারতের  মোট ওষুধপত্র রফতানির ৩১ শতাংশেরও বেশি যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।  আমেরিকায় জেনেরিক ওষুধের প্রায় ৪৭ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৮.৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ওষুধ পণ্য রফতানি করেছে। শুল্ক বসলে ভারতের ওষুধ কোম্পানির সমস্যা বাড়বে সন্দেহ নেই। তবে ওষুধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্য, শুল্ক অনায়াসে মার্কিন ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিলেও বাজার বিশেষ সংকুচিত হবে না। ভারতের ওষুধ, বিশেষ করে জেনেরিক ওষুধ পৃথিবীর অন্য দেশের থেকে সস্তা। তবে মার্কিন বাজারের বিকল্প ভাবনা রাখতেই হবে।

আমেরিকান এবং ভারতীয়দের মধ্যে বাণিজ্যিক, প্রযুক্তি এবং সামাজিক সম্পর্কের বাস্তুতন্ত্র ট্রাম্পের ব্যক্তি স্বার্থের চেয়েও অনেক গভীর। আমেরিকায় পঞ্চাশ লক্ষ ভারতীয় আছেন। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি বংশোদ্ভূত কোটিপতির সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে ভারত, এরপর রয়েছে ইজরায়েল ও তাইওয়ান। এরা মার্কিন অর্থনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব রাখে।

[আরও পড়ুন: Mamata Banerjee: ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’ প্রকল্প নিয়ে মানুষের দুয়ারে সরকার এবার হুগলিতে]

৩০টিরও বেশি ভারতীয় সংস্থা আমেরিকায় কৌশলগত এবং খরচ সাশ্রয়ের কারণে আমেরিকায় উত্পাদন ও ব্যবসায় জড়িত। এদের মধ্যে দশটি ফরচুন ৫০০ কোম্পানি রয়েছে। প্রায় দশ হাজারের বেশি প্রযুক্তি ব্যবসা এবং সরকারি ঠিকাদার হিসাবে ভারতীয়রা কর্মরত। তাই ট্রাম্প (Trump) ভারতকে অস্থির করতে চাইলে নিজের দেশেই তার ভাল প্রভাব পাবেন। ভারতের অর্থনীতিতে যথেষ্ট কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, ভারত এতকাল পেরে ওঠেনি। ট্রাম্পের হুমকিই হয়তো ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হতে পারে।