চিত্র: সংগৃহীত
সুমন ভট্টাচার্য (বিশিষ্ট সাংবাদিক): বিশ্বের দুই শক্তিধর রাষ্ট্রের শক্তিধর মানুষের শীর্ষ বৈঠক আলাস্কায় শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল কী বা ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হবে কিনা, সেই বিষয়ে কোনও ঘোষণা নেই। এবং যেহেতু ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হবে কিনা ঘোষণা নেই, তাই এটাও জানা নেই, যে ভারতবর্ষের ওপর রুশ তেল কেনার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প (Trump Putin) যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিলেন, তার শেষ হবে কিনা। যদিও আলাস্কায় যাওয়ার আগে আবারও হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন, যে রাশিয়া নাকি তার সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছে ভারত তেল কেনা বন্ধ করে দিচ্ছে বলে।
[আরও পড়ুন: Test Series: “এমন দল আমরা চেয়েছিলাম” সতীর্থদের প্রশংসা করলেন ওয়াশিংটন]
ট্রাম্পের কথায়, তাঁর হুমকিতে, যেহেতু ভারত রাশিয়ার দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল, তারা তেল কেনা বন্ধ করে দিচ্ছে, তাই পুতিন সাত তাড়াতাড়ি বৈঠকে বসছেন। যদি আলাস্কার বৈঠকের পরে পুতিনের আন্তর্জাতিক রেটিংই বেশি বেড়েছে এবং ট্রাম্পকে কিছু নিষ্প্রভই লেগেছে, তাও আমরা জানি না, আমাদের ভাগ্যে কী আছে! বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররা যখন গত ১১ বছর ধরে ভারতের বিদেশনীতিকে আমেরিকার দিকে এতটাই ঝুঁকিয়ে দিয়েছিলেন, যে এখন আবার ফিরে দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ এবং শীর্ষ বৈঠক থেকে কোনও প্রকার ফলাফল না বেরোনো অবশ্যই ভারতের জন্য উদ্বেগের। কিন্তু তার চাইতেও মজার বিষয় যেভাবে পুতিন শীর্ষ বৈঠকটিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে গিয়েছেন। দুই শীর্ষ নেতার সাংবাদিক বৈঠকে ট্রাম্পের তুলনায় দ্বিগুণ সময় নিয়েছেন পুতিন এবং শেষ পর্যন্ত যখন তিনি মৃদু হেসে ইংরেজিতে বলেছেন ‘পরের বার মস্কোয় দেখা হবে’, তখন তাতেও ট্রাম্প মাথা নেড়ে সায় দিয়েছেন। রুশ পররাষ্ট্রনীতির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাহলে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমের দেশগুলো যে রাশিয়াকে ত্যাজ্য করে রেখেছিল, তা কোথায় গেল? বরং মস্কোর সর্বাধিনায়কই তো আলাস্কায় সমস্ত আলো নিয়ে চলে গেলেন।
ট্রাম্প-পুতিন শীর্ষ বৈঠক নিয়ে এত ভাবতে হচ্ছে বা এত আলোচনা করতে হচ্ছে, তার কারণ ভারতের ওপর চেপে থাকা ৫০ শতাংশ শুল্ক। এবং যেটা আগেই বলেছি, গত ১১ বছর ধরে নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররা ভারতের বিদেশনীতিকে এতটা আমেরিকার দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন, যে এই মুহূর্তে আমেরিকা কী করছে, তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট চিন্তায় থাকতে হয়। মজার বিষয়, প্রায় সবাই স্বীকার করছেন যে আলাস্কার শীর্ষ বৈঠকটা আসলে পুতিনের জয়, কারণ, আন্তর্জাতিক মহলে যাকে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছিল বলে এত দিন মার্কিন বিশেষজ্ঞরা বা ‘মার্কিন প্রোপাগাণ্ডা’ বলত, সেই পুতিনকে শুধু একেবারে হাঁটু মুড়ে বসে মার্কিন সৈন্যরা লাল কার্পেট বিছিয়ে অভ্যর্থনা জানাননি, পুতিনই সমস্ত আলো শুষে নিয়ে চলে গিয়েছেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে দুই শীর্ষনেতাই প্রশ্নের কোনও উত্তর দেননি। কিন্তু যতক্ষণ নির্ধারিত ছিল, তার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ সময়ই নিয়ে চলে গিয়েছেন পুতিন। প্রশ্ন উঠবে, তাহলে মার্কিন বিদেশনীতি বা ‘মার্কিন প্রোপাগাণ্ডা’ যে এত দিন মস্কোকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছিল, তার কী হল? ১০ বছর বাদে পুতিন প্রথম মার্কিন ভূখণ্ডে পা রাখলেন। শুধু তো পা রাখলেন না, বলা যায় একেবারে জয় করে নিলেন। কারণ, বৈঠক শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলতে হয়েছে, ‘আমাদের বৈঠকের অনেক অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু আমরা কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারিনি।’ কেন সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারেননি?
বোঝাই যাচ্ছে পুতিন ট্রাম্পের ধমকে চমকে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে, এমন কোনও প্রতিশ্রুতি দেননি। বরং ট্রাম্পকে বলতে হয়েছে, এর পরের ধাপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং ইউরোপে নেতাদের। যে জেলেনস্কিকে এর আগে ট্রাম্প যথেষ্ট অপমান করে হোয়াইট হাউজ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। আর পুতিন (Trump Putin) রীতিমতো ধমকের সুরে ইউরোপকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তারা যেন মস্কো এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে এই সখ্যকে ভাঙার চেষ্টা না করে। তাহলে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় স্থলযুদ্ধ নিয়ে সেই মহাদেশের বাকি দেশগুলো কী ভাবছে? তারা কি সত্যি সত্যি রুশ হুমকির সামনে মাথা নোয়াবে? তাহলে কি সত্যি সত্যি রাশিয়ার শর্তে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হবে? কেউ জানি না আমরা। অন্তত এখনও পর্যন্ত ট্রাম্প তার কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত আদানিদের মালিকানাধীন একটি সংবাদমাধ্যম দেখলাম বিরাট করে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছে, যে ভারতের আর আমেরিকার ‘হাতের পুতুল’ হয়ে চিনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধে অংশ নেওয়া উচিত নয়। আদানিদের মালিকানাধীন ওই সংবাদমাধ্যমে এই বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধটি লিখেছেন আবার খাস মার্কিন মুলুকেরই তাত্ত্বিক। প্রশ্ন উঠতেই পারে, আদানিদের সংবাদপত্রে এই ধরনের বিশ্লেষণ প্রকাশিত হওয়ার আসল কারণ কী নরেন্দ্র মোদি বা জয়শঙ্করও তাই মনে করছেন? এত দিনে কি তাঁরা বুঝতে পারছেন, যে কীভাবে আমেরিকা তাঁদের ব্যবহার করেছে বিভিন্ন কারণে? এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফলটা শূন্য হয়েছে? হতেই পারে। কারণ, আমেরিকার কাছ থেকে ধাক্কা খাওয়ার পর আজকাল নরেন্দ্র মোদি যেমন ‘ব্রিকস’-এ যাচ্ছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সখ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছেন, তেমনই এই মাসের শেষে তিনি চিনও যাচ্ছেন।
যদি ভারতের বিদেশনীতি আমেরিকার থেকে সরে এসে অন্য দেশগুলির সঙ্গেও বন্ধুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে সেটা সুলক্ষণ। কারণ, মোদির আগে বাজপেয়ী তো বটেই, ইন্দিরা গান্ধি থেকে শুরু করে নেহরু, সব আমলেই ভারতের বিদেশনীতি কখনোই এতটা ওয়াশিংটন মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েনি। গত ১১ বছরে আমরা ওয়াশিংটনের প্রতি অতি নির্ভরশীলতাই দেখেছিলাম এবং তারই দাম দিতে হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Trump Putin) আমাদের সঙ্গে চরম বেয়াদবি। রাহুল গান্ধি থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের সব বিরোধী নেতাই প্রশ্ন তুলেছেন কেন ট্রাম্পের দিকে আমাদের এই অতিরিক্ত ঝুঁকে থাকা ছিল?
রাহুল গান্ধি একধাপ এগিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এই সব কিছুই কি মার্কিন মুলুকে চলতে থাকা আদানিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা থেকে মোদি ঘনিষ্ট শিল্পপতিকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা ছিল? নাহলে প্যালেস্টাইনের মতো ইস্যুতে একেবারে ইজরায়েল এবং আমেরিকার দিকে কেন নয়া দিল্লি ঝুঁকেছিল? প্যালেস্টাইনের প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন এটা আলোচনা করে নেওয়া উচিত, যে দুই শীর্ষনেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভ্লাদিমির পুতিনের (Trump Putin) বৈঠকে প্যালেস্টাইন বা পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা উত্তেজনার বিষয়ে কোনও আলোচনা হয়েছে কিনা জানা যায়নি। কারণ, এ বিষয়ে কেউ কোনও উল্লেখই করেনি।
আমাদের এই গোটা ঘটনা থেকে বুঝতে হবে, আসলে পশ্চিমের দেশগুলি বা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে আমেরিকা ঠিক কীভাবে আমাদের দেখে। ইউক্রেনে যুদ্ধ নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। কিন্তু প্যালেস্টাইনে ইজরায়েলের একনাগাড়ে ‘গণহত্যা’ চালিয়ে যাওয়াতে কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছেন। গোটা গাজাটাকেই একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিয়েছে নেতানিয়াহুর বাহিনী, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রাশিয়া এবং আমেরিকার শীর্ষ বৈঠকে সেই নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে কেউই কোনও উল্লেখ করেননি।
আমেরিকার তরফে বা রাশিয়ার তরফেও এই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। আপাতত এইটুকু বোঝা যাচ্ছে, যে ‘মার্কিনি দাদাগিরি’ বা ডোনাল্ড ট্রাম্প-জো বাইডেনরা যে ‘ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ড’ বা ‘একমুখী পৃথিবী’ তৈরি করতে চাইছিলেন, সেটা হয়তো হচ্ছে না। কারণ, পশ্চিমের দেশগুলিকেও সাদরে আবার রাশিয়ার গুরুত্ব এবং পুতিনের কৌশলকে মেনে নিতে হচ্ছে। মস্কোর বিভিন্ন সামরিক বিশেষজ্ঞ বা পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিকরা সেটাই সমাজমাধ্যমে লিখে মনে করিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ গত ১০ বছর ধরে বা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে জো বাইডেনের সময় যেভাবে পৃথিবীকে একমুখী করার প্রবণতা হয়েছিল এবং যে একমুখী করার প্রবণতায় বাইডেন ঢালাওভাবে নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে তাঁর সমস্ত তথাকথিত বন্ধুকেই খোলাখুলি ছাড় দিয়েছিলেন, তার দিন বোধহয় শেষ হল। বিষয়টা আর তত সহজ নয়। ওয়াশিংটনই পৃথিবীর একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়।
ওয়াশিংটনে যে পৃথিবীরা আর একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়, যেটা যদি নরেন্দ্র মোদি এবং জয়শঙ্কররা বোঝেন, তাহলে তাঁদের জন্যও মঙ্গল। কারণ, ট্রাম্পকে ‘গুরু’ মানতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদির দেশে যতটা মুখ পুড়েছে, তা আর অন্য কোনও বিষয়েই মুখ পোড়েনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Trump Putin) ক্রমাগত আক্রমণ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিফ মুনিরকে তোল্লাই দেওয়া আসলে নরেন্দ্র মোদির পিঠে ছুরি ঢুকিয়ে দেওয়ার মতোই ঘটনা।
[আরও পড়ুন: Bengal Weather: বৃষ্টি নাকি আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি! রবিবার রাজ্যজুড়ে কেমন থাকবে আবহাওয়া?]
যে নরেন্দ্র মোদি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’ বা ‘হিন্দুদের রক্ষাকর্তা’ বলে প্রচার করতে নেমে পড়েছিলেন, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আসলে শুধুই একজন ব্যবসায়ী এবং নিজের ব্যবসার বাইরে কিছু বোঝেন না, সেটা হয়তো নয়া দিল্লির শাসকরা এখন বুঝছে। বুঝছে বলেই এতটা তৎপর সব কিছু মেরামত করতে। কিন্তু শীর্ষ বৈঠক যেহেতু কোনও স্পষ্ট দিশা দিয়ে গেল না, আমাদের হয়তো অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু দিন কীভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হয়, কীভাবে শান্তি ফেরে— তার উপরই নির্ভর করছে আমাদের অনেক কিছু। শুল্ক ছাড় থেকে অনেক বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনা।