অনন্যা ভট্টাচার্য (মনোবিদ): শিশুর মনোবিকাশের ধাপগুলি কী কী?
শিশুর মনোবিকাশ ধাপে ধাপে ঘটে, যাকে আমরা ‘উন্নয়নমূলক পর্যায়’ বলি। এই ধাপগুলি মূলত চারটি প্রধান স্তরে ভাগ করা যায়–
১. সংবেদনশীল ও মোটর বিকাশ (জন্ম-২ বছর)
- এই ধাপে শিশু চোখ, কান, স্পর্শের মাধ্যমে পৃথিবীকে চিনে নিতে শেখে।
- হাঁটা, বসা, হাত দিয়ে ধরা ইত্যাদি ক্ষমতা অর্জন করে।
২. পূর্ব-কার্যকরী স্তর (২-৭ বছর)
- শিশু কল্পনার জগতে প্রবেশ করে।
- ভাষার বিকাশ ঘটে।
- আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা দেখা যায়।
৩. মূর্ত কার্যকরী স্তর (৭-১১ বছর)
- শিশু যুক্তির মাধ্যমে চিন্তা করতে শেখে।
- সমস্যা সমাধানে যৌক্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করে।
৪. নির্জন চিন্তাভাবনার স্তর (১১ বছর থেকে ঊর্ধ্বে)
- বিমূর্ত ভাবনা, নীতি-নৈতিকতা, আত্মপরিচয় এ সব বিষয় নিয়ে চিন্তা শুরু হয়।
শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের ধাপগুলো কী কী?
শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশ ৮টি ধাপে ঘটে, যা মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসনের তত্ত্ব অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা যায়–
১. বিশ্বাস বনাম অবিশ্বাস (জন্ম-১ বছর)
- এই সময় মা-বাবার আচরণ শিশুর ভিতরে নিরাপত্তা ও বিশ্বাস গড়ে তোলে।
২. স্বাধীনতা বনাম লজ্জা ও সন্দেহ (১-৩ বছর)
- শিশু যদি নিজে নিজে কাজ করতে না পারে, লজ্জা ও আত্মবিশ্বাসহীনতা তৈরি হয়।
৩. উদ্যোগ বনাম অপরাধবোধ (৩-৬ বছর)
- শিশু নানা কাজ শুরু করতে চায়। যদি তাকে বাধা দেওয়া হয়, তখন অপরাধবোধ জন্মায়।
৪. পরিশ্রম বনাম অযোগ্যতার বোধ (৬-১২ বছর)
- স্কুলে শেখার মাধ্যমে পরিশ্রমের মানসিকতা তৈরি হয়। ব্যর্থ হলে হীনমন্যতা আসে।
৫. পরিচয় বনাম পরিচয় সংকট (১২-১৮ বছর)
- কৈশোরে নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
৬. ঘনিষ্ঠতা বনাম একাকিত্ব (১৮-৩০ বছর)
- ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে একাকিত্বের সৃষ্টি হয়।
৭. উৎপাদনশীলতা বনাম স্থবিরতা (৩০-৬৫ বছর)
- কর্মজীবনে সফলতা না এলে মানসিক স্থবিরতা দেখা দেয়।
৮. সততা বনাম হতাশা (৬৫ ঊর্ধ্বে)
- জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে যদি সন্তুষ্ট না হন, তবে হতাশা জন্মায়।
এই ধাপগুলোতে সমস্যা হলে শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?
যদি উক্ত ধাপগুলোয় সমস্যা দেখা দেয়, তবে শিশুর মধ্যে নিম্নলিখিত সমস্যা গুলো দেখা দিতে পারে–
- আত্মবিশ্বাসের অভাব
- আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তি
- উদ্বেগ, ভীতি, দুশ্চিন্তা
- আত্মমর্যাদার অভাব
- সম্পর্ক গড়তে অক্ষমতা
- আক্রমণাত্মক বা আত্মকেন্দ্রিক আচরণ
- মাদক বা অপরাধ প্রবণতা
- একাকিত্ব ও বিষণ্ণতা
শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য সঠিক লালন-পালনের নীতি কী হওয়া উচিত?
১. ভালবাসা ও যত্ন
- ভালবাসা শিশুর নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করে।
২. শ্রদ্ধাশীল আচরণ:
- শিশুকে ছোট মনে না করে শ্রদ্ধা দিয়ে কথা বলা।
৩. শ্রেণিবিন্যাস ও নিয়ম-কানুন
- পরিষ্কার নিয়ম থাকলে শিশুর মধ্যে শৃঙ্খলা আসে।
৪. শোনার অভ্যাস
- শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও গুরুত্ব দেওয়া।
৫. সৃজনশীলতা উৎসাহিত করা
- ছবি আঁকা, গান, নাচ ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুর প্রতিভা বেরিয়ে আসে।
৬. মোটিভেশন ও প্রশংসা
- শিশুর ছোট অর্জনেও প্রশংসা করা উচিত।
৭. সহানুভূতিশীল শাসন
- প্রয়োজন হলে শাসন করতে হবে কিন্তু সেটি মারধর বা গালিগালাজ দিয়ে নয়।
কড়া শাসন কি শিশুর মনোজগৎকে অরক্ষিত করে তোলে?
হ্যাঁ, কড়া শাসন শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর মধ্যে–
- ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
- শিশু অনুভব করে সে তুচ্ছ।
- আত্মমর্যাদা নষ্ট হয়।
- আগ্রহ কমে যায়।
- সহানুভূতি গড়ে ওঠে না।
- আগ্রাসী বা নির্লিপ্ত আচরণ গড়ে ওঠে।
শিশুর বিকাশে শাস্তির বদলে গঠনমূলক পরামর্শ ও ধৈর্য জরুরি।
নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন