ad
ad

Breaking News

Sukanta Bhattacharya

শতবর্ষের আলোয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কেবল নান্দনিকতার খেলা নয়, এটি হতে হবে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। এই বিশ্বাসই তাঁকে রাজনীতির সক্রিয় অংশীদার করে তুলেছিল।

Sukanta Bhattacharya: Revolutionary Poet and Political Voice

চিত্র: সংগৃহীত

বিশ্বজিৎ বৈদ্য (বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক): বাংলা সাহিত্যের বিপ্লবী ও প্রগতিশীল ধারায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের (Sukanta Bhattacharya) নাম এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মাত্র বিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যেভাবে রাজনীতি, সমাজচেতনা ও সাহিত্যকে একসূত্রে বেঁধেছিলেন, তা বাংলা সাহিত্য ও গণআন্দোলনের ইতিহাসে অনন্য। তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে যেমন আছে বিপ্লবী স্বপ্ন, তেমনই আছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। সুকান্ত বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কেবল নান্দনিকতার খেলা নয়, এটি হতে হবে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। এই বিশ্বাসই তাঁকে রাজনীতির সক্রিয় অংশীদার করে তুলেছিল।

সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের অবিচার, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও শোষণের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেন। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বঙ্গদুর্ভিক্ষ তাঁর কিশোর মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই সময় গ্রামেগঞ্জে মানুষের মৃত্যুমিছিল, শহরে খাদ্যাভাব এবং ধনী-গরিবের বৈষম্য তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভিত গড়ে তোলে। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট ভাবধারার প্রতি আকৃষ্ট হন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারপত্র, সভা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করেন। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার মূল প্রেরণা আসে শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা দেখে।

কৈশোরকালেই সুকান্ত যুক্ত হন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডে। তিনি ছিলেন প্রগতি লেখক সংঘ এবং গণনাট্য সংঘ-এর সক্রিয় কর্মী। এই দুটি সংগঠনই তখন সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রচার ও গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। সুকান্ত শুধু কবিতা লিখেই থেমে থাকেননি— তিনি সাংস্কৃতিক মিছিল, নাটক, গান ও কবিতা পাঠের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়েছেন। তাঁর লেখা প্রায়শই দলের প্রচারপত্র ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হত।

সুকান্তের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ছিল ঔপনিবেশিক বিরোধী এবং শোষণবিরোধী। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে যেমন আক্রমণ করেছেন, তেমনই দেশীয় ধনী শ্রেণি ও জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক নয়— অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও, যদি অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রেণিশোষণ না দূর হয়, তবে প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না। তাই তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল শ্রেণি সংগ্রামের সঙ্গেও যুক্ত।

সুকান্তের (Sukanta Bhattacharya) রাজনৈতিক চেতনার কেন্দ্রে ছিল শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ। তিনি কৃষক, মজুর, ক্ষুধার্ত শিশু ও নিপীড়িত নারীর কণ্ঠস্বরকে কবিতায় তুলে ধরেন। তাঁর কবিতায় আমরা দেখতে পাই এক সুস্পষ্ট প্রলেতারিয়েত চেতনা— যেখানে শিল্পের উদ্দেশ্য মানুষের মুক্তি, এবং কবির দায়িত্ব মানুষের সংগ্রামে পাশে থাকা। তাঁর বিখ্যাত লাইন- ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’ এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতীক।

সুকান্ত বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য ও শিল্প গণমানুষের হাতিয়ার হতে হবে। এই কারণে তিনি গণনাট্য সংঘের মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছেন, যেখানে নাটক, কবিতা, গান ও আবৃত্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হতো। তিনি মনে করতেন, শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় নয়, সাংস্কৃতিক মাধ্যমেও মানুষকে সংগঠিত করা সম্ভব। এই ধারণা থেকেই তিনি একদিকে কবিতা লিখেছেন, অন্যদিকে সরাসরি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।

সুকান্তের কবিতায় রাজনৈতিক ভাবধারা ও সাহিত্যিক শৈলী একাকার হয়ে গেছে। তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিপ্লবী বাস্তববাদ নির্ভর। তিনি শিল্পকে কেবল নান্দনিক অভিব্যক্তি নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের অস্ত্র হিসেবে দেখেছেন। তিনি অলঙ্কারবর্জিত সরল ভাষায় কঠিন রাজনৈতিক সত্য প্রকাশ করেছেন। যেমন ‘নতুন সকাল’ কবিতায় তিনি স্বপ্ন দেখিয়েছেন একটি শোষণমুক্ত ভবিষ্যতের, আবার ‘ছাড়পত্র’ গ্রন্থে তিনি বিপ্লবী লড়াইয়ের জন্য নিজের প্রজন্মকে প্রস্তুত করেছেন।

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের চাপ, দারিদ্র্য এবং অপুষ্টিজনিত দুর্বলতার কারণে সুকান্ত (Sukanta Bhattacharya) যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। অসুস্থতার মধ্যেও তিনি লেখা ও সংগঠনের কাজ চালিয়ে গেছেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৩ মে, মাত্র বিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু ঘটে।‌ তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা সাহিত্যের জন্য যেমন বিরাট ক্ষতি, তেমনই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্যও বড় ধাক্কা ছিল।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আজও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। তাঁর কবিতা এখনও মিছিল-মিটিং-আন্দোলনে আবৃত্তি হয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহিত্য ও রাজনীতি একে অপরের বিরোধী নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের জন্য এই দুইয়ের সমন্বয় অপরিহার্য। বাংলার গণসংস্কৃতি আন্দোলন, প্রগতিশীল লেখক গোষ্ঠী, এবং রাজনৈতিক কর্মীরা আজও তাঁর কবিতা থেকে সাহস ও দিকনির্দেশনা পান।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের (Sukanta Bhattacharya) রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কেবল একটি কিশোর কবির জীবনগাথা নয়, এটি বাংলা সাহিত্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দলিল। তিনি দেখিয়েছেন, কবিতা হতে পারে সংগ্রামের হাতিয়ার, রাজনৈতিক অস্ত্র এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টা।‌ তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ছিল শোষণমুক্ত, শ্রেণিহীন সমাজ গঠন যার জন্য তিনি সাহিত্য, শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে একত্র করেছিলেন। মাত্র বিশ বছরের জীবনে তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাহিত্য প্রতিভার মিলন ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।