চিত্রঃ সংগৃহীত
সুদীপ্ত দে: ভোটার তালিকার সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রত্যেক বছরই এতে নতুন কিছু নাম ঢোকে, মৃতদের নাম বাদ যায়। অথচ, এবার বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন মিলে এমন এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে, যাতে জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি সব পিছনে পড়ে গিয়েছে। নাগরিকত্বহীন হওয়ার আতঙ্ক মানুষকে তাড়া করছে। অথচ এমন আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির তো দরকার ছিল না। তা হলে, তা করা হল কেন? আসলে এসআইআরের মধ্য দিয়ে আদৌ কোনও অনুপ্রবেশকারী খুঁজে পাওয়া যাক বা না যাক, শাসক বিজেপির কাছে এই আতঙ্কটি সৃষ্টি করারই দরকার ছিল (Special Intensive Revision)।
এর আগেও ভোটার তালিকায় ইনটেনসিভ রিভিশন হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এতদিন তিনরকম ভাবে ভোটার তালিকা সংশোধিত হয়ে এসেছে। নিবিড় সংশোধন (ইনটেনসিভ রিভিশন), সংক্ষিপ্ত সংশোধন (সামারি রিভিশন), চলমান সংশোধন (কন্টিনিউয়াস রিভিশন)। আগে বহুবার নিবিড় সংশোধন হলেও স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন এবারই প্রথম। সর্বশেষ নিবিড় সংশোধন হয়েছিল ২০০২ সালে। তখন এটা নিয়ে বিশেষ হইচই হয়নি। কিন্তু এবার হচ্ছে। হইচই শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সারা দেশেই হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালে ৮ মাস ধরে নিবিড় সংশোধন হয়েছিল। তাতে ২৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল Special Intensive Revision()।
কোনও হইচই হয়নি। তা হলে এবার হচ্ছে কেন? হচ্ছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যমূলক ভূমিকার জন্য। আদৌ কি অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা উদ্দেশ্য? সম্প্রতি বিহারে এসআইআর হয়ে গেল? সেখানে কতজন বিদেশির নাম পাওয়া গেছে? রিপোর্ট অনুযায়ী, সর্বাধিক ৩১৩ জন। এর মধ্যে ৭৮ জন মুসলমান, বাকি ২৩৫ জন নেপালি হিন্দু।
এই ৩১৩ জন অনুপ্রবেশকারী খুঁজে বার করার জন্য ৭ কোটি ৭৩ লাখ মানুষের প্রত্যেককে ডকুমেন্ট দিয়ে প্রমাণ করতে হয় তাঁরা অনুপ্রবেশকারী নন। অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারী খোঁজার যে দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র দফতর পালন করেনি, তার দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে তাঁদেরই প্রমাণ করতে বলা হয় যে তাঁরা ভারতীয় নাগরিক। ভোটার তালিকা সংশোধন করাই যদি নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হতো তা হলে এতদিন যেভাবে হয়েছে, সেইভাবেই তা করতে পারত। তা না করে বিধানসভা নির্বাচনের এত কাছে এত কম সময়ের মধ্যে তা করতে গিয়ে মানুষকে এ ভাবে আতঙ্কিত করা কেন?
২০০৩ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে এনডিএ সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এনে বলেছিল যে, ১৯৮৭ সালের পর যারা এ দেশে জন্মেছেন তাঁরা সরাসরি দেশের নাগরিক নন। তাঁদের প্রমাণ করতে হবে যে তাঁদের মা বা বাবা, কেউ একজন এ দেশের নাগরিক ছিলেন। এখন নির্বাচন কমিশন বলছে যে ১৯৮৭ সাল বা তার পরে যারা জন্মেছেন, তাঁরা ভোটার কি না তা সন্দেহজনক। তাঁদের প্রমাণ করতে হবে যে তাঁদের বাবা বা মা ২০০২ সালে ভোটার ছিলেন। এটা কার্যত ২০০৩ সালের আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব প্রমাণের চেষ্টা। এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস) হচ্ছে ঘুরিয়ে (Special Intensive Revision)।
বিজেপি সরকার অসমে এনআরসি করে সেখানে নাগরিকত্ব খোঁজার চেষ্টা করেছিল, সেখানেও আনুষ্ঠানিক ভাবে এনআরসি শুরু করার আগে ভোটার তালিকা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। বিজেপির ইচ্ছা ছিল সারা দেশে এনআরসি করার, করতে পারেনি। এখন নির্বাচন কমিশনকে সঙ্গী করে সেই কাজে নেমেছে।স্বাভাবিক ভাবেই, এসআইআর-এর সঙ্গে এনআরসি-র সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তাই শুধু মুসলিম ধর্মের মানুষরাই নয়, হিন্দু ধর্মের বহু মানুষের মধ্যেও ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অসমে এনআরসি-র মধ্য দিয়ে বিজেপি অনুপ্রবেশকারী মুসলিমদের নাগরিকত্বহীন করতে চেয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল ১৯ লক্ষ নাগরিকত্বহীন মানুষের মধ্যে ১৪ লক্ষই হিন্দু। এই রকম পরিস্থিতিতে জনগণের ক্ষোভ থেকে বাঁচতে বিজেপি নতুন পথ খুঁজছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পদদলিত করে অত্যন্ত অগণতান্ত্রিকভাবে সিএএ এনেছে। মতুয়া কার্ড খেলেছে। এখন বহু জায়গায় ক্যাম্প খুলে সিএএ-এর ফর্ম পূরণ করাচ্ছে। বলছে, এতেই নাকি নাগরিকত্ব অর্জন করা যাবে (Special Intensive Revision)।
নথি নিয়ে চিন্তায় পড়েছে মানুষ। পুরনো নথিপত্র যাদের হারিয়ে অথবা নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তাঁরা দিনের পর দিন সরকারি দফতরে দৌড়ঝাঁপ করে, হয়রান হয়ে, দালাল চক্রের পাল্লায় পড়েও সে সব কাগজ উদ্ধার করতে পারবেন তার কোনও গ্যারান্টি আছে? বছর বছর বন্যার কবলে পড়া মানুষ কিংবা যাঁদের পরিযায়ী হয়ে রোজগার করতে হয় তাঁরা ২০-২৫ বছর আগের তাঁদের বাপ-ঠাকুরদার নথি যত্ন করে কোথায় রাখবেন? হঠাৎ ফরমান দিয়ে আধার কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ডের গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি বাতিল করা হল। বিহারে প্রথম পর্যায়ের ৬৫ লক্ষ এবং খসড়া তালিকা থেকে ৩.৩৬ লক্ষ অর্থাৎ প্রায় ৬৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেল। তার ৭৫-৮০ শতাংশ মানুষই হতদরিদ্র। কেউ খেতমজুর বা ভূমিহীন চাষি, কেউ পরিযায়ী শ্রমিক, কেউ গৃহপরিচারিকা।
দেশের মানুষের করের লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে আধার কার্ড তৈরি করার পর সরকার আধারকে এতই প্রামাণ্য এবং নির্ভরযোগ্য হিসাবে তুলে ধরল যে, ব্যাঙ্ক, রেশন, গ্যাস সহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাথে আধার সংযোগ বাধ্যতামূলক করা হল। অথচ এখন বলা হচ্ছে, আধার কার্ড ভোটদাতা হিসাবে নাগরিকের নির্ভরযোগ্য পরিচয়পত্র নয়। কারণ কী? কারণ নাকি আধার কার্ড জাল হচ্ছে। একই ভাবে শত-সহস্র কোটি টাকা ব্যয়ে যে ভোটার কার্ড তৈরি করা হল, তাকেও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় বলে বলা হচ্ছে। কারণ তা-ও নাকি জাল হচ্ছে। তা হলে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড জাল হওয়ার দায় কি জনগণের? কোথাও কিছু জাল যদি হয়েই থাকে তার সঙ্গে জড়িত তো সরকারের বিভিন্ন দফতরের কর্তারা। তার দায় সরকারের (Special Intensive Revision)।
এ জন্য জনগণকে সমস্যায় ফেলা কেন? সরকার তার অপদার্থতার দায় জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারে না। সমস্যা সমাধানে অক্ষম সরকার দৃষ্টি ঘোরাতে চায় আসলে জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরির, সংখ্যালঘু মানুষকে বিদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের যে কার্যক্রম, সেটাই তারা এসআইআরের মধ্য দিয়ে করতে চাইছে। মানুষকে এসআইআরের নামে অস্তিত্বের সংকটে ফেলতে চাইছে। জনজীবনের যে জ্বলন্ত সমস্যাগুলো দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, মহিলাদের উপর ক্রমাগত বাড়তে থাকা অপরাধ, শিক্ষা-চিকিৎসার সমস্যা, যেগুলি সমাধান করতে কেন্দ্র এবং রাজ্যে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা পুঁজিবাদী সরকারগুলি পুরোপুরি ব্যর্থ, এসআইআরের মধ্য দিয়ে সরকার এই সমস্ত সমস্যাগুলিকে পিছনে ঠেলে দিয়ে, সামনে নিয়ে এসেছে নাগরিকত্বের সমস্যাকে। অর্থাৎ, তুমি আগে দেখো ভোটার তালিকায় তোমার নাম আছে কি না, তুমি আদৌ ভারতের নাগরিক কি না। তারপর এই সব নিয়ে ভাবা যাবে!
সুপ্রিম কোর্ট যখন বলল, অন্য প্রামাণ্য নথিগুলোর সঙ্গে আধার কার্ডকেও প্রামাণ্য নথি হিসাবে গ্রহণ করতে হবে, কমিশন তা করল না। এখনও বলছে, আধার জমা দিলেও সন্দেহ হলে কমিশন অন্য নথি দেখতে চাইবে। এর থেকেই স্পষ্ট এসআইআর-এর উদ্দেশ্য সঠিক ভোটার লিস্ট তৈরি করা কিংবা সঠিক নাগরিক নির্ধারণ করা নয়। এর থেকেই স্পষ্ট, জনজীবনের মূল সমস্যাগুলি থেকে ক্ষুব্ধ জনগণের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কৃত্রিম এবং জটিল সমস্যার মধ্যে ফেলে তাকে ঘুরপাক খাওয়ানোই এর লক্ষ্য। এর পিছনে মূল উদ্দেশ্য হল, মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে এক অংশের মানুষের ত্রাতা সেজে অন্য অংশের মানুষকে সন্ত্রস্ত রেখে তাদের দিয়ে ভোটবাক্স ভরানো (Special Intensive Revision)।