চিত্র: সংগৃহীত
রাজু পারাল (বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, নারীরা যদি পুরুষদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংগ্রাম না করে তবে ভারতমাতার মুক্তি ঘটবে না। কারণ নারীদের বাদ দিয়ে সব কাজই অসম্পূর্ণ। তাই তো ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আনতে প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, মাতঙ্গিনী হাজরা, বাসন্তী দেবী, সরোজিনী নাইডুর মতো নারীদের আবির্ভাব ঘটেছে বার বার (Sarojini Naidu)।
সরোজিনী নাইডু ছিলেন এমন একজন নারী যিনি অহিংসা অসহযোগ পর্ব থেকে ভারত ছাড়ো আন্দোলন পর্যন্ত আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং প্রথম সারির রাজনীতিক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কখনও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি তিনি। জীবনে অনেক বাধা পেয়েছেন, কিন্তু তা থেকে সরে দাঁড়াননি কখনও। স্বৈরাচারী ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বারবার জেলে পাঠিয়েছে, কিন্তু নিজের লক্ষ্যে অটল এবং অবিচল ছিলেন তিনি। মহিলাদের শৃঙ্খলমুক্ত ও স্বাবলম্বী হওয়ার যে পথ প্রায় শত বছর আগে তিনি দেখিয়েছিলেন, আজও তা প্রাসঙ্গিক। সংগ্রামী এই মহিলার নাম সরোজিনী নাইডু (১৮৭৯-১৯৪৯)। একজন প্রথম সারির স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে তাঁর নাম সকলে জানলেও তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি। তাঁর কবিতা লেখার অসামান্য প্রতিভা দেখে মহাত্মা গান্ধী তাঁকে ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’ বা ‘ভারতের বুলবুল’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। উল্লেখ্য, মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সরোজিনীর এতটাই অন্তরঙ্গতা ছিল যে তিনি গান্ধীজিকে ‘মিকি মাউস’ বলে ডাকতেন।
সরোজিনী নাইডু মাতা বরদাসুন্দরী দেবীর গর্ভে ১৮৭৯ সালের ১৩ ফ্রেবুয়ারি হায়দরাবাদে জন্ম নেন। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন এক অভিজাত পরিবারে। পিতা ডাঃ অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন হায়দরাবাদের নিজাম কলেজের অধ্যক্ষ। মা বরদাসুন্দরীও বাংলায় ভাল কবিতা লিখতে পারতেন। কিন্তু নিজের কাব্য প্রতিভাকে তিনি সযত্নে গোপন রাখতেন। কারণ তাঁদের পরিবার বাঙালি পরিবার হলেও চাল-চলন, আদব-কায়দা সব কিছুই ছিল ইংরেজদের মতো। কাজেই তিনি কেবল গৃহস্থালির কাজই করতেন (Sarojini Naidu)।
মাত্র বারো বছর বয়সে সরোজিনী মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং পরবর্তীকালে লন্ডনের কিংস কলেজ ও কেমব্রিজে পড়াশোনা করেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পরীক্ষাতেই সরোজিনী বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। কিন্তু অত্যধিক মানসিক পরিশ্রমের ফলে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। তাই কিছুসময় পড়া স্থগিত রেখে সুইৎজারল্যান্ড এবং ইতালিতে ভ্রমণ করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই পিতার নির্দেশে দেশে ফিরে আসেন। বিলেতের ডিগ্রি অর্জন করতে না পারলেও ইংরেজিতে অসাধারণ সব কবিতা লিখে সরোজিনী বেশ প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘গোল্ডেন থ্রেশহোল্ড’ লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৯০৫ সালে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কাব্য প্রতিভায় ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলেন।
সরোজিনীর অন্তরে দেশপ্রেম ছিল ফল্গুধারার মত প্রবাহিত। ভারতে যখন দেশপ্রেমের বন্যা বইছিল তখন তিনিও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। প্রথমদিকে পাশ্চাত্য কবিদের আদর্শে কবিতা লিখলেও একসময় তিনি ভারতীয় ভাব আদর্শের দিকে মুখ ফেরালেন। তাঁর কবিতায় প্রাচীন ভারতের আদর্শ এবং নব্য ভারতের বাণী রূপ পরিগ্রহ করতে লাগলো। জীবন ধারার বৈচিত্র্যে তাঁর কবিতাগুলি যেন সুষমামণ্ডিত হয়ে উঠেছিল। তাঁর রচিত বিয়ের গান, ঘুমপাড়ানি গান, মন্দিরের আরতির ঘন্টা, পাল্কি-বেহারা ও ভিস্তিওয়ালাদের গান ইত্যাদি কবিতার লালিত্য ও ভাবোচ্ছ্বাস সবার কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ‘ভারতের বুলবুল’ নামে আগেই তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন। পরে ১৯১৪ সালে ‘সোসাইটি অব লিটারেচার’ নামক সংস্থার ফেলো অর্থাৎ সভ্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি (Sarojini Naidu)।
সরোজিনী একদিকে যেমন কাব্য রচনার মধ্যে দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতেন, তেমনই নিজের দেশে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইও করে গিয়েছেন। ধীরে ধীরে স্বদেশপ্রেম সরোজিনীর জীবনের অন্যতম প্রধান মূল মন্ত্র হয়ে ওঠে। এই সময়ে তাঁর পরিচয় হয় অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ গোপালকৃষ্ণ গোখলে, অ্যানি বেসান্ত, মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহরু এবং মহম্মদ আলি জিন্না প্রমুখের সঙ্গে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মাধ্যমে সরোজিনী স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদান করেন।
এরপর মহাত্মা গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে শামিল হন। প্রায় এই সময় থেকেই তাঁর মধ্যে নারীমুক্তি, শ্রমিক অধিকার রক্ষা ও জাতীয়তাবাদের সমর্থনে বক্তৃতা প্রদান করার আগ্রহ জেগে উঠে। ১৯১৬ সালে বিহারের চম্পারণে নীল চাষিদের পক্ষও অবলম্বন করেন সরোজিনী নাইডু। সরোজিনী লবণ আইন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিলে গ্রেফতার হন গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মদনমোহন মালব্যদের সঙ্গে। সে সময়ে তিনি তাঁর সতীর্থদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘ভারতের মর্যাদা আজ তোমাদের হাতে, কোনো অবস্থাতেই তোমরা হিংসার আশ্রয় নেবে না।’ সেদিন তাঁর নেতৃত্বে জনতা অমানুষিক আক্রমণের মুখেও যে নির্ভীক শৃঙ্খলা শক্তি, মর্যাদা এবং দৃঢ় সংকল্প মনোভাব দেখিয়েছিল তা ইতিহাস হয়ে আছে।
১৯৩০, ১৯৩২ এবং ১৯৪২-৪৩ সালেও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কারাবরণ করেছিলেন সরোজিনী নাইডু। তাঁর সেই আন্দোলনে গোপালকৃষ্ণ গোখলে, অ্যানি বেসান্ত, সিপি আয়ার, মহম্মদ আলি জিন্না সহ বিভিন্ন ব্যক্তির উৎসাহ ও সহযোগিতা পেয়েছিলেন। সরোজিনীর স্বামী গোবিন্দ বাজলু নাইডুও তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে রাওলাট আইন পাশ করে সব ধরনের সরকার বিরোধী লেখালেখি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু সরোজিনী তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। ওই বছরের জুলাই মাসে ইংল্যান্ডে হোমরুল লিগের দূত মনোনীত হন এবং একবছর পর ভারতে প্রত্যাবর্তন করে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন।
১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে দেশ যখন উত্তাল সেই সময়ে ভারতের স্বাধীনতার তাৎপর্য বোঝানোর জন্য সরোজিনী নাইডু আমেরিকা যান। সেখানে তিনি আফ্রিকান আমেরিকান ও আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ করেন। ১৯৩০ সালে গান্ধীজি গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করার জন্য বিলেতে গেলে তখন সরোজিনীও ছিলেন তাঁর সঙ্গে। ভারতকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার ব্যাপারে ইংরেজ সরকারের সঙ্গে আলোচনায় কোনও ফল হল না (Sarojini Naidu)।
ভারতে ফেরার পথে গান্ধীজি ও সরোজিনী দু’জনেই গ্রেফতার হলেন। ওই বছরের শেষের দিকে মহাত্মা গান্ধী যখন লবণ আইন অমান্য করলেন তখন সরোজিনী নাইডুও হলেন তাঁর সহগামিনী। পদব্রজে মাইলের পর মাইল পথ অতিক্রম করে চললেন হাজার হাজার সত্যাগ্রহীর সঙ্গে। সরকারি আইন অমান্য করার জন্য মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তিনিও গ্রেফতার হলেন। ১৯৪২ সালে গান্ধীজী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন শুরু করলে সরোজিনী নাইডু তাতে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হন। ১৯৪৩ সালের ২১ মার্চ সরোজিনীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকলে ইংরেজরা তাঁকে মুক্তি দেন।
ভারতের স্বাধীনতা ছিল সরোজিনীর জীবনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন সার্থক হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করল। ভারতীয় কংগ্রেসের হাতে এল ভারত শাসনের কর্তৃত্ব। সেদিনই তিনি উত্তর প্রদেশের (ভূতপূর্ব যুক্তপ্রদেশ) রাজ্যপাল নিযুক্ত হলেন। ভারতের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন সরোজিনী নাইডু। কিন্তু দুঃখের বিষয় বেশিদিন তিনি সেই ক্ষমতায় আসীন থাকতে পারেননি। ১৯৪৯ সালের ১ মার্চ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেদিনই লখনউ রাজভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সরোজিনী। কীর্তিতে, ত্যাগে অতুলনীয় মহিলা মৃত্যুতেও অমর হয়ে রইলেন ভারতবাসীর অন্তরে। এরকম একজন সংগ্রামী এবং প্রতিভাবান মহিলার
দেখানো পথ আমাদের আদৰ্শ হওয়া উচিত। সরোজিনী জীবনে কখনও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তিনি মহিলাদের শৃঙ্খলমুক্ত ও স্বাবলম্বী হওয়ার যে পথ প্রায় শত বছর আগে দেখিয়ে ছিলেন, আজও তা প্রাসঙ্গিক (Sarojini Naidu)।