চিত্র: সংগৃহীত
সুকান্ত পাল: প্রতিবছর ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস ভারতীয় নাগরিকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসাবে পালিত হয়। এই গুরুত্ব যেমন ঐতিহাসিক দিক দিয়ে তেমনই নাগরিক অধিকারের দিক দিয়েও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রজাতন্ত্র দিবসের রাজনৈতিক ঐতিহাসিকতা ভারতীয় জাতীয় জীবনের একটি অত্যন্ত অনন্য ঘটনা— যা আজও আমাদের দেশের নাগরিকদের আলোড়িত করে। এ প্রজাতন্ত্র দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট একটু সংক্ষেপে আলোচনা করে মূল বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করব (Republic Day)।
তখন ভারতবর্ষ পরাধীন। ব্রিটিশ রাজের অধীন। তখন আমরা ব্রিটিশ রাজের উপনিবেশিক প্রজা। ভারতীয় উপনিবেশের সবাই তখন ব্রিটিশ রাজা ও রানির অনুগত প্রজা। সুশাসক হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশরা আমাদের দেশে যে শাসন করত তার মধ্যে কখনওই ভারতীয়দের কল্যাণ বা মঙ্গল করার চিন্তা স্থান পায়নি। প্রশাসন ব্যবস্থাটাই পরিচালিত হতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে। এই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কিছু হলেই ব্রিটিশ রাজের অত্যাচারের রূপটি আমাদের সামনে ফুটে উঠত। স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ ছাড়া অন্যের কোনও স্বার্থের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। থাকার কথা ও নয়। পুরো শাসন ব্যবস্থাটাই পরিচালিত হতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে। তাদের স্বার্থে বিন্দুমাত্র ঘাটতি তারা কখনই মেনে নিতে পারেনি। ফলে ব্রিটিশদের তথাকথিত সুশাসনের যে মিথ তা কুশাসনে পরিণত হয়েছিল। ব্রিটিশের এই কুশাসনের বিরুদ্ধে খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় জনগণের ক্ষোভ বাড়ছিল দিন দিন। ব্রিটিশের বিভিন্ন ধরনের শোষণ এবং অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণ জাতীয় কংগ্রেসের পতাকা তলে দাঁড়িয়ে, বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক বা আঞ্চলিক দলের হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হয় (Republic Day)।
ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে দুটি বড় ঘটনা ঘটে গিয়েছে। একটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয়টি রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এই দুটি ঘটনা কিন্তু ভারতীয় জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকে যেমন জাগ্রত করেছিল তেমনই তারা বুঝতেও পেরেছিল যে কোনও উপনিবেশিক শক্তি অপরাজেয় নয়। এই চেতনা তাদের উদ্দীপ্ত করেছিল, সাহসী করে তুলেছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর লাহোর কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে দেশকে স্বাধীন করার এবং নিজেদের মুক্ত করার জন্য পূর্ণ স্বরাজের অঙ্গীকার নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়।
এটা ছিল ব্রিটিশ সরকারকে অস্বীকার করার একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। এই অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হল যে যতদিন না পর্যন্ত পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া যায়, ততদিন পর্যন্ত ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেস এই দিনটিকে প্রতীকী স্বাধীনতা দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে পালন করবে। তারপর ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এই দিনটিকে বিশেষভাবে মর্যাদা দেওয়ার জন্য ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারতের সংবিধান এই দিনটিতেই সাংবিধানিক সভার অনুমতি পায়। এবং তা কার্যকর করা হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি। সেই থেকে স্বাধীন ভারতবর্ষে এই দিনটি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে (Republic Day)।
এখানে আমাদের প্রশ্ন এবং আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। ১৯২৯ সালে আমরা ছিলাম ব্রিটিশ রাজের প্রজা— রাজা বা রানি নয়, প্রজাদের অধিকার রক্ষার্থে প্রজাতন্ত্র শব্দটি হয়তো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রজাদের প্রতিবাদী একটি পরিকল্প। কিন্তু স্বাধীন ভারতবর্ষের যে সংবিধান সেখানে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে সাধারণতন্ত্রের কথা। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘রিপাবলিক’। এখানে একটি কথা বুঝতে হবে— তা হল ‘সিটিজেন’ অর্থাৎ নাগরিক এবং ‘সাবজেক্ট’ অর্থাৎ প্রজা। আমাদের ভারতবর্ষ থেকে রাজা বা রানির শাসন অবসিত হল ঠিকই কিন্তু আমরা ‘প্রজা’ থেকে ‘নাগরিক’ হলাম না এখনও। তা ছাড়া ভারতীয় সংবিধানে গণতন্ত্রকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে— বলা যায় ভারতীয় শাসনতন্ত্রের প্রাণ ভোমরা হল এই গণতন্ত্র।
সেই গণতন্ত্রের ‘গণ’ অর্থাৎ জনগণ— অর্থাৎ নাগরিকরাই সর্বেসর্বা। গণতন্ত্রের মূল কথাটি আগেই খুবই গভীর অর্থে আব্রাহাম লিঙ্কন উচ্চারণ করেছেন। গণতন্ত্র মানে জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন। সেই গণতন্ত্রের বর্তমান স্বরূপটি কি? তা অন্যত্র আলোচনা সাপেক্ষ। কিন্তু এখানে পরিষ্কার যে জনগণ অর্থে দেশের নাগরিক। বর্তমান ভারতীয় শাসন ব্যবস্থায় আজ আমরা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের নাগরিক।। সেক্ষেত্রে ‘প্রজা’ শব্দটি ব্যবহার করে প্রজাতন্ত্র দিবস নামের এই উৎসব কতটা যুক্তিসঙ্গত এই প্রশ্ন আজ দানা বাঁধছে। অথচ এ প্রজাতন্ত্র দিবসকে ইংরেজিতে ‘রিপাবলিক ডে’ বলা হয়। আবার বাংলাতে ‘সাধারণতন্ত্র দিবস’ও বলা হয়। এই সাধারণতন্ত্র দিবস নামের মধ্যে কোনও আপত্তি থাকার কথা নয় (Republic Day)।
এই কলমচিরও নেই। তা হলে পুরোপুরি ভাবে এবং সর্বত্র ‘সাধারণতন্ত্র দিবস’ এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হোক। তা হলে আমদের নাগরিকের সঠিক মর্যাদা যেমন রক্ষিত হবে তেমনই ‘প্রজা’ হয়ে থাকার মানসিক হীনাবস্থা থেকে মুক্তির স্বাদ পেতে কোনও অসুবিধা হবে না। এই প্রস্তাব কার্যকরী হলে পুরোপুরি ভাবে এবং সর্বত্র ‘সাধারণতন্ত্র দিবস’ এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা যেতে পারে এবং করা উচিত। ‘প্রজাতন্ত্র দিবসের’ ধারণা আমাদের মস্তিষ্ক ও চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করলে ক্ষতি কি? আমাদের চেতনায় সব সময় এটাই জাগরুক থাকুক যে আমরা একটা রাষ্ট্রের নাগরিক। প্রজা নই।