চিত্র- AI
সুকান্ত পাল: প্রাচীন ভারতের দুটি উল্লেখযোগ্য মহাকাব্য হলো রামায়ণ ও মহাভারত। এই রামায়ণে বিধৃত আছে আমাদের জীবনের এক সার্বিক প্রতিচ্ছবি। ঐতিহাসিক ভিডি মহাজন লেখেন, ‘… the epics appeal to the people of every class. They are a kind of mine whose treasures have been used by dramatists, poets and story – tellers. Even greatest critics do not deny the fact that the stories told in the epics may be magnified echoes of some historical events.’
নিরেট পাথুরে ইতিহাস বলতে যা বোঝায় সেই অর্থে এই মহাকাব্যের বিচার করা উচিত নয়। কিন্তু এ মহাকাব্যের মধ্যে রয়েছে সেই যুগের জীবনচর্চার একটি সামগ্রিক রূপ এবং আদর্শ। একে অস্বীকার করা যায় না। এই প্রসঙ্গে আমাদের রবীন্দ্রনাথের একটি দীর্ঘ উক্তির সাহায্য নিতেই হচ্ছে। দীনেশ চন্দ্র সেনের ‘রামায়ণী কথা’ র ভূমিকায় তিনি লেখেন, ‘… রামায়ণ-মহাভারতকে কেবলমাত্র মহাকাব্য বলিলে চলিবে না, তাহা ইতিহাসও বটে। ঘটনাবলীর ইতিহাস নহে; কারণ সেরূপ ইতিহাস সময় বিশেষকে অবলম্বন করিয়া থাকে, রামায়ণ-মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস। অন্য ইতিহাস কালে কালে কতই পরিবর্তিত হইল, কিন্তু এই ইতিহাসের পরিবর্তন হয় নাই।… রামায়ণে ভারতবর্ষ কি বলিতেছে, রামায়ণে ভারতবর্ষ কোন আদর্শকে মহৎ বলিয়া স্বীকার করিয়াছে, ইহাই বর্তমান ক্ষেত্রে আমাদের সবিনয়ে বিচার করিবার বিষয়।… রামায়ণের যে রস সর্বাপেক্ষা প্রাধান্য লাভ করিয়াছে তাহা বীর রস নহে, তাহাতে বাহুবলের গৌরব ঘোষিত হয় নাই, যুদ্ধ ঘটনাই তাহার মুখ্য বর্ণনার বিষয় নহে। … রামায়ণে দেবতা নিজেকে খর্ব করিয়া মানুষ করেন নাই, মানুষই নিজ গুণে দেবতা হইয়া উঠিয়াছেন।’
উপরের প্রেক্ষাপটে বর্তমান রামায়ণের রামকে নিয়ে যে ধরনের প্রচার এবং উদ্বেলতা জাতির মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতে কয়েকটি প্রশ্ন অবধারিতভাবে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। আমাদের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ রামায়ণ ও রামকে যেভাবে ঐতিহাসিকতা দান করেছেন– তার মর্মার্থ কী আদৌ আমাদের রাজনীতিবিদরা বুঝতে পেরেছেন? বিশেষ করে যারা তাদের রাজনীতির মধ্যে রামকে নিয়ে এসেছেন! রামকে কখনওই রবীন্দ্রনাথ একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বলে চিহ্নিত করেননি। এমনকি রামায়ণকেও পাথুরে ইতিহাস বলে বর্ণনা করেননি। তিনি যেটা বলতে চেয়েছেন– তা হল রামায়ণের সময়কালের চিত্রটা একটা ঐতিহাসিক চিত্র।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও গুরুতর। রবীন্দ্রনাথ সবদিক বিচার বিবেচনা করে রামায়ণের রামকে কিন্তু শুধুমাত্র বীর রসে এবং যোদ্ধাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আরও বৃহত্তর ও মহত্তম এক প্রান্তরে রামকে আবিষ্কার করেন তিনি। সেখানে কোনও মতেই কোনও বাহুবলের গৌরব ঘোষিত হয়নি। বরং মানুষের পরম ঔদার্যের কথাই ঘোষিত হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘মানুষই নিজ গুণে দেবতা হইয়া উঠিয়াছেন।’
কিন্তু বর্তমান ভারতের রাজনীতির দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা এর বিপরীত চিত্রটাই দেখতে পাই। ছোটবেলা থেকেই ভয় পেলে ‘রাম’ ‘রাম’ করে ভয় তাড়াতে আমরা অভ্যস্ত। এর অর্থই হল রাম এক নির্ভয়ের আশ্রয়, বিপদ থেকে রক্ষাকর্তা এবং ত্রাতা। সে আমাদের অন্তরের একান্ত আপনজন। কিন্তু এখন ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি শুনলেই কেন বুকের ভিতর কাঁপন জাগে তা ভাবতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এ দুটি শব্দের মধ্যে তো ভয়ের কোন কিছু নেই! তবু কেন ভয় জাগে মনে? আমার প্রাণের আপনজনের জন্য জয়ধ্বনিতে আমার হৃদয়, আমার আত্মার তো শান্তি পাওয়া উচিত! কিন্তু তার পরিবর্তে ওই ধ্বনি শুনলে বুকের ভিতর কাঁপন জাগে কেন? আসলে আপাত নিরীহ শব্দের মধ্যে এমন কিছু ধ্বনির বিস্তার, বিন্যাস এবং অর্থ চাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যা আমাদের ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে। তার উচ্চারণবিধি এমনভাবে বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে ভয় মিশ্রিত এক আনুগত্য আমাদের মনের মধ্যে বাসা বাঁধে।
এবার প্রশ্ন হল, কেন এমন করা হয়? কারণ কোনও ধর্মীয় ব্যক্তিকে নিয়ে যদি এমন একটি আবহাওয়া সৃষ্টি করা যায়– যার মধ্যে ভক্তির সঙ্গে ভয় জুড়ে গিয়ে একটা অধীনতাযুক্ত মানসিকতা তৈরি করা যেতে পারে তবে রামকে নিয়ে যারা রাজনীতির ময়দানে নেমেছে তাদের আখেরে লাভ হবে। এটা একটি মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসন। এই আগ্রাসনকে সঙ্গী করেই তারা জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রটিকে যেমন কালিমালিপ্ত করতে চান তিনি পক্ষান্তরে সবার প্রাণের প্রিয় মানুষটিকে (সচেতনভাবে ‘মানুষ’ শব্দটি ব্যবহার করলাম) অর্থাৎ রামকেও কলিমালিপ্ত করে চলেছেন– এই বোধ তাদের আছে কিনা সে বিষয়ে প্রবল সন্দেহ জাগে।
রামকে নিয়ে যে উন্মাদনা রাজনীতির মঞ্চে এখন দেখা যাচ্ছে তা দশ বছর আগেও ছিল না। আসলে এই বাংলায় কৃত্তিবাসী রামায়ণের রাম একজন অতি সাধারণ মানুষ যার মধ্যে প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা এবং সহমর্মিতা ও প্রজা বাৎসল্যই প্রধান গুণ। এই রাম আমাদের চির পরিচিত রাম। রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত রাম। রাজনীতিবিদদের রামকে আমরা চিনি না। রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়েই এই প্রবন্ধের সমাপ্তি টানব। তিনি বলেন, ‘রামায়ণের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, তাহা ঘরের কথাকেই অত্যন্ত বৃহৎ করিয়া দেখাইয়াছে। … রামায়ণের মহিমা রাম রাবণের যুদ্ধকে আশ্রয় করিয়া নাই, সেই যুদ্ধঘটনা রাম ও সীতার দাম্পত্য প্রীতিকেই উজ্জ্বল করিয়া দেখাইবার উপলক্ষ মাত্র।’ অতএব রামের নামে বাহুবলের যে আস্ফালন তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অনভিপ্রেত।