ad
ad

Breaking News

পুজো আসছে, বেহাল মেট্রোর অবস্থা নিয়ে উদ্বেগে সবাই

সেইসময় রাজ্যের শাসকদল সিপিএম নিত্যদিন মেট্রো নিয়ে যেসব অশান্তি করত, এমনকি বর্ষায় রাস্তায় জল জমলে মেট্রোর সুড়ঙ্গতে সেই জল ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো— সেই সব কিছুকে অতিক্রম করে বরকত গণি খান চৌধুরী কলকাতাকে মেট্রো এনে দিয়েছিলেন।

চিত্রঃ নিজস্ব গ্রাফিক্স

সুমন ভট্টাচার্য: যে যে কারণে শিরোনামে থাকা উচিত নয়, প্রায় সবকটা কারণে এই মুহূর্তে কলকাতা মেট্রো শিরোনামে। একদিকে যখন মেট্রোর দক্ষিণেশ্বর স্টেশনে এক স্কুল ছাত্রকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে খুন করছে আর এক স্কুল ছাত্র, ঠিক তখনই রোজকার যাত্রীদের মেট্রো পরিষেবা নিয়ে নাজেহাল অবস্থা। নির্বাচনের আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে মেট্রোর সবকটি সম্প্রসারিত লাইন চালু করে দিয়েছেন বটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু যাত্রীরা নিত্যদিন অভিযোগ করছেন বেহাল পরিষেবা নিয়ে। বিশেষ করে শহরের যেটা ‘ব্লু লাইন’, অর্থাৎ, যেটা উত্তর থেকে দক্ষিণকে চিরে দক্ষিণেশ্বর থেকে গড়িয়া পর্যন্ত যোগাযোগের মূল লাইন, সেই লাইনটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমস্যা। (Kolkata Metro) একদিকে যখন প্রান্তিক স্টেশনটি ভেঙে গিয়েছে, অর্থাৎ, নিউ গড়িয়ার সঙ্গে রেল সংযোগের স্টেশনটি ভেঙে পড়েছে, তখন অন্য যে স্টেশনটিকে অর্থাৎ, শহিদ ক্ষুদিরাম মেট্রো স্টেশনটিকে প্রান্তিক স্টেশন বলে ব্যবহারের কথা ছিল, সেই স্টেশনটিকে প্রান্তিক স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করতে, অর্থাৎ, ট্রেনগুলিকে ঘুরিয়ে আনতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। তার কারণে মেট্রো কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বটে। মহানায়ক উত্তমকুমার, অর্থাৎ, টালিগঞ্জ স্টেশন থেকে কিছু ট্রেন দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত চালানো হবে। কিন্তু তাতেই বা সমস্যা মিটছে কোথায়? নিত্যদিনের ঝামেলা, কামরায় উঠতে না পারা, অত্যধিক ভিড়, ঠিক সময়ে ট্রেন চালাতে না পারা— এই সবই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কলকাতা মেট্রোর নিত্যদিনের হেডলাইন। তার উপরে শুক্রবার একেবারে দিনেদুপুরে দক্ষিণেশ্বর মেট্রোয় এক স্কুল ছাত্র আর এক স্কুল ছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। এই যদি মেট্রোর নিরাপত্তার হাল হয়, তা হলে সামনে যখন পুজো আসছে, যখন প্রতিদিন কয়েক লক্ষ মানুষ অতিরিক্ত যাতায়াত করবে, তখন মেট্রো কতটা নির্ভরযোগ্য পরিবহণ হয়ে উঠতে পারবে? ইতিমধ্যেই বাঙালিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় বাংলা সম্মেলন এই বিষয়ে মেট্রো কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু তাতেই বা সমস্যা মিটছে কোথায়?

আরও পড়ুনঃ পুজোর আগে দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির ইঙ্গিত! হাওয়া অফিসের বার্তা জেনে নিন এখনই

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে যথেষ্ট বিশ্বাসঘাতকের মতো ব্যবহার পাওয়ার পরে নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি চিনের দিকে ঝুঁকেছেন। পুতিন এবং শি জিন পিং-এর অক্ষে তিনি নিজেকেও জুড়ে নিতে সমর্থ হয়েছেন। নয়াদিল্লি এবং বেজিংয়ের মধ্যে এই নতুন করে ‘বন্ধুত্ব’ পাতানোর সময়ই কলকাতা মেট্রোর জন্য চিনের থেকে চারটি ডালিয়ান থেকে রেক এসে পৌঁছেছে। সেই চারটি ডালিয়ানের থেকে আনা রেক কি কলকাতা মেট্রোর সমস্যা মেটাতে পারবে? অর্থাৎ, ‘ব্লু লাইন’ -এ (Kolkata Metro) রোজ যাত্রীদের যে নাজেহাল অবস্থা হচ্ছে, যেভাবে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে দিনের পর দিন ট্রেন বাতিল করতে হচ্ছে বা দেরিতে চালাতে হচ্ছে, তার সমস্যা কি মিটবে? আমরা কেউ জানি না। সামনে পুজো আসছে। পুজোর সময় অতিরিক্ত ট্রেন চালানোর কথা। কিন্তু পুজোর যখন ঠিক দুই সপ্তাহ বাকি, তখনও কলকাতা মেট্রো জানাতে পারেনি যে, তাদের পুজোর সময়ের জন্য কী অতিরিক্ত পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, পুজোতে কলকাতা যদি সত্যি সত্যি কল্লোলিনী তিলোত্তমা হয়ে ওঠে, যে পুজোয় মহাষ্টমী বা মহানবমীতে শহরে মানুষের ঢল নামে, সেই মহাষ্টমী বা মহানবমীর ভিড় সামলাতে মেট্রো কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা কী? মেট্রো এখনও যেমন জানায়নি, পুজোর সময় কত মিনিট অন্তর মেট্রো চালানো হবে, তেমনই জানায়নি যে, পুজোর সময় কত জোড়া অতিরিক্ত ট্রেন চালানো হবে। বা পুজোর সময় ঠিক রাত্রিবেলা কতক্ষণ পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা দেবে। রীতি অনুযায়ী পুজোর সময় মেট্রো প্রায় সারারাতই চালানো হয়। এবারও কি কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষ সেই রীতিকে বজায় রাখতে পারবে? নাকি ডালিয়ান থেকেও রেক এনেও কলকাতা মেট্রো যাত্রীদের এই নাজেহাল অবস্থার কোনও উন্নতি ঘটাতে পারবে না? পুজোর আগে বাঙালি অবশ্যই এইসব প্রশ্নের উত্তর চায়। জাতীয় বাংলা সম্মেলনের পক্ষ থেকে চিঠি লিখে সভাপতি সিদ্ধব্রত দাস মেট্রো যাত্রীদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা করতে বলেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, এর আগে বাঙালি অধিকার রক্ষা সংগঠনের জন্য কাজ করা এই জাতীয় বাংলা সম্মেলন দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনের সামনে মিছিল করে, পোস্টার নিয়ে মেট্রো যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিল।

লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/Banglajagotvofficial

আসলে কলকাতা মেট্রো (Kolkata Metro) ঠিক কোন সমস্যায় পড়ে গিয়েছে? সত্যি কথা বলতে গেলে কী, বিজেপি কলকাতা মেট্রোকে ব্যবহার করে বা নরেন্দ্র মোদির চারটি লাইনের সম্প্রসারিত পথ উদ্বোধনকে ব্যবহার করে যে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চেয়েছিল, তা ‘বুমেরাং’ হয়ে কেন্দ্রীয় শাসক দলের দিকেই ধেয়ে গিয়েছে। একদিকে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিয়েছেন কলকাতার মেট্রো লাইনগুলির জন্য তিনি যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন কতটা বরাদ্দ করেছিলেন। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি বেমালুম ভুলে গিয়েছিল বরকত গণি খান চৌধুরীর কলকাতা মেট্রোর জন্য অবদান কতটা। কলকাতা মেট্রো সম্ভব হয়েছিল বরকত গণি খান চৌধুরী রেলমন্ত্রী থাকার জন্যে। সেইসময় রাজ্যের শাসকদল সিপিএম নিত্যদিন মেট্রো নিয়ে যেসব অশান্তি করত, এমনকি বর্ষায় রাস্তায় জল জমলে মেট্রোর সুড়ঙ্গতে সেই জল ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো— সেই সব কিছুকে অতিক্রম করে বরকত গণি খান চৌধুরী কলকাতাকে মেট্রো এনে দিয়েছিলেন। বিধান রায়ের স্বপ্নকে সাকার করে তিনি ভারতবর্ষের মধ্যে প্রথম শহর হিসেবে কলকাতাকে মেট্রো উপহার দিয়েছিলেন। কলকাতা মেট্রো এখন আড়ে এবং বহরে অনেক দিক থেকে বেড়েছে। ‘ব্লু লাইন’ যেমন দক্ষিণেশ্বর থেকে গড়িয়াকে জোড়ে, তেমনই হাওড়া থেকে সেক্টর ফাইভ অবধিও মেট্রো চলাচল চালু হয়েছে। বহু বাধাবিঘ্ন কাটিয়ে শিয়ালদা থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মেট্রোর সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। স্বভাবতই শিয়ালদা থেকে হাওড়া জুড়ে যাওয়ায় ওই লাইনের বাসগুলি মুখ থুবড়ে পড়েছে, তেমনই মেট্রোয় যাত্রী চলাচল বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ‘ব্লু লাইন’ অর্থাৎ, উত্তর থেকে দক্ষিণের লাইন এবং হাওড়া থেকে সেক্টর ফাইভের লাইনে যে সংখ্যক যাত্রী চলাচল করছে, তাদের পরিষেবা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো কি মেট্রোর আছে? অর্থাৎ, যথেষ্ট পরিমাণের রেক কি মেট্রো কর্তৃপক্ষের হাতে আছে? কিংবা ভিড়ের সময় ভিড় সামলানোর জন্য স্টেশনগুলিতে যথেষ্ট টিকিট কাউন্টার বা ভেন্ডিং মেশিন কি আছে? এখনও পর্যন্ত যা অবস্থা, তা হয়তো নেই। এতটাই অসহায় অবস্থা কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষের যে, তারা বলে দিয়েছে পুজোর সময় অ্যাপ দিয়ে টিকিট কাটলেই ভাল। কারণ, অনেক টিকিট কাউন্টার সেইসময় বন্ধ থাকবে। প্রশ্ন হচ্ছে, পুজোর সময় গ্রাম বা শহরতলি থেকে বহু মানুষ কলকাতায় পুজো দেখতে আসেন। তাঁরা কতটা অ্যাপের বিষয়ে স্বচ্ছন্দ বা অ্যাপ ব্যবহার করে টিকিট কাটতে পারবেন? তা হলে কি মেট্রো কর্তৃপক্ষ চান না পুজোর সময় গ্রাম বাংলার মানুষ বা শহরতলির মানুষ এসে মেট্রো ব্যবহার করুন বা মেট্রো ব্যবহার করে তাঁরা শহরে ঠাকুর দেখুক?

 

রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস মাঝেমধ্যেই বলে থাকে, যে বিজেপি আসলেই ‘হিন্দু বিদ্বেষী’। হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে কলকাতা মেট্রোর (Kolkata Metro) যা প্রস্তুতি বা যা অবস্থা, তা দেখে এইরকম সংশয় হতেই পারে। জাতীয় বাংলা সম্মেলনের পক্ষে দেবারতি সরকার, হিমাদ্রী বটব্যালরা রীতিমতো পোস্টার, ব্যানার নিয়ে মেট্রো স্টেশনগুলির সামনে দাঁড়িয়ে এই অব্যবস্থাগুলির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ‘বাঙালি অস্মিতা’র স্বার্থে লড়া জাতীয় বাংলা সম্মেলন না হয় প্রতিবাদ জানাল, ডেপুটেশন দিল। কিন্তু মেট্রো কর্তৃপক্ষের কি হুঁশ ফিরেছে? তারা কি বুঝেছে যে পুজোর আগে তারা যদি এরকম বেহাল পরিষেবা নিয়ে হাজির থাকে, তা হলে যাত্রীদের বা পুজো উপলক্ষে আসা দর্শনার্থীদের ঠিক কতটা অসুবিধা হবে? এখনও পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। কারণ, কলকাতা মেট্রো এখনও অবধি জানাতেই পারেনি পুজোর সময় তাদের ঠিক কী ধরনের পরিষেবা থাকবে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে মেট্রোতে নিরাপত্তা নিয়ে। যদি দু’জন স্কুল ছাত্র একে অপরের সঙ্গে মেট্রো চত্বরে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে একে অপরকে ছুরি চালিয়ে খুন করতে পারে, তা হলে মেট্রোতে নিরাপত্তা আসলে কতটা? এই যে পুজোর সময় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করবেন, তারা মেট্রো ব্যবস্থায় নিরাপত্তা পাবেন তো? কেউ আমরা নিশ্চিত নই। কিন্তু আমরা সবাই চাই পুজো নির্বিঘ্নে কাটুক, পুজোয় বাঙালি আনন্দ করুক। পুজো তো শুধুমাত্র বাঙালি হিন্দুর নয়, সেই বিখ্যাত স্লোগানটার অনুযায়ী, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। সেই উৎসবের সময় যদি কলকাতা মেট্রো এরকম আতঙ্কের চেহারায় থাকে। যদি নিত্যদিন যাত্রীদের বেহাল হতে হয়, তা হলে তো চিন্তা থাকবেই। আমাদের আশা এবং প্রার্থনাও, কলকাতা মেট্রো যেন পুজোর সময় যাত্রী পরিষেবা দিতে কসুর না করে। রাজনৈতিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে যেন কেন্দ্রীয় সরকার কলকাতা মেট্রোর জন্য সুবন্দোবস্ত করে। শুধুমাত্র চিনের ডালিয়ান থেকে রেক আনলে তো সমস্যা মিটবে না। চাই অতিরিক্ত টিকিট কাউন্টার, চাই ভেন্ডিং মেশিন, চাই মেট্রো চালানোর জন্য এবং নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট কর্মী সংখ্যা। সেই সব কিছু ঠিক থাকলেই পুজোয় নির্বিঘ্নে, নিরাপদে চলবে মেট্রো।