চিত্র: প্রতীকী
সত্যগোপাল দে (সাংবাদিক, নারী ও শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর): যতই বলুন, ‘আর রাজনীতিতে নেই,’ কিংবা ‘যত ঝামেলার কারণ এই রাজনীতিই’, একবার গভীর করে ভেবে দেখেছেন, রাজনীতির বাইরে কি আমাদের জীবন আদৌ সম্ভব (Political Thought)?
আমরা অনেকেই আধুনিক জীবনের নিত্যদিনের কোলাহলে রাজনীতিকে কেবলই ক্ষমতার লড়াই, কাদা ছোড়াছুড়ি বা ভোট নামক একটি দিন হিসেবে দেখি। এক ধরনের বিতৃষ্ণা বা নিস্পৃহতা আমাদের গ্রাস করে। কিন্তু যদি ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখি, তা হলে দেখব আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল এক চিরন্তন সত্য উচ্চারণ করে গেছেন, যা আজও আমাদের সমাজে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এরিস্টটলের সেই মূলমন্ত্র—
‘মানুষ স্বভাবতই একটি রাজনৈতিক প্রাণী।’ এমনটা বলেছিলেন অ্যারিস্টটল। তাঁর মতে, রাষ্ট্র কোনও কৃত্রিম সৃষ্টি নয় বরং এটি একটি প্রাকৃতিক সংগঠন। মানুষের সহজাত সামাজিকতা এবং যুক্তি-বুদ্ধির মাধ্যমেই এই কাঠামো তৈরি হয়, যার মূল উদ্দেশ্য হল— নাগরিকদের একটি ‘উৎকৃষ্ট ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন’ যাপন করতে সক্ষম করা।
রাজনীতি কেন আমাদের নৈতিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য?
অ্যারিস্টটল তাঁর তত্ত্বে বলেছিলেন, রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেই মানুষ তার নৈতিক ও বুদ্ধিগত বিকাশ ঘটাতে পারে। একজন ব্যক্তি তখনই পূর্ণাঙ্গ ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে, যখন সে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে অংশ নেয়, অর্থাৎ রাজনীতিতে অংশ নেয়। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র বিষয়— রাস্তা, আলো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, এমনকী বাজার থেকে কেনা পণ্যের দাম— সবকিছুর শিকড় কিন্তু এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যেই নিহিত (Political Thought)।
সুতরাং, আপনি যখন রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন, তখন আপনি কেবল ‘ঝামেলা’ এড়িয়ে যান না, বরং আপনার নৈতিক বিকাশের সুযোগ এবং একটি ‘উৎকৃষ্ট জীবন’-এর অধিকার প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন।
‘নাগরিক মন‘
রাজনীতি চিরকালই আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের এই উপমহাদেশে সকাল থেকে রাত— গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান থেকে অফিস-আদালত সবখানেই রাজনৈতিক আলোচনায় সরগরম। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, প্রকৃত রাজনীতি— অর্থাৎ সমাজকে সুচারুভাবে পরিচালিত করার জন্য যে ধারাবাহিক চিন্তা-জ্ঞান-প্রজ্ঞা-যুক্তি এবং কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন, সেই রাজনীতি দেশে দুর্লভ। রাজনীতির সংকীর্ণ অর্থ হল দলীয় রাজনীতি। সমস্যার মূল এখানেই; আমরা আলোচনায় রাজনৈতিক, কিন্তু কাজে এবং আচরণে প্রায়ই অরাজনৈতিক।
আমাদের দেশের বোদ্ধা মানুষজনও প্রায়শই ভাবেন, রাজনীতি মানে কেবল দলীয় এবং ভোটের রাজনীতি। তারা ভুলে যান যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বস্তুত একটি গভীর বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ। অ্যারিস্টটল যে ‘উৎকৃষ্ট জীবন’-এর কথা বলেছিলেন, তা কোনও বিচ্ছিন্ন আবেগ বা স্লোগানের ফল নয়; বরং সুচিন্তিত, যুক্তিভিত্তিক এবং ধারাবাহিক প্রজ্ঞার ফসল (Political Thought)।
প্রজ্ঞা অর্জনে অনীহা— আমাদের জাতীয় দুর্বলতা
প্রকৃত রাজনীতির জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান। প্রয়োজন ইতিহাস জানা এবং তা নিয়মিত চর্চা করা। কেবল নেতাকেন্দ্রিক বক্তৃতা শোনা, নির্বাচিত পত্রিকা পড়া বা দু-একটি বই উল্টে দেখা কিংবা, টিভির পর্দায় ঘণ্টা খানেক টিআরপি বাড়ানোর বাকবিতণ্ডা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা জন্ম নেয় না। এর জন্য ইতিহাসকে পড়তে হয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হয় এবং সেই শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়।
আমাদের জাতীয় চরিত্রের অন্যতম দুর্বলতা হল দায়িত্বে অনীহা। রিকশাচালক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত অনেকে নিজের কাজটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে করেন না। রাজনীতি নিয়ে সবার আলোচনা আছে, মতামত আছে, কিন্তু নিজ নিজ পেশাগত দায়িত্বের প্রতি দায়বদ্ধতা কম।
আবেগ যখন যুক্তির স্থলাভিষিক্ত হয়
অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন— এই ক্ষেত্রগুলোতে একজন নাগরিকের যতটা সচেতনতা থাকা দরকার, ততটা নেই। ফলে রাজনীতি হয়ে যায় অন্ধ আবেগের খেলা।
যে কারণে অপপ্রচার, ভুয়ো খবর সবচেয়ে সহজে সমাজে প্রভাব ফেলে। সাধারণ মানুষ যুক্তির বদলে আবেগে ভেসে যায়, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায় ও অস্থিরতা জন্ম দেয়। আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হয়, অপরাধ বাড়তে থাকে এবং গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে আসে (Political Thought)।
সহনশীলতার অভাব ও গণতন্ত্রের বিনাশ
ফরাসি দার্শনিক শার্ল মোর্যাস বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের মতের প্রতি সহনশীল নয়, সে কখনও সত্যিকার রাজনৈতিক বুদ্ধি অর্জন করতে পারে না।’
এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ কথার সত্যতা ভীষণভাবে প্রমাণিত। ক্ষমতার লোভে যখন অযোগ্য মানুষ নেতৃত্বে উঠে আসে, তখন তারা প্রতিপক্ষের মতকে সহ্য করতে পারে না। ফলে রাজনীতিতে ক্রমে বাড়ে প্রতিহিংসা, গালি-গালাজ ও হিংস্রতা।
এর পরিণতিতে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ‘মতপার্থক্যের প্রতি সম্মান’ ধ্বংস হয়। রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, সঙ্কট মুহূর্তেও মহান নেতারা প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন, ঐক্য গড়েছেন। কিন্তু যখন জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নয়, কেবল ক্ষমতা দখলই মুখ্য হয়, তখন সেই সহযোগিতার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
একটি সুস্থ রাজনৈতিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠা— এই দুটি গুণই কেবল আলোচনায় নয়, বরং নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
আমাদের দেশের রাজনীতিতে যেন উচ্ছৃঙ্খলতা, অশান্তি এবং অসহিষ্ণুতা এক নিত্যদিনের চিত্র। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে নাগরিকদের মতবিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করা জরুরি। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই প্রখ্যাত উক্তি আজও রাষ্ট্র ও সমাজে দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক— ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি হয়তো একমত নাও হতে পারি; কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে যাব (Political Thought)।’
বাকস্বাধীনতাই রক্ষাকবচ
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার, সাম্য, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অসম্ভব। সুতরাং, সুষ্ঠু ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। এই স্বাধীনতা ছাড়া সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির সমন্বয়ে রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব নয়। এর অনুপস্থিতি মানুষের চিন্তা, মতামত ও সৃজনশীলতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, যা সমাজের ন্যায়বিচার ও সাম্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সবার কথা শোনা এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি, যা কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমেই সম্ভব।
পরিমিতিবোধ ও ভদ্রতা— নেতৃত্ব বিকাশের প্রধান শর্ত
রাজনীতিতে সুস্থতা আনতে প্রয়োজন দুটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ পরিমিতিবোধ ও ভদ্রতা। এর অর্থ হল আবেগ, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে ভারসাম্য রাখা। এটি অযৌক্তিক উত্তেজনা থেকে দূরে রাখে এবং দলীয় স্বার্থকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে। ভদ্রতা হল মতবিরোধ থাকলেও সংলাপ, যুক্তি ও সহিষ্ণুতার পথ অবলম্বন করা।
এই গুণগুলির অভাবে রাজনীতিতে দ্রুত অস্থিরতা, বিভাজন ও উস্কানিমূলক আচরণ ছড়িয়ে পড়ে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে একজন নেতাকে অবশ্যই এই দুটি গুণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। যে নেতা নিজের দলের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে ওপরে রাখেন, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করেন এবং আলোচনার পথ খুঁজে নেন— তাঁর নেতৃত্বেই জনগণ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও প্রগতির দিকে অগ্রসর হয়।
ভদ্রতা দুর্বলতা নয়, নেতৃত্বের শক্তি
ভদ্রতা ও শালীনতা একজন নেতাকে বৃহত্তর জনগণের আস্থা এনে দেয়। ইউরোপ-আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষকে তীব্র সমালোচনা করা হয়, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অশালীন আচরণ একদা বিরল ছিল। রাজনীতিতে ভদ্রতা ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যেও মানবিকতা ধরে রাখে— প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে। অ্যারিস্টটলের দেখানো ‘উৎকৃষ্ট জীবন’ অর্জনের জন্য রাজনৈতিক ভদ্রতা এবং সহিষ্ণুতার চর্চা ছাড়া কোনও বিকল্প নেই (Political Thought)।
সহনশীলতার উত্তরাধিকার— সৌজন্যই শক্তি
রাজনীতি হল মানব সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্প; আবার একই সঙ্গে এটি সবচেয়ে জটিল ও কঠিন সমাজবিজ্ঞান। এখানে আবেগ আছে, স্বপ্ন আছে, আবার ঠান্ডা মাথার হিসাব-নিকাশও আছে। কিন্তু রাজনীতির মূল শক্তি নিহিত থাকে পরিমিতিবোধে— অর্থাৎ কখন এগোতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন আপস করতে হবে আর কখন আপসহীন থাকতে হবে, সেটি সঠিকভাবে বুঝতে পারার মধ্যে।
অতিরিক্ত ক্রোধ যেমন ধ্বংস ডেকে আনে, তেমনই অতিরিক্ত দুর্বলতাও সর্বনাশ ডেকে আনে। এই প্রজ্ঞা জন্মগত নয়; এটি আসে দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্ম, অভিজ্ঞতা, জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ও লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সত্যিকারের নেতা সেই ব্যক্তি, যিনি দলীয় স্বার্থ ছাড়িয়ে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, জনগণের কণ্ঠ শোনেন এবং সমস্যা সমাধানে সক্রিয় থাকেন। যে নেতা নিজের আদর্শ ও নৈতিকতা ধরে রেখে জনগণের আস্থা অর্জন করেন, তাঁর নেতৃত্বেই সমাজ এগোয়।
পরিপূর্ণ রাজনীতিক তিনি, যিনি নিজের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের মতকে সম্মান জানাতে পারে। রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং মানুষের স্বপ্ন পূরণের উপায়। ক্ষমতায় যাওয়া মানে, রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটানো। এই সহনশীলতা কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং একটি দার্শনিক অবস্থান।
সৌজন্যের সেতু— আদর্শগত মতভেদ সত্ত্বেও শ্রদ্ধার ঐতিহ্য
রাজনীতির আদর্শগত মতভেদ থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার যে ঐতিহ্য ভারতের রাজনীতিতে একসময় ছিল, তা আজ শিক্ষণীয়। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পরবর্তীকালের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ছিলেন আদর্শগতভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। তা সত্ত্বেও নেহরু জনসভায় তরুণ বাজপেয়ীর বাগ্মিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। বিদেশের ডেলিগেশনে তাঁকে মনোনীত করেছেন। এই সৌজন্যই প্রমাণ করে, প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং জাতীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণের সহযাত্রী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি ছিল।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল দুই প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন কংগ্রেসের ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এবং কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু। কিন্তু ভিন্ন আদর্শের হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক। রাজ্যের স্বার্থে তাঁরা একাধিকবার এক টেবিলে বসে আলোচনা করেছেন, যা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (Political Thought)।
তৃণমূল নেত্রী এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বামপন্থী সরকারের কট্টর সমালোচক এবং তাঁর নেতৃত্বে বাম জমানা শেষ হওয়া সত্ত্বেও প্রয়াত জ্যোতি বসুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল প্রশ্নাতীত। জ্যোতি বসুকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা— অসুস্থ জ্যোতি বসুকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া একই ভাবে পুর্বসূরি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া। তাঁদের প্রয়াণের পর শোকপ্রকাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিব্যক্তি প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকে কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিসরে সৌজন্য ও মানবতা বজায় রাখা সম্ভব। এছাড়া দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু এবং সির্ধার্থ শঙ্কর রায় তাঁদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব রাজনৈতিক মতপার্থক্য থেকে সব সময় দূরে রেখেছেন।
বুদ্ধি, যুক্তি ও শিষ্টাচার
এই তিনটি বিষয় রাজনীতিকে উচ্চতর স্থানে নিয়ে যায়। এগুলো হারালে, রাজনীতি যখন হয়ে যায় কেবলই প্রতিহিংসার খেলা তখনই জনগণ রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শুরু করে। আজকের যে ভাষাগত অবক্ষয় চলছে, তা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মৃত্যু নয়; এটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলছে। রাজনীতি সমাজের আয়না। নেতারা যেমন ভাষা ব্যবহার করেন, সমাজও তেমন ভাষা শিখে নেয়। রাজনীতিতে মতভেদ থাকবে, বিরোধ থাকবে। রাজনীতি হল মানবমুক্তির সার্বিক লড়াই। এখানে পরিমিতিবোধ ও ভদ্রতা কেবল একটি কৌশল নয়, বরং এটি এক নৈতিক দর্শন (Political Thought)।