ad
ad

Breaking News

Narendra Modi

অতি চালাকি করতে গিয়েই প্যাঁচে পড়েছেন নরেন্দ্র মোদি

লক্ষ্যণীয় সামনেই তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন।

political-analysis-modi-bill-defeat

চিত্র- সংগৃহীত

Bangla Jago Desk: রন্তিদেব সেনগুপ্ত: লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ এবং আসন পুনর্বিন্যাস বিল পাশ করাতে ব্যর্থ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শনিবার রাতেই জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দিয়েছেন। ভাষণটি যাঁরা শুনেছেন তাঁরাই বুঝতে পারবেন, এই ভাষণ জাতির উদ্দেশে একজন প্রধানমন্ত্রীর বলা কথা যতটা না, তার থেকে বেশি সম্মুখ সমরে পরাজিত একজন রাজনীতিকের তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি তীব্র আক্ষেপ এবং আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ। প্রধানমন্ত্রী নন, দলীয় নেতা হিসেবেই নরেন্দ্র মোদি শনিবার রাতে ভাষণ দিয়েছেন। সরকারি গণমাধ্যম ব্যবহার করে একজন প্রধানমন্ত্রীর এইরকম দলীয় ভাষণ দেওয়াটা কতটা শোভনীয় সে প্রশ্নে আর যাচ্ছি না। কারণ, কোনটা শোভন আর কোনটাই বা অশোভন— প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতারা অনেকদিন আগেই তা বিস্মৃত হয়েছেন।               

শনিবার প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে মূল লক্ষ্যবস্তু করেছেন কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং ডিএমকে-কে। এইভাবে মহিলা সংরক্ষণ এবং তারই সঙ্গে আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিলটি আটকে যাওয়ায় এই তিন রাজনৈতিক দলকেই মোদি প্রধান শত্রু ঠাউরে যা বলার বলে গিয়েছেন। লক্ষ্যণীয় সামনেই তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন। এই দুই রাজ্যেই নির্বাচনে বিজেপির প্রতিপক্ষ এই তিনটি দল। তার মধ্যে তামিলনাড়ুতে ডিএমকে এবং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ। সদ্য সমাপ্ত অসম বিধানসভার নির্বাচনে কংগ্রেস ছিল বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ। শুধু নির্বাচন নয়, বিভিন্ন ইস্যুতে ডিএমকে এবং তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির প্রবল বিরোধিতা বরাবর করেছে। আর এখন এসআইআর পর্বে তৃণমূলের বিজেপি বিরোধিতা সর্বভারতীয় ক্ষেত্রেও নজর কেড়েছে।

মোদি শনিবার ভাষণ দিতে গিয়ে তাঁর এই তিন প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘এই বিল আটকে দিয়ে এরা ভ্রূণহত্যার মতো পাপ করেছে।’ বলেছেন, ‘আমরা মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলাম। ভবিষ্যতে সেই সুযোগ অনেক আসবে।’ কিন্তু কীভাবে সেই সুযোগ আসবে, বা এই বিষয়ে বিকল্প কী চিন্তা-ভাবনা সরকারের রয়েছে তা বলতে পারেননি মোদি। বিরোধীদের প্রতি কটূক্তি করা ছাড়া কোনও দিশাই তাঁর বক্তব্যে ছিল না। লোকসভার ভোটে ওভাবে পরাজিত হওয়ার পর শুক্রবার রাত থেকেই দলের নির্দেশে বিজেপির সাংসদরা বিরোধীদের আক্রমণ করতে ময়দানে নেমে পড়েন। তাঁরা অনেকেই হয়তো আশা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনও দিশা দেখা যাবে। বিকল্প কোনও পন্থা হয়তো প্রধানমন্ত্রী বাতলে দেবেন। ভাষণটি শোনার পর তাঁরা নিশ্চিতভাবেই হতাশ হয়েছেন বলাই যায়।

আসলে মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে নরেন্দ্র মোদি একটি অতি চালাকি করতে গিয়েছিলেন। সেই চালাকি ধরা পড়ে গিয়েছে। মোদি নিজেও বোধহয় ভাবতে পারেননি, তাঁর এমন একটি সুপরিকল্পিত চাল বিরোধীরা সম্মিলিতভাবে ভেস্তে দিয়ে যাবেন। তাঁর ১২ বছরের শাসনকালে এই প্রথম লোকসভায় কোনও বিল পাশ করাতে গিয়ে শাসক দল ভোটাভুটিতে পরাজিত হল। শুধু বিরোধীদের ভোটেই যে পরাজিত হল এমন নয়। যদি ভোটিং প্যাটার্নটা এবং এনডিএ-র প্রাপ্ত ভোট কেউ বিশ্লেষণ করেন তা হলে বুঝবেন এনডিএ শরিকদের ভিতরেও কেউ কেউ হয়তো ভোটদানে বিরত ছিলেন। এটা ভবিষ্যতে মোদি এবং বিজেপিকে অবশ্যই চিন্তায় রাখবে। লোকসভায় ভোটাভুটিতে এই পরাজয় রাজনৈতিকভাবে বিজেপির কাছে একটি বড় ধাক্কা। এই ধাক্কা সামলাতেও বিজেপির কিছুটা সময় তো লাগবেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, তড়িঘড়ি করে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করাতে বিজেপি এত ব্যস্ত হয়ে উঠল কেন? ২০২৩ সালেই সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ হয়েছিল। ওই বিলে তখন বিরোধীরা প্রায় সবাই সমর্থন জানিয়েছিল। ওই বিল পাশের যাবতীয় কৃতিত্ব মোদি নিজে নিতে চেয়েছিলেন। ওই বিলে বলা হয়েছিল, ২০২৬-এ জনগণনা সম্পূর্ণ হওয়ার পর ২০৩৪- এর লোকসভা নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কী এমন ঘটল যে, ২০২৩ সালে মোদি সরকারের আমলে যে বিল পাশ হয়ে গিয়েছে, আবার নতুন করে নতুন মোড়কে তাকে ঘুরিয়ে আনতে হল কেন? এখানেই নরেন্দ্র মোদির অতি চালাকিটি লুকিয়ে রয়েছে। ২০২৩-এর ওই মহিলা সংরক্ষণ বিলের সঙ্গে কোনও লেজুড় জুড়ে দেওয়া হয়নি। যে কারণে ওই বিলটি পাশ করাতে অসুবিধা হয়নি মোদি সরকারের। এবার সঙ্গে একটি লেজুড় জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তা হল লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস।

এবারের বিলটি শুধু মহিলা সংরক্ষণ বিষয়ক নয়। একে শুধুই মহিলা সংরক্ষণ বিল হিসাবে দেখাতে চেয়ে মোদি একটি তঞ্চকতার আশ্রয়ও নিয়েছেন। তিনি আড়াল করছেন যে, লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসও এর সঙ্গে জুড়ে দিয়ে বিলটি পাশ করাতে চেয়েছিল তাঁর সরকার। আসলে সবকিছু খোলসা করে বললে মোদির চালাকি সর্বসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়বে। অতএব অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ। সরকার পক্ষের বক্তব্য, মহিলাদের জন্য এক তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করতে হলে লোকসভার মোট আসন সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে বাড়িয়ে ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করতে হবে। বিজেপির আরও যুক্তি, এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হলে পুরুষ এবং অন্যান্যদের জন্য আসনের অনুপাত কমে যাবে। তা যাতে না হয় তার জন্য ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগেই মহিলা সংরক্ষণের স্বার্থে জনগণনার জন্য অপেক্ষা না করেই সংবিধান সংশোধন করে এই আসন পুনর্বিন্যাস আশু প্রয়োজন।

আপাতদৃষ্টিতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই বক্তব্যকে নিরীহ মনে হতে পারে। কিন্তু এর আড়ালে আসলে লুকিয়ে রয়েছে একটি রাজনৈতিক কৌশল। যে কৌশলটিকে আড়াল করতে মহিলা সংরক্ষণ বিলটিকে শিখণ্ডির মতো ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি নেতারা।

এই মুহূর্তে যদি লোকসভার আসন ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করা হয়, তা হলে রাজনেতিকভাবে কারা লাভবান হবে সেটা একটু বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করলে বুঝতে অসুবিধা হবে না। লোকসভার আসন এভাবে পুনর্বিন্যাস হলে হিন্দি প্রধান গোবলয়ের আসন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, হরিয়ানা, উত্তরভারতের গোবলয়— লোকসভার আসন বৃদ্ধিতে এদের লাভটাই বেশি হবে। তুলনায় অনেক কমে যাবে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু-সহ দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা। এতে একমাত্র লাভবান হবে বিজেপি। ২০২৯ -এর লোকসভা নির্বাচনের আগে এভাবে যদি আসন পুনর্বিন্যাস করে নেওয়া যায়, তাহলে ‘২৯-এর নির্বাচনে হিন্দি বলয়ের বর্ধিত আসনের জোরে লোকসভায় নিজেদের আধিপত্য আর একবার কায়েম করতে পারবে বিজেপি।

খেলাটি সফল হয়নি। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন এবং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই এভাবে আসন পুনর্বিন্যাসের বিরোধিতা করে গিয়েছেন। যথার্থ প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। বলেছেন, ‘জনগণনা না করেই কীভাবে আসন পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হচ্ছে?’ জনগণনা ব্যতীত কীভাবে আসন পুনর্বিন্যাস কোথায় কোন অনুপাতে হবে, তা বোঝার সত্যিই কোনও উপায় নেই। যে কারণেই ২০২৩-এর মহিলা সংরক্ষণ বিলে বলা হয়েছিল ‘২৬-এর জনগণনার ওপর ভিত্তি করেই ‘৩৪-এ এই সংরক্ষণ চালু করা হোক। এখন জনগণনা ব্যতিরেকেই যদি আসন পুনর্বিন্যাস করতে চাওয়া হয় তবে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু সহ দক্ষিণের রাজ্যগুলির প্রতি তা হবে চরম অবিচার। সেই অবিচারটিই নরেন্দ্র মোদি অ্যান্ড কোম্পানি করতে চেয়েছিলেন। বিরোধীরা এ-ও বলেছেন, ‘আসন পুনর্বিন্যাসের প্রসঙ্গটি বাদ রেখে ‘২৯ -এর নির্বাচনের জন্য শুধু মহিলা সংরক্ষণের দিকে তাকিয়ে কোনও বিল এলে তাকে সমর্থন দিতে তাদের কোনও দ্বিধা নেই।’ এসব কথার কোনও উত্তর নরেন্দ্র মোদির কাছে নেই। এসব কথার কোনও উত্তর তিনি দিতেও পারেননি তাঁর ভাষণে। আসলে দেওয়ার কোনও উপায়ই তো ছিল না তাঁর কাছে। আসন পুনর্বিন্যাসকে বাদ দিয়ে তিনি শুধু মহিলা সংরক্ষণের বিল কখনই পেশ করতে যেতেন না লোকসভায়। কারণ, মহিলা সংরক্ষণটি তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল হিন্দি বলয়ে লোকসভার আসন সংখ্যা এই ছুতোয় বাড়িয়ে নেওয়া।

কৌশল নরেন্দ্র মোদি কিছু কম করেননি। লোকসভা অধিবেশনের মেয়াদ কমিয়ে দিতে যে সরকার বরাবর বেশি আগ্রহী, তারাই এবার তড়িঘড়ি  করে এই বিল পাশ করানোর জন্য লোকসভার একটি সংক্ষিপ্ত অধিবেশন ডেকে দিল। ডেকে দিল এমন একটা সময়ে যখন তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে। এরকম তাড়াহুড়ো করে এভাবে সংসদের অধিবেশন ডাকার কারণ কী ছিল? প্রথমত, নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর দলের নেতারা ভেবেছিলেন, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই মুহূর্তে বিধানসভা নির্বাচনের ব্যস্ততা ছেড়ে এক বড় সংখ্যক বিরোধী সাংসদই লোকসভায় উপস্থিত হবেন না। দ্বিতীয়ত, নরেন্দ্র মোদিরা আরও ভেবেছিলেন, মহিলা সংরক্ষণের মতো একটি গাজর সামনে ঝুলিয়ে রাখলে বিরোধীরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এবং বিলের বিরোধিতা করাও তখন তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।

কিন্তু অতি চালাকেরও কখনও কখনও গলায় দড়ি পড়ে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মোদি অ্যান্ড কোম্পানির চালাকিকে ব্যর্থ করে বিরোধী সাংসদদের গরিষ্ঠাংশ লোকসভায় উপস্থিত থেকে এই বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। যে ইন্ডিয়া জোট গত একবছরে কার্যত তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল, সেই জোট আবার অক্সিজেন পেয়ে গিয়েছে। আবার একটি সুসংবদ্ধ চেহারা তারা লোকসভায় দেখাতে পেরেছে। এই জোটবদ্ধ চেহারাটি যদি বিরোধীরা ‘২৯-এর নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে তা হলে মোদির কপালে চিন্তার রেখা দেখা দেবে বৈকি।

মোদি যতই বিরোধীদের প্রতি ‘ ভ্রূণহত্যার মতো পাপের’ অভিযোগ তুলুন না কেন, তাঁর আচরণ প্রমাণ করে দিচ্ছে লোকসভার এই পরাজয় তাঁকে বিচলিত করেছে। ছলচাতুরি করে আসন পুনর্বিন্যাসে ব্যর্থ হয়ে ‘২৯-এর নির্বাচন বিজেপির সামনে অশনি সংকেত নিয়ে আসছে কিনা— এ চিন্তায় হয়তো মোদিও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এটাই বিজেপির শেষের শুরু। নিজের রূপে নিজেই মুগ্ধ হয়ে থাকা মোদিরও হয়তো অতি আত্মবিশ্বাসই কাল হতে চলেছে। লোকসভার ভোটাভুটিতে বিজেপির পরাজয় হয়তো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের মাসুল গোনারই ইঙ্গিত।

সবশেষে একটি ছোট্ট হিসাব তুলে দিই। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৩৮ শতাংশ মহিলা। উলটোদিকে বিজেপির মোট সদস্যের মাত্র ১৩ শতাংশ মহিলা। এরপর আর বুঝতে অসুবিধা হয় কি নরেন্দ্র মোদি অ্যান্ড কোম্পানির কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ।