ad
ad

Breaking News

Global warming

নিজের অজান্তেই অসহায় হয়ে পড়ছে মানুষ

মানুষ আজ সত্যিই বড় অসহায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ধারালো ছুরির ফলার ওপর ধীরে ধীরে পা ফেলে মানুষ এগিয়ে চলেছে।

Bangla Jago Desk, ড.সুজীব কর: মানুষ আজ সত্যিই বড় অসহায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ধারালো ছুরির ফলার ওপর ধীরে ধীরে পা ফেলে মানুষ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এক এমন চলা যেখানে মানুষ বুঝতে পারছে না যে ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে তার বাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মতো বুদ্ধিমান উন্নত প্রাণী কেন এটা বুঝতে পারছে না! সময় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে, মানুষের সভ্যতার অগ্রগতিও কম দ্রুতগতিসম্পন্ন নয়। ফলে তার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকা ওতোঃপ্রোত ভাবে এই গতিশীলতারসঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় মানুষ অত্যন্ত কর্মব্যস্ততার দরুন হয়তো অনুভবই করতে পারছে না যে, পরিবেশগত পরিবর্তন ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে পায়ের তলার মাটিকে সরিয়ে নিচ্ছে।

[আরও পড়ুনঃ উত্তর ব্যারাকপুরের ভাইস চেয়ারম্যানের রহস্যমৃত্যুতে গ্রেফতার এক মহিলা

একদিকে চূড়ান্ত কর্মব্যস্ততা, অপরদিকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের অস্থিরতা এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে ধর্মীয় ক্ষেত্রের প্রভাব মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রকৃতিরসঙ্গে এমন ভাবে জড়িয়ে আছে উদয় থেকে অস্ত পর্যন্ত। মানুষের নতুন করে ভাববার মতো অবকাশটুকু নেই। এই অবস্থায় মানুষের এই অসহায়তাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক নেতারা মানুষের চোখের সামনে এমন এক রঙিন পৃথিবীকে উপস্থিত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে স্বাভাবিকভাবে মানুষ ও সেই ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রকৃতপক্ষে তার জীবন এবং তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবতে ভুলে যায। এই কারণেই মানুষের এত দুর্দশা। কারণ নিশ্চিন্ত জীবন থেকে তারা কোনওভাবেও বেরিয়ে আসতে পারছে না।

একবার ভেবে দেখুন তো আপনার জীবন যুদ্ধে অত্যন্ত কষ্ট করে উপার্জিত অর্থের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং কোনও কোনও পরিবারের প্রায় ৬০শতাংশের কাছাকাছি অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে শুধুমাত্র ওষুধ কেনার জন্য। যদি ওষুধের পেছনে এই পরিমাণ অর্থ ব্যয়িত না হতো তাহলে আমাদের বসবাস করার পরিমণ্ডলেরসঙ্গেসঙ্গে জীবন অনেক অংশে পরিবর্তিত হয়ে যেত। আপনারা একবার ভাবুন তো প্রকৃতির ওপর পরম বিশ্বাসে বুক ভরে যে শ্বাস গ্রহণ করছেন তারসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত গ্যাস আমাদের শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে যাচ্ছে, প্রকৃতির অপূর্ব দান যে পানীয় জল, যখন গ্রহণ করছেন তখন আপনার শরীরে বিষাক্ত আর্সেনিকের মতো পদার্থ সহজে প্রবেশ করে যাচ্ছে, যে মাটি আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যার ওপরে উৎপাদিত খাদ্যশস্য খেয়ে আমরা জীবন ধারণ করি, সেই মাটি ও এমন ভাবে দূষিত হয়ে গিয়েছে যে আপনি সেই মাটিতে খোলাপায়ের হাঁটতে ভরসা পাচ্ছেন না।

অর্থাৎ চতুর্দিকে সমস্ত কিছুই আজ দূষিত এবং সম্পূর্ণভাবে মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য। এই বিষয়টি সত্যিই চিন্তার যে মানুষের কৃতকর্মের প্রভাবেই আজ সমগ্র পৃথিবীর পরিমণ্ডল নষ্ট হতে বসেছে। অনেক আগে থেকেই আমাদের বিবেচকের মতো পরিবেশের সম্পর্কে ভাবনায় ভাবিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি, নিশ্চিন্ত জীবন স্রোতে অভ্যস্ত হয়ে আমরা পরিমণ্ডলকে ক্রমান্বয়ে নষ্ট করে ফেলেছি। এই চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে পৃথিবীতে বেঁচে আছে সেটাই মনে হয় বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিস্ময়। তবে যে ‘ইজম’ আপনার যাই থাকুক না কেন এনভারনমেন্টালিজম ছাড়া পৃথিবীতে সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার মতো কোনও সম্ভাবনা আমাদের কাছে নেই।

তবে প্রকৃতির ওপরে আমাদের এক অদ্ভুত বিশ্বাস এবং সেটা এখনও পর্যন্ত প্রায় অটুট বলা যেতে পারে। এই কারণে একদল মানুষ সহজে প্রচার করছেন এই পরিবেশগত বিপর্যয় এই মুহূর্তের একটা ঘটনা এবং পরিবেশ ধীরে ধীরে ভারসাম্যে ফিরে আসতে চাইছে। হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই পৃথিবী তার সমস্ত এই ধরনের দুর্যোগ বা বিপর্যয়গুলিকে থামিয়ে দেবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে। একশ্রেণির অসাধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই বিষয়টি প্রচার করে মানুষের মধ্যে তাদের সম্পর্কে আস্থা তৈরি করার চেষ্টা করেন এবং সরকারের ভ্রান্ত পদক্ষেপগুলিকে ঢেকে তাদের সম্পর্কে জনমতকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু এমনটা ঘটার সম্ভাবনা প্রায় নেই অর্থাৎ আমরা মনকে সান্ত্বনা দিলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে পৃথিবীর এই জলবায়ু পরিবর্তনের পদ্ধতি আমাদের কাছে নতুন নতুন করে আরো কঠিন আঘাত নিয়ে আসবে এবং ভবিষ্যতে আমরা পৃথিবীর চরম রুদ্র রূপ দেখতে পাবো।

তবে এটা আপনাদের ভয় পাওয়ানের জন্য বলছি না। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের পদ্ধতিকে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাস্তুতন্ত্র এবং এখনও পর্যন্ত আমাদের নিশ্চিন্ততা ধীরে ধীরে বাস্তুতন্ত্রের শেষ অস্তিত্ব টুকুকে নষ্ট করে ফেলছে।  তাই স্বাভাবিকভাবে মানুষের ভাবনা-চিন্তা শুরু করতে যত দেরি হবে আমরা তত দ্রুত পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাব। বাস্তবিক ক্ষেত্রে এই বিপুল জলবায়ু পরিবর্তনের যেভয়ঙ্কর সম্ভাবনা সামনের দিকে এগিয়ে আসছে তার জন্য আমাদের বিন্দুমাত্র প্রস্তুতি নেই।

[আরও পড়ুনঃ অনলাইন প্রশিক্ষণ ছাড়া মিলবে না বেতন, নয়া নির্দেশিকা জারি তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের

মানুষ হল বাস্তুতন্ত্রের এমন একটি প্রাণ যার অভিযোজিত হতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগবে কারণ মানুষ হল এই বাস্তুতন্ত্রের সর্বোচ্চ প্রাণ। সেই কারণে তার জীবন ও জীবনের পদ্ধতি হল সর্বাধিক জটিল। তাই স্বাভাবিকভাবে অভিযোজিত হতে হলে প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিবর্তন ঘটিয়ে সামগ্রিক জৈব বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন করতে মানুষের দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে কিন্তু সেই অভিযোজনের পদ্ধতি শুরু হয়েগিয়েছে। প্রত্যেকটা উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের মধ্যে বৈচিত্রগত বেশ কিছু পরিবর্তন আসছে। এমনকী বেশকিছু নতুন নতুন উদ্ভিদ ও প্রাণী বর্তমানে পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হচ্ছে  যারা এই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়ে দীর্ঘ সময় পৃথিবীতে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবে। জলবায়ুগত পরিবর্তন এবং সমুদ্রের প্রকৃতিগত পরিবর্তনেরসঙ্গে তাল মিলিয়ে উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছ।

কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাদের মানুষের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আমরা নিশ্চিন্তে এখনও পর্যন্ত আমাদের জীবন ও জীবিকারসঙ্গেপরিমণ্ডলগত সমস্যা গুলিকে জড়িয়ে নিয়েছি এবং আমরা মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিই আস্তে আস্তে এই দুর্যোগ ও বিপর্যয়গুলি কেটে যাবে এবং আমরা আবার সুস্থ পরিমণ্ডলে বসবাস করতে পারব। কিন্তু একের পর এক দুর্যোগ আসে, কখনও কখনও সেটা বিপর্যয়ে পরিণত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষ এবং সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ভুলে যায় মানুষই। যার প্রভাবে আমাদের ভাবনার জগৎ এখনও অপরিশীলিত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়ঙ্কর থাবার হাত থেকে মানুষকে বাঁচতে গেলে মানুষের জাগরণ দ্রুতগতিতে ঘটা প্রয়োজন। নতুবা আমাদের ক্ষমতার বাইরে বেরিয়ে যাবে জলবায়ু পরিমণ্ডলকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। বিশ্বাস করুন, আমরা কিন্তু এই পৃথিবীতে এখন আর কেউ সম্পূর্ণ সুস্থ নেই। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন তো যে সমস্ত মানুষগুলি এখনও সভ্যতার আলোতে এসে পৌঁছতে পারেনি, যারা বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের শরীরে বিন্দুমাত্র পোশাক পরিচ্ছদ নেই, নেই কোনও বসতি ক্ষেত্র তারা কিন্তু কেউই অসুস্থ নয়।

তারা চরম সুস্থ ভাবে বনে-জঙ্গলে অন্যান্য বন্য পশুদের সঙ্গে জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে বেঁচে আছে এবং সুস্থভাবে বেঁচে আছে, তাদের খাদ্যের অভাব নেই, তাদের ওষুধের প্রয়োজন নেই।অর্থাৎ বাস্তুতান্ত্রিক পরিমণ্ডল ভারসাম্যযুক্ত থাকলে আমরা পৃথিবীতে অনেক ভাল থাকতে পারতাম কিন্তু আমাদের বিভিন্ন কার্যাবলি এই পরিমণ্ডলকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। যার ফলে আমাদের কাছে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার মতো কোনও রসদ নেই।

আমরা বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করে ফেলেছি। দূষিত হয়েছে জল, মাটি দূষণও কোনও অংশে কম নয়। যার ফলে জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নষ্ট হতে শুরু করেছে। বাস্তুতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে বেঁচে থাকার মতো পরিস্থিতি এই মুহূর্তে আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই। মানুষের অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপে প্রকৃতির সমস্ত উপকরণগুলি তাদের ভারসাম্য হারিয়েছে। সুতরাং, এই মুহূর্তে মানুষের ভাবনার জগতে এক নবজাগরণের প্রয়োজন। পরিবেশগত চেতনা আন্দোলনরূপে যদি প্রকাশিত না হতে পারে তাহলে, চিরাচরিত রাজনৈতিক শক্তির গণ্ডিকে অতিক্রম করে মানুষের নিজের ভাল থাকার পরিমণ্ডল এবং সুস্থ থাকার পরিমণ্ডলকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। সর্বস্তরের সমস্ত মানুষ তাদের এই নিজস্ব সমস্যাকে উপলব্ধি করে বিপুল জনমত তৈরি করে যতক্ষণ না কঠিন ভাবে এই চিরাচরিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে পারবে।

ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবেশগত চেতনা রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। আমাদের এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে সমস্ত ক্ষেত্রেই নীতি নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেন রাজনৈতিক নেতারাই এবং তারা কোনও ক্ষেত্রেই তাদের বিপুল জনমতের বাইরে বেরিয়ে আসার কথা ভাবতে পারেন না এবং তারা এটাও ভাল করে জানেন, পরিবেশগত সমস্যাগুলিকে রাতারাতি নিরসন করা সম্ভব নয়। তাই পরিবেশ নিয়ে ভাবলে ভোটের বাক্সে তাদের লাভ হবে না। তার থেকে স্বাভাবিকভাবে মানুষের চোখের সামনে উন্নয়নকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় এমন কিছু করতে পারলে খুব সহজেই ভোটের বাক্স ভরবে এবং তারা দিনের পর দিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন।

তবে এটা ভাবতে খুব ভয় লাগে যে তারা শেষের সেই দিনের কথা এখনও ভাবতে পারছেন না, যখন ভোটের বাক্স থাকবে কিন্তু ভোটের বাক্সকে ভর্তি করার জন্য মানুষ থাকবে না। প্রকৃতি কিন্তু শেষ হয়ে যাবে না, শেষ হয়ে যাবে এই বাস্তুতন্ত্রের সমস্ত জীবগোষ্ঠী। সবচেয়ে আগে পৃথিবী থেকে জায়গা ছাড়তে হবে মানুষকে, এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রাণীদের। পৃথিবীতে নেমে আসবে ভয়ঙ্কর হিমযুগ, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হবে তুষারাবৃত পৃথিবীর, এরপর ধীরে ধীরে আবার নতুন করে সমস্ত জীব জগতের সৃষ্টি হবে। প্রাণীরাও ফিরে আসবে কিন্তু এই পৃথিবীতে হয়তো কখনওই আর ফিরে আসবেনা মানুষ।