চিত্র: সংগৃহীত
সুমন ভট্টাচার্য (বিশিষ্ট সাংবাদিক): শুক্রবার মধ্যরাতে গরম জলে স্নান করতে করতে আমি ভাবার চেষ্টা করছিলাম, একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ বাবা হতে ঠিক কত দূর যেতে পারেন? এই প্রশ্নে মনে আসার কারণ, সদ্য দেখে ফিরেছি পার্থ ভৌমিকের বাংলা অপেরার ‘দায়বদ্ধ’ নাটক, যে নাটক আসলে এক ট্রাক ড্রাইভার গগনের বাবা হয়ে ওঠার গল্প। পার্থ ভৌমিক আর প্রযোজক রাণা সরকারের যুগলবন্দিতে বাংলা অপেরার ‘দায়বদ্ধ’ নাটক শুক্রবারই ৫০ তম অভিনয় করল ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে। কিন্তু নাটক তো আসলে আমাদের জীবনের সঙ্গে পরিচয় করায় (Partha Bhowmick)।

সায়কের যে নাটক এক সময় বাংলা গ্রুপ থিয়েটারকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল এবং মেঘনাদ ভট্টাচার্যকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছিয়ে দিয়েছিল, সেই ‘দায়বদ্ধ’ নাটক ৩২ বছর ধরে ৭০০-রও বেশি শো-তে অভিনয় করেছেন সায়কের শিল্পীরা। সায়ক সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, তারা আর দায়বদ্ধ করবে না। তাই চন্দন সেনের ‘দায়বদ্ধ’ নিয়ে এখন এগিয়ে চলেছেন পার্থ ভৌমিকের বাংলা অপেরার শিল্পীরা। কিন্তু শুক্রবার ৫০ তম অভিনয় দেখতে দেখতে আমি ভাবছিলাম ‘সার’-দীর্ণ এই বাংলায় সত্যিই তো সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানুষের অস্তিত্ব বিষয়ক অনেক ভুলে যাওয়া কথাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়ে যায় বাংলা অপেরার ‘দায়বদ্ধ’। পার্থ ভৌমিকের ‘গগন’ কিংবা দেবযানী সিংহের ‘সীতা’ আসলে আমাদের অনেক নতুন বাস্তবের সামনে দাঁড় করায়।
বাংলা অপেরা ‘দায়বদ্ধ’-এর ৫০ তম অভিনয় দেখতে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে অবশ্য হাজির ছিলেন সমাজের বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি টলিউডের অনেক তারকা। ‘প্রলয়’ সিরিজে পার্থ ভৌমিকের সহ-অভিনেতা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সেলিব্রিটি পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, প্রযোজক অতনু রায়চৌধুরী, নাটকের দেবপ্রতিম দাসগুপ্ত, অরিজিৎ চক্রবর্তী, চিকিৎসক অভিজিৎ চৌধুরী— কে নয়! সেই তারকা মেলায় ছিলেন সাংবাদিক, রাজনীতিক এবং বর্তমানে অভিনেতাও কুণাল ঘোষ। এঁদের সবাইকে সাক্ষী রেখেই বাংলা অপেরা তাদের ‘দায়বদ্ধ’ নাটকের ৫০ তম অভিনয়তে দর্শকের মন জেতার পাশাপাশি হয়তো অনেকগুলো জরুরি প্রশ্নও তুলে দিয়ে গেলেন (Partha Bhowmick)।
চন্দন সেনের এই নাটক আসলে ৪০ বছর আগের এক উদ্বাস্তু কলোনি জীবনের কথা বলে, যে কলোনি জীবন হয়তো অনেক বদলে গেছে, কিন্তু তাদের সংঘাত, তাদের অস্তিত্ব, তাদের নিজেদের পরিচয় টিকিয়ে রাখার লড়াই হয়তো এখনও বদলায়নি। এই সার-দীর্ণ পৃথিবীতেও বদলায়নি। নানারকম বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণেও উদ্বাস্তু পরিবারগুলির সংকট হয়তো অন্য চেহারায় একইরকম আছে। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে একটি উদ্বাস্তু কলোনিতে থাকতে আসা গগন আর সীতার কাহিনিকে অসাধারণ মুন্সিয়ানায় গেঁথেছিলেন চন্দন সেন, আর তাকে অভিনয়ের মাধ্যমে, নাটকীয়তা দিয়ে দর্শকের মাথায় গেঁথে দিয়েছিলেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য| তাঁর সায়ক নাট্যগোষ্ঠীর মাধ্যমে। সায়কের সেই ‘ব্যাটন’ এখন তুলে নিয়েছে পার্থ ভৌমিক ও রাণা সরকারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হওয়া বাংলা অপেরা।
বাংলা অপেরার নাটক যাঁরা নিয়মিত দেখেন, তাঁরা জানেন এই নাট্যদলের অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা তথা সংগঠক দেবযানী সিংহ মঞ্চেও দাপুটে অভিনেত্রী। এই দিনও ‘দায়বদ্ধ’ দেখতে দেখতে বারবার নাটকের ‘ভক্ত’ কুণাল ঘোষ সেই কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। কুণালদা যে দেবযানীর অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন সেকথা কার্টন কলের পরে মঞ্চে উঠে মনেও করিয়ে দিলেন। কার্টন কলে অবশ্য ছোটখাটো রসিকতা হতেই থাকল। কিছু দিন আগে পর্যন্ত ফেসবুকে যুযুধান দুই শিবিরের দুই নেতা কুণাল ঘোষ এবং রাণা সরকার উষ্ণ আলিঙ্গনের পাশাপাশি একে অপরের প্রশংসায় অনেক কথাও বললেন (Partha Bhowmick)।

ঠিক তেমনই আবার সহ-অভিনেতা হিসেবে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিলেন রাজনীতির অঙ্গন ছেড়ে পার্থ ভৌমিক যতই নাটকের অঙ্গনে আসুক রাজনীতির কলাকৌশলগুলো ভুলতে পারছেন না। তাই ‘দায়বদ্ধ’ অভিনয় করতে গিয়েও পার্থ, ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিক, তথা কিছু দিন আগে পর্যন্ত রাজ্য মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পার্থ ভৌমিক নাটকের মধ্যেও তাঁর আগামী সিনেমার সংলাপ গুঁজে দিতে ভুলে যাননি। শাশ্বতর এই মন্তব্য যতটা মজার ছিল ততটাই হয়তো পার্থ ভৌমিকের বিচক্ষণতাকেও মনে করাবে।
মঞ্চে হাজির একেনবাবুর পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় থেকে লিভার ফাউন্ডেশনের অভিজিৎ চৌধুরী কিংবা ‘উইন্ডোজ’-এর অনেক হিট ছবির প্রযোজক থেকে দেবের পাশে দাঁড়িয়ে যাওয়া প্রযোজক অতনু রায়চৌধুরীও নাটকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। আসলে হয়তো বাংলা অপেরার ‘দায়বদ্ধ’ প্রযোজনা নিয়ে এতটা উচ্ছ্বাসের সত্যিই অনেক কারণ আছে। মানবিক জীবন, উদ্বাস্তু পরিবারের সংকট, একজন ট্রাকচালকের জীবনের নানা ঘটমান পরিবর্তনকে পার্থ এবং তাঁর সহযোগীরা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘দায়বদ্ধ’ নাটক দেখতে দেখতে কেন জানি আমার সমরেশ বসুর সব আইকনিক উপন্যাসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ‘বি টি রোডের ধারে’ কিংবা ‘শিকল ভাঙা হাতের খোঁজে’। সমরেশ বসু, প্রবলতম রাজনৈতিক বোধ নিয়ে যিনি তাঁর উপন্যাস লেখা শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে কালকূট হয়ে ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’-এর মতো ‘আইকনিক’ আখ্যান রচনা করে গিয়েছেন, সেই সমরেশ বসু, যিনি নাগরিক জীবনের সংঘাতের ছবি এক সময় নিপুণ দক্ষতায় আঁকতেন, চন্দন সেনের এই নাটকেও সেই নিপুণ দক্ষতায় কলোনি জীবনকে আঁকা হয়েছে।
গগনের জীবনের অসহায়তা, এক ডাক্তারের স্ত্রীর পালিয়ে আসা এবং তাঁকে আশ্রয় দিয়ে নিজেদের একটা সংসার গড়ে তুলতে চাওয়া— এই সব কিছুই হয়তো একদিন কলোনি জীবনে প্রবল বাস্তব ছিল। সেই সমস্ত টানাপোড়েনকে দেবযানী সিংহ, ঋক দেবরা অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু বাংলা অপেরার ‘দায়বদ্ধ’ না দেখতে এলে কে জানত যে, পার্থ ভৌমিক এমন অসামান্য রবীন্দ্রসঙ্গীতও গান। আসলে এই নাটক গগনের, থুড়ি পার্থ ভৌমিকের। নিজেকে উজাড় করে দিয়ে পার্থ গগনের চরিত্রে একজন ট্রাক ড্রাইভারের জীবনের অসহায়তা, তার ভঙ্গুরতা এবং হয়তো পরিবারের কাছে ফিরে আসার আকুতিকেও ফুটিয়ে তুলেছে। ভুলে যাবেন না ট্রাক ড্রাইভারদের জীবন জানতে আজকে রাজনীতিকরাও সদাই তৎপর (Partha Bhowmick)।
রাহুল গান্ধী কিছু দিন আগে ট্রাক ড্রাইভারদের সঙ্গে কয়েকশো কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছিলেন। গান্ধী পরিবারের সন্তান ট্রাক ড্রাইভারদের গরমে সিদ্ধ হওয়ার জীবন, মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যাওয়ার মানসিক চাপ, শারীরিক ঝুঁকি, সব কিছুর কথা তাঁর রিলস, তাঁর ভিডিও আখ্যানে তুলে ধরেছিলেন। রাহুল গান্ধী যে ট্রাক জীবনের সংকটের কথা বলেছেন. পার্থ ভৌমিকের বাংলা অপেরা সেটাকে মঞ্চে এনে আমাদের সামনে হাট করে দেয়। একজন ট্রাক ড্রাইভার কেন মদ খায় এবং হয়তো কেন নিষিদ্ধ পল্লীতে যায়, কোন আকর্ষণে সে শরীর খোঁজে আবার কোন আকর্ষণে সংসার পাততে চায়— সেই সবই পার্থ ভৌমিক তাঁর অভিনয় দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। গগনের চরিত্রের অসহায়তা, গগনের বাবা হয়ে ওঠার চেষ্টা তাই পার্থর অভিনয়ে জীবন্ত।

সার-দীর্ণ এই বাংলায় যখন মানবিক, সামাজিক সম্পর্কগুলো নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে, যখন অনেক নতুন সম্পর্ককে আমরা দেখতে পারছি, অনেক নতুন সামাজিক সম্পর্ক আমাদের চমকে দিচ্ছে, তখন হয়তো বাংলা অপেরা, পার্থ ভৌমিক-দেবযানী সিংহ-ঋক দেবদের ‘দায়বদ্ধ’ দেখাটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা। অরিত্র ব্যানার্জীর পরিচালনায় এই নাটক তাই ৫০ তম অভিনয় যে পেরিয়ে গেল, সেটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। কুণাল ঘোষ থেকে জয়দীপ মুখোপাধ্যায় যে নাটকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, সেই নাটক হয়তো আরও অনেক দূরে যাবে এবং আমাদের বারবার অবাক করে দেবে পার্থ ভৌমিকের অভিনয় নৈপুণ্যে, তার গান গাওয়ার আবেগে এবং চেনাবে বাবা হয়ে ওঠা কতটা কঠিন (Partha Bhowmick)।