চিত্রঃ সংগৃহীত
প্রভাত কুমার মিত্র (লেখক–প্রাবন্ধিক): মানুষের জীবনে পরিবার হল প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একটা সময় ছিল, যখন মা-বাবারা সন্তানের ভবিষ্যৎ ও সুস্থ জীবন গঠনের জন্য শৈশব থেকেই শৃঙ্খলা, নিয়ম-কানুন এবং জীবনবোধ শেখাতেন। সন্তানদের ভোরবেলা ওঠা, নিয়মিত পড়াশোনা করা, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা, শিষ্টাচার মেনে চলা— এসবের উপর জোর দেওয়া হতো। বাবা-মা সন্তানের মঙ্গলকামনায় তাদের শাসন করতেন এবং কঠোর হলেও সেই শাসনের আড়ালে থাকত অফুরন্ত ভালবাসা ও ভবিষ্যতের নিরাপদ পথ দেখানোর অভিপ্রায়।
কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক জীবনে পরিবার কাঠামো, জীবনধারা এবং সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গিয়েছে অভিভাবকত্বের ধরনও। বর্তমান যুগের বহু মা-বাবা সন্তানের ইচ্ছের উপর সব কিছু ছেড়ে দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, সন্তানের উপর কঠোরতা করলে হয়তো ভবিষ্যতে তাদের কাছে স্নেহ বা পরিষেবা পাবেন না। এক সন্তানের পরিবারে এই ভয় আরও প্রবল। ফলে সন্তান যাই করুক, বাবা-মা মুখ বুজে মেনে নিচ্ছেন।
আরও পড়ুনঃ Draft Voter List Update: ভোটার তালিকায় ভুল করলে চাকরি খোয়াতে পারেন BLO-রা, জারি হল কড়া নির্দেশিকা
এই সুযোগে অনেক সন্তান নিজের ইচ্ছেমত চলতে শুরু করে। শৃঙ্খলাহীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। মা-বাবার আবেগকে অস্ত্র করে কখনও ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল’ তো কখনও ভয় দেখিয়ে নিজের সুবিধামতো পরিবেশ গড়ে নেয়। দিন দিন সন্তানদের মধ্যে শিষ্টাচার, শ্রদ্ধা ও জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব দেখা দিচ্ছে। সামাজিক দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা— এই শব্দগুলি যেন কাগজে-কলমে রয়ে যাচ্ছে।
এরা আত্মীয়স্বজনদের এড়িয়ে যায়, ছদ্ম পড়াশোনায় নিজেদের ব্যস্ত রেখে বিয়েবাড়ি, অন্নপ্রাশন, পারিবারিক জমায়েতে একত্রে মিলিত হয়ে ভাব বিনিময়ের শ্রেষ্ঠতম অধ্যাগুলিকে স্বেচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যায়। ফলে শিকড়ের টান কী জিনিস বুঝতেই পারে না। ফলে এরা সৌজন্যবোধ শেখে না। কারণ এদের একটাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা– ভাল রেজাল্ট ও দামি চাকরি (বন্ডেড ক্রীতদাস হওয়া) নিয়ে ‘স্বপ্নের দেশে’ পাড়ি জমানো এবং সুখের চাদরে নিজেকে মুড়ে আনন্দ ও স্ফূর্তিতে জীবন কাটানো। ফল– একাকিত্ব, হতাশা, অবসাদ, শিকড় হাবারার যন্ত্রণা ও পরিশেষে আত্মহত্যা!
Bangla Jago fb page: https://www.facebook.com/share/17CxRSHVAJ/
এই পরিস্থিতি শুধু সন্তানদের ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা তৈরি করছে না, সমাজেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আজকাল বহু যুবক-যুবতী মানসিক অস্থিরতা, হতাশা, এবং আত্মকেন্দ্রিকতায় ভুগছে। কারণ ছোটবেলায় শৃঙ্খলা ও জীবনবোধের শিক্ষা তারা পায়নি। অথচ জীবন শুধু ইচ্ছেমাফিক নয়, দায়িত্ব এবং কর্তব্যের পথও। অতএব, সময়ের প্রয়োজনে মা-বাবাদের আবার সেই পুরনো শাসন-স্নেহের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। সন্তানের প্রতি ভালবাসা থাকবে, তবে শৃঙ্খলা এবং মূল্যবোধের শিক্ষা থেকে ছাড় দেওয়া চলবে না। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যই কখনও কখনও ‘না’ বলা জরুরি। এতে সম্পর্ক যেমন সুস্থ থাকবে, তেমনই সমাজও পাবে সচেতন এবং দায়িত্বশীল নাগরিক। পরিবার হল সমাজের মৌলিক একক। সন্তানের সঠিক গঠন এবং শুদ্ধ চরিত্র গড়ে তুলতে হলে বাবা-মাকে সাহসের সঙ্গে শাসন ও ভালবাসার মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। সন্তানকে অন্ধ অনুকম্পা নয়, বরং সঠিক শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়াই হোক অভিভাবকদের প্রধান কর্তব্য। তা হলেই ভবিষ্যতের সমাজ হবে সুন্দর, সুস্থ এবং ভারসাম্যপূর্ণ।