ad
ad

Breaking News

Pakistan-Bangladesh

পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ: আমাদের দুই প্রতিবেশী আসলে ঠিক কী চাইছে?

এটা বুঝে নেওয়া দরকার, যে ডোনাল্ড ট্রাম্প আসিফ মুনিরকে মদত দিতে শুরু করার পর থেকে পাকিস্তানের কর্তা ব্যক্তিরা নিজেদেরকে নতুন করে সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করেছেন বা বলা ভাল উপমহাদেশে ছড়ি ঘোরানোর ‘মহান’ দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

Pakistan-Bangladesh: What Do Our Neighbours Really Want?

চিত্র: সংগৃহীত

সুমন ভট্টাচার্য (বিশিষ্ট সাংবাদিক): এশিয়া কাপ ফাইনালের পর পাক ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের প্রধান মহসিন নকভির ট্রফি নিয়ে চলে যাওয়াটা শুধুমাত্র একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখবেন না ডোনাল্ড ট্রাম্পের বলে বলিয়ান আসিফ মুনিরের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের নতুন করে গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা হিসেবে দেখবেন, সেটা অবশ্যই আলোচনার বিষয়। কিন্তু এটা বুঝে নেওয়া দরকার, যে ডোনাল্ড ট্রাম্প আসিফ মুনিরকে মদত দিতে শুরু করার পর থেকে পাকিস্তানের কর্তা ব্যক্তিরা নিজেদেরকে নতুন করে সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করেছেন বা বলা ভাল উপমহাদেশে ছড়ি ঘোরানোর ‘মহান’ দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিয়েছেন (Pakistan-Bangladesh)।

[আরও পড়ুন: যেকোনও মতে হামাসকে ডিমিলিটারাইজ করতে চান নেতানিয়াহু]

এই দায়িত্ব পাকিস্তানের হাতে বর্তেছে বলেই বাংলাদেশে খাগড়াছড়িতে সংখ্যালঘু বৌদ্ধসম্প্রদায়ের উপরে হামলা, ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তুমুল উত্তেজনা এবং গুলিচালনায় মৃত্যুর পরও ইউনুস প্রশাসন ভারতবর্ষের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। নয়াদিল্লি সঠিকভাবেই ইউনুস প্রশাসনকে মনে করিয়ে দিয়েছে, যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং সংখ্যালঘুদের উপর গুলিচালনার ঘটনা ঘটলে তার দায় নয়াদিল্লির নয়, বরং ইউনুসের। ইউনুস কীভাবে দেশকে চালাবেন, কীভাবে বাংলাদেশকে চালাবেন সেটা ইউনুসকেই ঠিক করতে হবে।

তিনি আমেরিকায় লটবহর এবং অনেক উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে মোটেই আসলে বাংলাদেশের কোনও উপকার করছে না। বাংলাদেশের কীসে উপকার হবে, বাংলাদেশ বাংলাদেশ থাকবে না ক্রমশ পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে, সেই নিয়ে নিরন্তর তর্ক চলতে থাকবে। কিন্তু এটা বুঝতে হবে, যে, আমাদের পশ্চিম এবং পুবের প্রতিবেশী দেশে মৌলবাদের বাড়বাড়ন্ত, ভারত বিদ্বেষে শান দেওয়া, এইসব কিছুর পিছনে পরোক্ষে আমেরিকার মদত আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেদিন থেকে পাকিস্তানের উপর তাঁর বরাভয়ের হাত রেখেছেন, সেইদিন থেকেই আসিফ মুনির, শাহবাজ শরিফরা নিজেদেরকে ধরাছোঁয়ার মধ্যে রাখছেন না।

একটি ইংরেজি সাপ্তাহিকে দেখলাম পাকিস্তান সম্পর্কে চমৎকার একটি নিবন্ধ একজন লিখেছেন। সেই নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, কীভাবে একের পর এক বহুজাতিক সংস্থা মাইক্রোসফট থেকে ফাইজার পাকিস্তান ছেড়েছে। কারণ, পাকিস্তানের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। এহেন বেহাল অর্থনীতিতে পাকিস্তান বা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রক সেনাবাহিনী আর কী-ই বা করতে পারে? তারা তাই বালুচিস্তানের মাটির নিচে থাকা খনিজ সম্পদ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেবেন বলে চুক্তি করে ফেলেছে (Pakistan-Bangladesh)।

এর আগে তাদের চিনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ছিল গদর সামুদ্রিক বন্দর নিয়ে। ফলে একদিকে চিন, অন্যদিকে আমেরিকার গালে চুমু খেতে খেতে আসিফ মুনির এবং শাহবাজ শরিফরা ভাবছেন তাঁদের বেহাল অবস্থার উন্নতি ঘটবে। আসিফ মুনিররা সৌদি আরবের সঙ্গেও সামরিক চুক্তি সেরে ফেলেছেন। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তো দেশের অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো যায় না। এমনকি ভিয়েতনাম, ছোট্ট দেশ ভিয়েতনাম, হো-চি-মিনের কারণে যে দেশকে আমরা স্মরণে রেখেছি। সেই ভিয়েতনাম যত বিদেশি বিনিয়োগ টানে, পাকিস্তান তার ধার কাছ দিয়েও যেতে পারে না। বরং পরিসংখ্যান বলছে গত চার বছরে ৪২টি আন্তর্জাতিক সংস্থা পাকিস্তান থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে।

ফাইজার, মাইক্রোসফট তার মধ্যে অগ্রগণ্য সংস্থা। আসলে পাকিস্তানের জনসংখ্যা এত বেশি, যে, বিশাল সংখ্যক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে গিয়েছেন এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে, পাকিস্তান আর বহুজাতিকদের কাছে খুব আকর্ষণীয় জায়গা নয়। এহেন পাকিস্তান তাই নিজের আত্মাকে বন্ধক রেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে।

এই ‘আত্মাকে বন্ধক রাখা’ শব্দটি আসলে ইংরেজি নিবন্ধকাররা লিখছেন, কারণ, তা না হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বালুচিস্তানের মাটির নিচে থাকা খনিজ সম্পদ নিয়ে চুক্তি কেন করতে যাবেন পাকিস্তানের বর্তমান নিয়ন্ত্রক আসিফ মুনির বা শাহবাজ শরিফ? আসলে পাকিস্তান চালায় যে সেনাবাহিনী, যে সেনাবাহিনীর অঙ্গুলিহেলনে ইমরানের মতো বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক, সবচেয়ে জনপ্রিয়তম রাজনীতিক হওয়া সত্ত্বেও জেলে বন্দি, সেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবার পাকিস্তানের জমি বা ভূখণ্ড বেচতে শুরু করেছে চিন ও আমেরিকা— দুই পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কাছে।

পাকিস্তান তাহলে ঠিক কী চায়? এ বিষয়ে দেখলাম পশ্চিমের এক তাত্ত্বিক চমৎকার মন্তব্য করেছেন। একটা ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’, যে রাষ্ট্র ধর্মের জিগির তুলে বারবার সন্ত্রাসবাদে মদত দিয়েছে, সেই রাষ্ট্র কী বেচতে পারে? আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার কীসের গুরুত্ব থাকতে পারে? ওই পশ্চিমা তাত্ত্বিক মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তানের একমাত্র গুরুত্ব তার ভূখণ্ডজনিত কারণে। অর্থাৎ, এপাশে আফগানিস্তান, ওপাশে ইরান এবং মধ্য এশিয়ার যোগাযোগ সূত্র হিসেবে পাকিস্তান সবসময়ই বিশ্বের বৃহত্তম শক্তিগুলির কাছে কাঙ্ক্ষিত ভূখণ্ড। সেটা আমেরিকার কাছেও, সেটা চিনের কাছেও (Pakistan-Bangladesh)।

চিনের মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগের জন্য বা মধ্য এশিয়ার সঙ্গে চিনের যে অংশটি লেগে আছে, সেখান থেকে সমুদ্রবন্দর যাওয়ার জন্য পাকিস্তানের মধ্যে দিয়ে রাস্তা তৈরি করে গদর সমুদ্র বন্দরে পৌঁছোনোটাই সবচেয়ে সহজ কাজ। ঠিক তেমনই আমেরিকারও প্রয়োজন পুতিনের ভ্রূকুটি থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে বা পুতিনের প্রতিস্পর্ধী হিসেবে পাকিস্তানকে খাড়া করবার কারণে। আমাদের মনে রাখতে হবে, দীর্ঘ ঠান্ডা যুদ্ধের সময় আফগানিস্তানে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী ছিল, তখনই কিন্তু পাকিস্তানের গুরুত্ব আমেরিকার কাছে সবচেয়ে বেড়েছিল মুজাহিদ তৈরি করার জন্য।

সেই সময় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি, যিনিও একজন সেনাপ্রধান ছিলেন, জিয়াউল হক আমেরিকার মদতেই বা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে সিআইএ-র মদতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে লড়বার জন্য আফগানিস্তানে মুজাহিদদের তৈরি করেছিলেন। ইতিহাসের অদ্ভুত সমাপতনে সেই মুজাহিদরা পরবর্তীকালে মৌলবাদী শক্তি তালিবানে পরিণত হয়, যে তালিবানদের মদতে বিন লাদেন খাস আমেরিকাতেই হামলা চালিয়ে দেয়, আর যে তালিবানদের উচ্ছেদ করতে আমেরিকাকে আফগানিস্তানে সেনা অভিযান চালাতে হয়। ফলে পাকিস্তানকে মদত দিয়ে মুজাহিদদের তৈরি করার যে নীতি একসময় আমেরিকা নিয়েছিল, তারই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী পরিণাম ছিল ১/১১ বা নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলা থেকে শুরু করে, তারপরে আফগানিস্তানে আমেরিকার আক্রমণ।

আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে। কিন্তু আবারও ভাবছে মধ্য এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার জন্য আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি তাদের দরকার। এই সব কিছুর জন্যই পাকিস্তানের সঙ্গে আবার গলাগলি বাড়িয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা। আর সেই বলে বলিয়ান হয়ে আসিফ মুনিররা দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়ি ঘোরানোর কাজে নেমে পড়েছেন।

তাই এশিয়া কাপের মঞ্চে মহসিন নকভির আচরণকে কোনও বিচ্ছিন্নভাবে দেখবেন না বা বাংলাদেশে খাগড়াছড়িতে বৌদ্ধসম্প্রদায়ের উপর হামলার ঘটনাও কোনও বিচ্ছিন্ন নয়। এই সবই আসলে ‘মার্কিন ডিপ স্টেট’-এর মদতে মৌলবাদের দক্ষিণ এশিয়ায় উত্থান। সেটাকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা অবশ্যই একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কিন্তু কেউ যদি ভাবে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মদত আছে বলে ইসলামাবাদকে ভারত জুজু হিসেবে দেখবে বা ঢাকার ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব গুরুত্ব পাবে, তাহলে ভুল করছেন।

১৯৭১-এও আমেরিকা নয়াদিল্লির পাশে ছিল না। বরং নিক্সন, কিসিঞ্জাররা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণ ঠেকাতে চেয়েছিল। সেই সময়ও ওয়াশিংটন পাকিস্তানকে মদত দিয়েছিল, কিন্তু সেই মদতকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে ইন্দিরা গান্ধি বাংলাদেশকে স্বাধীন হতে সাহায্য করেছিলেন। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতবর্ষের আমেরিকার সাহায্যটা দরকারই, এরকমটা যাঁরা মনে করেন, তাঁরা আসলে ভুল করেন। ইন্দিরা গান্ধি তো পেরেছিলেন, তাহলে ভারতবর্ষ আবার কেন পারবে না? এটা আলাদা কথা নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররা গত ১১ বছর ধরে আমেরিকার সঙ্গে সখ্য গড়তে গিয়ে, ইজরায়েল-কেন্দ্রিক হতে গিয়ে নিজেদের বিদেশ নীতিকে ভুল পথে চালনা করেছেন। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নরেন্দ্র মোদি মস্কো বা বেইজিংয়ের সঙ্গে সখ্য বাড়াচ্ছেন। ফলে পাকিস্তান যতই বাড়াবাড়ি করুক, কিংবা ঢাকায় যতই মৌলবাদের আস্ফালন শোনা যাক, তাতে নয়াদিল্লির চিন্তিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।

নয়াদিল্লি জানে যে, পাকিস্তানের মহসিন নকভির দলকে যেমন মাঠে পর্যুদস্ত করা সম্ভব, তেমনই রণাঙ্গনেও। সেকথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং বা ভারতবর্ষের সেনাধ্যক্ষরা মনেও করিয়ে দিচ্ছেন। আসিফ মুনির যতই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে আসুন, তিনি এখনও অবধি যুদ্ধে ভারতবর্ষের শক্তি সম্পর্কে হয়তো ততটা ওয়াকিবহাল নয়।

FB POST: https://www.facebook.com/share/r/17EzzTHQ1Z/

যেমন ক্রিকেট মাঠে প্রতিনিয়র সূর্যকুমার যাদবরা পাকিস্তানকে দুরমুশ করছে, রণাঙ্গনেও তেমন হলে ইসলামাবাদের জন্য খুব সুখকর হবে না। বেহাল অর্থনীতি, বিচ্ছিন্ন সমাজ, পাক অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভ, বালুচিস্তানে তুমুল বিদ্রোহের আগুন— এইসব কিছু দিকে বরং শাহবাজ শরিফরা মনোনিবেশ করলে পাকিস্তানেরই উপকার। দুর্বল প্রতিবেশী, হিংসুটে প্রতিবেশীর চাইতে অর্থনীতিতে একটু হলেও সবল পাকিস্তান আমাদের উপকার করতে পারে (Pakistan-Bangladesh)।