ad
ad

Breaking News

Organic vs Chemical Farming

Organic vs Chemical Farming: অর্গানিক না কেমিক্যাল ফার্মিং, ভবিষ্যৎ কৃষির সঠিক পথ কোনটি

অর্গানিক ফার্মিং মূলত প্রকৃতিনির্ভর এক কৃষিব্যবস্থা, যেখানে মাটির উর্বরতা, জীবজগতের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিবেশগত ভারসাম্য প্রধান চালিকাশক্তি।

Organic vs Chemical Farming in India – Sustainability, Soil Health

চিত্রঃ সংগৃহীত

বিশ্বজিৎ বৈদ্য (গবেষক, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়): ভারতের কৃষিনীতির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক আজ ‘অর্গানিক বনাম কেমিক্যাল’ কৃষিব্যবস্থা। বিষয়টি শুধু দুটি পদ্ধতির তুলনা নয়— বরং খাদ্য-নিরাপত্তা, পরিবেশের স্থায়িত্ব, মাটির ভবিষ্যৎ, কৃষকের আয়, জনস্বাস্থ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ— সব কিছুকে ঘিরে একটি গভীর নীতিগত প্রশ্ন। বিশ্বজুড়ে কৃষি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে, যেখানে উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি উৎপাদনের প্রকৃতি ও পদ্ধতি সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের কৃষি আজ একটি টানাপোড়েনের দ্বিধাবিভক্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন জৈব-নির্ভর কৃষির পুনর্জাগরণ— যা বর্তমানে ‘অর্গানিক ফার্মিং’ নামে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে সবুজ বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা কেমিক্যাল বা রাসায়নিকভিত্তিক উচ্চফলনশীল কৃষি, যা দেশের খাদ্য-নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে। খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, কৃষকের আর্থিক সঙ্কট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ— এই সবকিছুর ভেতরে দুটি মডেলই নিজস্ব যুক্তি তুলে ধরে। প্রশ্ন হল, কোন পথটি দীর্ঘমেয়াদে বেশি টেকসই, স্বাস্থ্যসম্মত ও অর্থনৈতিক (Organic vs Chemical Farming)?

অর্গানিক ফার্মিং মূলত প্রকৃতিনির্ভর এক কৃষিব্যবস্থা, যেখানে মাটির উর্বরতা, জীবজগতের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিবেশগত ভারসাম্য প্রধান চালিকাশক্তি। এই ব্যবস্থায় কম্পোস্ট, গোবরসার, সবুজসার, বায়োফার্টিলাইজার, বায়ো-পেস্টিসাইড, মালচিং এবং শস্যাবর্তনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার অর্গানিক ফার্মিং-এ নিষিদ্ধ বা সীমিত। এতে মাটির জৈব কার্বন বাড়ে, মাটির গঠন উন্নত হয়, জলধারণ ক্ষমতা বাড়ে, এবং মাইক্রোবিয়াল জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মাটির গুণগতমান বাড়তে থাকে এবং পরিবেশ-বান্ধব উৎপাদন কাঠামো তৈরি হয়। উপরন্তু, বাজারে অর্গানিক পণ্যের মূল্য বেশি হওয়ায় কৃষক বেশি লাভের সুযোগ পেতে পারেন।

অন্য দিকে রয়েছে কেমিক্যাল ফার্মিং— যার ইতিহাস খুব দীর্ঘ না হলেও আধুনিক কৃষিতে এর প্রভাব বিপুল। উচ্চফলনশীল বীজ, ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি, রাসায়নিক কীটনাশক এবং সেচ-নির্ভর নিবিড় কৃষির কারণে সবুজ বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ভারতের খাদ্য উৎপাদন বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। এর ফলে দেশ খাদ্য সঙ্কট কাটিয়ে আত্মনির্ভর হতে পেরেছে। কেমিক্যাল ফার্মিং দ্রুত ফল দেয়, কম সময়ে বেশি ফসল দেয়, এবং বৃহৎ জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে। বড় পরিসরে খাদ্যশস্য প্রক্রিয়াকরণেও এই পদ্ধতি সর্বাধিক ব্যবহারযোগ্য।

তবে কেমিক্যাল ফার্মিং-এর সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক গভীর প্রশ্ন। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা কমে যায়, মাটির অম্লত্ব বাড়ে, এবং বছর বছর সারের পরিমাণ বাড়াতে হয়। কীটনাশকের ব্যবহারে কীট প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, কিন্তু কৃষি জমি আরও বিষাক্ত রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই বিষাক্ত পদার্থ মাটি, জল ও খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। বহু অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ জলের মাত্রা নেমে গেছে, এবং নাইট্রেট দূষণ মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচও ক্রমশ বেড়ে চলেছে, ফলে লাভ কমে যাচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ WB Weather Update: ডিসেম্বরেও বঙ্গে শীতের ঢিলেমি, বুধের পর তাপমাত্রা কমার পূর্বাভাস

অর্গানিক কৃষি পরিবেশগতভাবে টেকসই হলেও তা-ও কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উৎপাদনের মাত্রা। রাসায়নিক কৃষির তুলনায় প্রথম কিছু বছর অর্গানিক কৃষির উৎপাদন কম হতে পারে। মাটির জৈব স্বাস্থ্যের পুনর্গঠন সময়সাপেক্ষ— ফলে কৃষকরা দ্রুত লাভের আশায় অনেক সময় এই পদ্ধতিতে যেতে দ্বিধা করেন। তাছাড়া অর্গানিক সার পাওয়া, বায়ো-পেস্টিসাইড প্রস্তুত করা, এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াও ভারতের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য অনেক সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। বাজারে পাইকারি বিক্রির ক্ষেত্রেও অর্গানিক পণ্যের স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত নয়। ফলে লাভজনক হলেও এর অনিশ্চয়তা অনেককে পিছিয়ে দেয় (Organic vs Chemical Farming)।

তবে এই দুটি ব্যবস্থার দ্বন্দ্বকে ‘সাদা-কালো’ হিসেবে দেখা ভুল হবে। বিজ্ঞানীরা অনেকেই বিশ্বাস করেন, শুধু কেমিক্যাল বা শুধু অর্গানিক— দুই মডেলের কোনওটিই এককভাবে ভারতের মতো বিশাল কৃষিনির্ভর দেশে পূর্ণ সমাধান নয়। প্রয়োজন হল এক সমন্বিত কৃষি মডেল, যেখানে রাসায়নিক ইনপুটের ব্যবহার কমিয়ে প্রকৃতিনির্ভর উপাদানকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই পথটি একদিকে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করবে, অন্যদিকে খাদ্য উৎপাদনের মাত্রাও বজায় রাখবে। বহু গবেষণা দেখিয়েছে যে জৈবসারের সঙ্গে সামান্য রাসায়নিক সার মিশিয়ে ব্যবহার করলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে, কিন্তু পরিবেশগত ক্ষতি অনেক কমে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সময়কালে অর্গানিক কৃষির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। চরম তাপ, অতিবৃষ্টি, খরা— এইসব পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এমন কৃষিব্যবস্থা হিসেবে অর্গানিক ফার্মিংকে অনেকেই ভবিষ্যৎ কৃষির ভিত্তি বলে মনে করেন। কারণ মাটির জৈব কার্বন বৃদ্ধি পেলে কার্বন শোষণের ক্ষমতা বাড়ে, মাটির জল ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ফলে খরার সময় ফসল টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। অন্যদিকে রাসায়নিক কৃষিতে মাটির স্বাস্থ্য দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জলবায়ুর ধাক্কা সইবার ক্ষমতা কমে যায়।

কৃষকের আয়ের প্রসঙ্গটিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্গানিক পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও ভারতীয় বাজারে এই চাহিদা এখনো শহরভিত্তিক, সীমিত গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ভোক্তা দাম সংবেদনশীল হওয়ায় কেমিক্যাল ফার্মিং-নির্ভর ফসলই তাদের প্রধান পছন্দ। ফলে অর্গানিক কৃষিতে লাভবান হতে হলে নিশ্চিত বাজার, যথাযথ সার্টিফিকেশন, কো-অপারেটিভ মার্কেটিং এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। রাষ্ট্র যদি এই খাতে ভর্তুকি, প্রশিক্ষণ এবং বাজার-সংযোগ বাড়ায়, তাহলে বহু কৃষক ধীরে ধীরে অর্গানিক পদ্ধতির দিকে আগ্রহী হবেন।

কেমিক্যাল ফার্মিং অবশ্যই পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়—এমন যুক্তিও অনেক বিশেষজ্ঞের। ভারতের মতো বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোথাও কোথাও উচ্চফলনশীল কৃষি অপরিহার্য। কিন্তু সেই ব্যবস্থাকে আরও বৈজ্ঞানিক, নিয়ন্ত্রিত ও দায়বদ্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে। কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা সীমিত করা, মাটির স্বাস্থ্য কার্ড নিয়মিত করা, সার ব্যবহারে ‘সঠিক মাত্রা-সঠিক সময়-সঠিক পদ্ধতি’ অনুসরণ করা এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা— এই সবই কেমিক্যাল ফার্মিংকে কম ক্ষতিকর করতে পারে।

অন্যদিকে অর্গানিক কৃষি প্রকৃতির সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। এটি শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়, বরং ভূমি, বীজ, জল ও পরিবেশের প্রতি এক নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি। সমাজ ও স্বাস্থ্য-দৃষ্টিকোণ থেকেও অর্গানিক কৃষি একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে এটি সফল করতে হলে কৃষির আধুনিক জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে অর্গানিক চর্চাকে সমন্বয় করতে হবে (Organic vs Chemical Farming)।

তবে অধিকাংশ গবেষক ও কৃষিবিজ্ঞানী স্পষ্টভাবে মনে করেন— ভারতের মতো দেশের জন্য শুধু অর্গানিক বা শুধু কেমিক্যাল— কোনও একটিই চূড়ান্ত সমাধান নয়। খাদ্য-নিরাপত্তা, কৃষকের আয়, পরিবেশ স্বাস্থ্য— এই তিনটি লক্ষ্যই অর্জন করতে হলে প্রয়োজন এক ‘হাইব্রিড বা ইন্টিগ্রেটেড অ্যাপ্রোচ’। এটি এমন একটি পথ যেখানে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক একেবারে বাদ না দিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও সীমিত মাত্রায় ব্যবহার করা হবে এবং বাকি পুষ্টি ও রোগনিয়ন্ত্রণ হবে জৈব ইনপুট, শস্যপর্যায়, মালচিং, সবুজ সার, বায়ো-কন্ট্রোল ও অণুজীবভিত্তিক পদ্ধতিতে। এই সমন্বিত মডেলটি একদিকে উৎপাদনক্ষমতা বজায় রাখবে, অন্যদিকে পরিবেশগত ক্ষতি নাটকীয়ভাবে কমাবে।

Bangla Jago fb page: https://www.facebook.com/share/17CxRSHVAJ/

এখানে প্রশ্ন আসে— রাষ্ট্র কী করবে? ভারত সরকার অর্গানিক কৃষি প্রচারে বেশ কিছু কর্মসূচি নিয়েছে। কিন্তু বড় সমস্যা হল বাজারে মূল্য নিশ্চয়তা। অর্গানিক কৃষক বেশি দাম পেতে পারে সত্য, কিন্তু সেই বাজার অস্থির। সার্টিফিকেশন ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ক্ষুদ্র কৃষকরা এ কারণে পিছিয়ে যায়। ফলে অর্গানিক কৃষির বাস্তবায়নকে সফল করতে হলে প্রয়োজনগ্রামীণ সার্টিফিকেশন সহজ ও সুলভ করা, কো-অপারেটিভ মার্কেটিং শক্তিশালী করা, স্থানীয় বাজারে অর্গানিক কর্নার তৈরি করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি ক্রেতা সংযোগ বৃদ্ধি করা। একইসঙ্গে প্রয়োজন কেমিক্যাল কৃষির জন্য আরও কঠোর বিধিনিষেধ— সারের অনিয়ন্ত্রিত ভর্তুকি কমানো, মাটির স্বাস্থ্য কার্ডের বাধ্যতামূলক ব্যবহার, কীটনাশক বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ, জল ব্যবস্থাপনায় দক্ষ প্রযুক্তির প্রসার। কারণ কেমিক্যাল কৃষির ক্ষতি মূলত ব্যবহারের অনিয়ন্ত্রিত মাত্রা, পদ্ধতির ত্রুটি এবং নীতির অভাব থেকে আসে (Organic vs Chemical Farming)।

দুটি মডেলের তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—অতীতের পুনরাবৃত্তি বা বর্তমানের অন্ধ অনুকরণ নয়, ভবিষ্যৎ কৃষিতে প্রয়োজন ভারসাম্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং পরিবেশ-সচেতনতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। অর্গানিক বনাম কেমিক্যাল— এই দ্বন্দ্বের সমাধান একটিকে বেছে নেওয়া নয়, বরং কৃষির পরিমিত ও বৈজ্ঞানিক নবায়ন। বর্তমান সময়ে যখন বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন কৃষিকে শুধুমাত্র উৎপাদনের দৃষ্টিতে নয়, নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। অর্গানিক কৃষি প্রকৃতির সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ককে পুনর্নির্মাণ করে; কেমিক্যাল কৃষি খাদ্য-অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে। ভারতের কৃষির ভবিষ্যৎ তাই এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে নয়— বরং এদের ভারসাম্য রক্ষার নতুন নীতিগত স্থাপনায়। কৃষি যদি আবার ‘মাটির প্রতি দায়িত্ব’ এবং ‘মানুষের প্রতি দায়িত্ব’— এই দ্বৈত নীতিতে ফিরে যেতে পারে, তবে ভারতের খাদ্য-ভবিষ্যৎ হবে শক্তিশালী, সুস্থায়ী ও পরিবেশ-সহনশীল (Organic vs Chemical Farming)।