চিত্র: সংগৃহীত
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: যে দেশে নাগরিক কার, আর অনাগরিক কার— এই প্রশ্নে বারবার উত্তাল হয়েছে রাজপথ, চর্চা হয়েছে সংসদে, প্রাণ গেছে নিরীহ মানুষের। সেই দেশেই আজ ফের প্রশ্ন উঠছে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড— এইসবের কোনওঁটাই যদি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ না হয়, তা হলে এতদিন ধরে এই ‘চিহ্নিত’ পরিচয়পত্রের মানে কী ছিল? কাদের জন্যই বা এত কোটি টাকার প্রকল্প? কাদের কী প্রমাণ করতে বলা হচ্ছিল (National ID and NRC)?
লোকসভায় তৃণমূল সাংসদ মালা রায়ের প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে যে বক্তব্য এসেছে, তা যেন চুপিসাড়ে এক বড়সড় প্রস্তাবনার সূচনা করে দিল— ভারতের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র চালু করতে চলেছে কেন্দ্র। এবং সেই পরিচয়পত্র জারি হবে শুধুমাত্র তাঁদের জন্য, যাঁরা ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেনস (এনআরআইসি বা এনআরসি)-এ নথিভুক্ত। অর্থাৎ, এনআরসি ছাড়া এবার কোনও নাগরিকত্বের প্রমাণ মিলবে না। এনআরসি, যেটি এখনও পর্যন্ত কেবলমাত্র অসমেই পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে— আর সেখানেই ১৯ লক্ষ মানুষকে ‘অনাগরিক’ ঘোষণা করা হয়েছে।
অসমের চিত্রটাই বুঝিয়ে দেয়, এই ‘নাগরিকত্ব’ প্রমাণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া কতটা ভয়ঙ্কর এবং মানবিক বিপর্যয়ের দিক থেকে কতটা বিপজ্জনক। একদিকে মুখে বলা হচ্ছে, জাতীয় স্তরে এনআরসি চালু করার সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। অন্যদিকে তারই ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু করার কথা বলা হচ্ছে। ২০১৯-২০ সালে যখন সিএএ এবং এনআরসি নিয়ে দেশজুড়ে আগুন জ্বলছিল, তখন কেন্দ্র বলেছিল, ‘এখনও পর্যন্ত জাতীয় স্তরে এনআরসি করার কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি’। সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা আজ ভেঙে চুরমার। কারণ প্রশ্ন উঠছে, যদি এনআরসি না হয়, তা হলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিই বা কী? আর যদি জাতীয় পরিচয়পত্র নাগরিকত্বের একমাত্র প্রমাণ হয়, তা হলে বর্তমান যে পরিচয়পত্রগুলি এতদিন নাগরিকের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে— তাদের মর্যাদা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল (National ID and NRC)?
চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয় যদি এনপিআর বা ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টারের প্রসঙ্গে চোখ রাখা যায়। ২০১০ সালের আদম সুমারির সঙ্গে সঙ্গেই চালু হয়েছিল এনপিআর। ২০১৫-১৬ সালে তা আপডেটও করা হয়েছিল। এনপিআরের তথ্য থেকেই এনআরসি তৈরি করার কথা বলা হয়েছিল। যদিও বর্তমানে সরকার ২০২৭ সালের জনগণনার সময় এনপিআর আপডেট করার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি বলেই জানাচ্ছে। অর্থাৎ, যেখানে এনপিআর হবে কি না সেটাই স্পষ্ট নয়, সেখানে এনআরসি কীভাবে হবে? আবার সেই এনআরসি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র জারি সম্ভব নয়— এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান এক গভীর আশঙ্কার জন্ম দেয়।
এই আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ অতীতের অভিজ্ঞতা। অসমে এনআরসি প্রক্রিয়ায় যারা বাদ পড়েছেন, তাঁদের অনেকেই যুগের পর যুগ ধরে ভারতে বসবাস করছেন, কর দিচ্ছেন, ভোট দিচ্ছেন, সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন, অথচ নথির অভাবে ‘নাগরিক’ হতে পারেননি। তাঁদের এখন ‘ডি-ভোটার’ বা সন্দেহভাজন ভোটার হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হচ্ছে, ট্রাইব্যুনালে দৌড়াতে হচ্ছে, কিংবা জেল খাটতে হচ্ছে। যে দেশে হাজার হাজার মানুষ এখনও বন্যা, খরা, দারিদ্র্য বা বাস্তুচ্যুতির কারণে জন্মসনদ, শিক্ষা সনদ বা পূর্বপুরুষদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে পারেননি, সেখানে কেবল কাগজের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে চাওয়া এক নির্মম নিষ্ঠুরতা (National ID and NRC)।
এখানে প্রশ্ন উঠছে— জাতীয় পরিচয়পত্র কাদের জন্য? কাদের বাদ দেওয়ার জন্য? এবং সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিচয়পত্র যদি এনআরসি ভিত্তিক হয়, তা হলে সেটা কি এক অঘোষিত জাতীয় এনআরসি নয়? যেখানে মুখে না বলেই সমস্ত নাগরিককে এক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে— তোমার নাগরিকত্ব প্রমাণ করো।
যা আরও ভাবনার, তা হল এই জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে আদর্শ নাগরিকের একটি ‘ছাঁচ’ নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। মানে, সরকার চাইবে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সবাইকে মাপতে। যিনি সেই কাঠামোতে পড়বেন না, তিনি ‘নাগরিক’ নন। ঠিক যেভাবে জাতি, ধর্ম, ভাষা, পোশাক, রুচি, চিন্তা— সব কিছুকে এক রঙে রাঙাতে চায় আধুনিক রাষ্ট্রশক্তি। যার পরিণামে সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী কিংবা প্রান্তিক কোনও শ্রেণি চূড়ান্তভাবে বর্জনের শিকার হবে।
সাম্প্রতিক কালে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে, বহু মুসলিম অধিবাসীকে হঠাৎ করেই ‘ডি-ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে তাঁদের বেনজির হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এনআরসি না-থাকলেও, স্থানীয় স্তরে এই ধরনের বাছাই পদ্ধতি কার্যত একটি ছদ্ম-এনআরসি রূপে কাজ করছে। তা ছাড়া, কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ প্রকল্পেও নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ডেটা সংগ্রহ, আধার ও মোবাইল নম্বর সংযুক্তিকরণ, ইত্যাদির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ক্রমেই আরও কঠোর হচ্ছে। এই পরিকাঠামোয় জাতীয় পরিচয়পত্র চালু হলে, তা এক ভয়ঙ্কর নজরদারি রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারে (National ID and NRC)।
নাগরিকত্বের প্রশ্নে একটি গণতান্ত্রিক দেশের অবস্থান হওয়া উচিত— মানবিক, উদার ও যুক্তিনিষ্ঠ। কারণ কোনও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল তার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী মানুষদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু এখানে তার ঠিক উল্টোটা ঘটছে— নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারলে মৌলিক অধিকারই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যেন একজন মানুষের অস্তিত্ব কেবল একটি কার্ড, একটি সিরিয়াল নম্বর, একটি ফাইল নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এই প্রেক্ষিতে বলা যেতেই পারে, জাতীয় পরিচয়পত্র চালুর নামে দেশে এক ভয়াবহ চিহ্নিতকরণ যন্ত্র গড়ে তোলা হচ্ছে, যার লক্ষ্য পরোক্ষে নাগরিকত্ব বাছাই। যেখানে প্রতিটি মানুষকে নিজের ‘ভারতীয়ত্ব’ প্রমাণ করতে হবে কাগজে-কলমে, ইতিহাসে-গোত্রে, মুছে ফেলতে হবে সকল বহুত্ববাদী পরিচয়কে।
কিন্তু গণতন্ত্র কি এতই দুর্বল, যে নাগরিকের স্বর, অভিজ্ঞতা, অস্তিত্ব— এতসব কিছুই এখন নথির কাছে পরাজিত? এই প্রশ্নই হয়তো আগামী দিনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠবে। আজ যারা নিশ্চিন্তে নিজেদের নাগরিক মনে করছেন, কাল তারা যে কোনও ফাঁকে ‘অবৈধ’ হয়ে যাবেন না, তার নিশ্চয়তা কোথায় (National ID and NRC)?
সুতরাং এখনই সময়— এই জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম করে যে পরোক্ষ এনআরসি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যুক্তি, মানবিকতা এবং সংবিধানের দোহাই দিয়ে রুখে দাঁড়ানোর। কারণ একবার নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হলে, আর কিছুই থাকে না— না অধিকার, না আশা, না আত্মমর্যাদা।